যত ক্ষমতা তত হুঙ্কার ও হুমকি! ইতিহাসের ফ্ল্যাশব্যাকে এই সত্যের কোনও হেরফের নেই। ক্ষমতার আসনে বসে কেউ মিনমিন করে না। কেউ বিনয়ের অবতার হয় না। বরং ক্ষমতার আসন থেকে ত্রাসের বাতাবরণ তৈরি করার প্রবণতাই স্বাভাবিক।
এই মুহূর্তের বিশ্বরাজনীতির ভাষায় হুঙ্কার, আস্ফালন, প্রতিশোধের হুমকি এবং ভয় দেখানোর বিচিত্র রূপ ও পদ্ধতির কোনও অভাব নেই। ক্ষমতার আসন রক্ষা করতে হুমকি এবং তর্জন যে কত প্রয়োজনীয় সে কথা কুণ্ঠাহীন ভাষায় নিজের ‘প্রিন্স’ গ্রন্থে ঘোষণা করেছেন কূটনীতির গুরু নিকোলো মেকিয়াভেলি। নাৎসিরা হুংকারের ভাষাকেই শাসনের একমাত্র ভাষা করেছিল।
ক্ষমতার মাধুর্য ফুটে ওঠে উদারতায়, সৌজন্যে, মাঙ্গলিক ভাবনায়।
হিটলারের যে কোনও ভাষণ হুঙ্কার সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। চ্যাপলিন তাঁর ‘দি গ্রেট ডিক্টেটর’ ছবিতে হিঙ্কেল নামের এক দুর্দমনীয় শাসকের ভূমিকায় হিটলারকে বিদ্রুপ ও তামাশার পর্যায়ে নামিয়ে আনেন। দেখান, আস্ফালনের ভাষা কত হাস্যকর হয়ে উঠতে পারে।
হিটলারের যে কোনও ভাষণ হুঙ্কার সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
ইদানীং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষা নিয়েও বিশ্বজুড়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ, সমালোচনা, ট্রোলিং কম হচ্ছে না। এদেশেও যত এগিয়ে আসছে ভোট, তত রাজনীতির ভাষায় বাড়ছে অগ্নিবর্ষণ। মাত্রা ছাড়াচ্ছে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের ভাষা। রাজনীতির গা থেকে ঝরে যাচ্ছে সৌজন্যবোধের ন্যূনতম চিহ্ন। ভোটের বাজার গরম করছে কর্কশ বাক্যের তোপ। ভয় দেখানো, হিসাব বুঝে নেওয়ার জোরদার ক্ষমাহীন প্রতিশ্রুতি। ক্ষমতায় এলে বুঝিয়ে দেব কত ধানে কত চাল, এই তাল ঠুকে পালোয়ানি স্টাইলটা আমাদের রাজনীতিকে দিনদিন পাকড়ে ধরছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি ক্ষমতার অভিজ্ঞান তর্জন নয়, নয় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ।
ক্ষমতার মাধুর্য ফুটে ওঠে উদারতায়, সৌজন্যে, মাঙ্গলিক ভাবনায়। ক্ষমতার প্রকাশ যে ভাষার উগ্রতা ছাড়াও হতে পারে, আমাদের রাজনীতি সেই জরুরি সত্যটি সম্ভবত সম্পূর্ণ ভুলেছে। মহাত্মা গান্ধীর ‘কুইট ইন্ডিয়া’ স্পিচটি যেন আমরা ভুলে না যাই, যে ভাষণে গান্ধী এই ভাষায় সারা ভারতকে অহিংস যুদ্ধে ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলছেন: ফ্রেন্ডস অ্যান্ড কমরেডস, উইথ অল হিউমিলিটি, আই আস্ক ইউ টু ফাইট! কোথাও নেই একটিও হিংসাত্মক শব্দ, একটিও অহংকারী তর্জন। গীতায় কৃষ্ণ অর্জুনকে যে হিংসাহীন উদার ভাষায়, ন্যায়বোধে উদ্বুদ্ধ ভাষায় আত্মীয়দের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধে ডাক দিচ্ছেন, গান্ধীর রাজনৈতিক ভাষণ তেমনই অহং ও গর্জনবিহীন আহ্বান। রাজনীতির এই ভাষা আমরা ভুলে গিয়েছি।
যেমন ভুলে গিয়েছি কেমন মঞ্চ থেকে, কোন বাতাবরণ থেকে, কোন ঐতিহ্যের সূত্র ধরে আমরা রাজনৈতিক ভাষণটি দিচ্ছি। যদি সেই ভাষণের পশ্চাৎপটে আমরা রাখি কোনও মন্দির, গড়ে তুলি আধ্যাত্মিক সংযোগ, স্পিরিচুয়াল অনুষঙ্গ, তাহলে যেন মনে রাখি এই সহজ কথাটি– আমাদের রাজনীতিতে যেন না উচ্চারিত হয় একটিও প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি, ক্ষমতায় এসে হিসাব বুঝে নেওয়ার দাম্ভিকতা। যেন আমাদের রাজনীতি হয় মাঙ্গলিক উদ্ভাসের। ব্যক্তিগত বা স্বার্থগত আক্রোশের নয়।
