shono
Advertisement

Breaking News

Prasun Bandyopadhyay

তাঁর কবিতায় ছায়া ফেলে সময়-রাজনীতি, সাহিত্য অকাদেমিতে সম্মানিত 'তুমুল মধুর' প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়

‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইটির জন্য ২০২৫ সালের সাহিত্য অকাদেমি পেয়েছেন কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়।
Published By: Amit Kumar DasPosted: 06:07 PM Mar 17, 2026Updated: 07:36 PM Mar 17, 2026

কবিতায় প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় (Prasun Bandyopadhyay)যেভাবে ফুটবলকে টেনে আনেন, টেনে আনেন হাবিবের থ্রু পাসের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিরোধের কথা, যেভাবে ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ জীবনের প্রেক্ষিতে বিপ্লব, বিশ্বাসঘাতকতা ও স্খলনকে বুনে দেন, যেভাবে ‘উত্তর কোলকাতা’-র ভৌগোলিক স্থানিকতায় আচ্ছন্ন থেকেও স্থানিকতার চরিত্রগুণকে প্রসারিত করে দেন সর্বময়তায়, তা আমাদের মুগ্ধ করে, করে ঈর্ষাকাতর। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইটির জন্য ২০২৫ সালের সাহিত্য অকাদেমি পেলেন সদ‌্য। লিখছেন, ঋত্বিক মল্লিক।

Advertisement

আমরা পেলের কী দেখে মুগ্ধ হই যা আর অন্য কারও মধ্যে পাওয়া যায় না? তা হল, চিন্তাভাবনার অদ্ভুতত্ব, আশ্চর্যতা, অসম্ভবতা, দুনিয়াছাড়া বৈচিত্র্য। প্রতিটি চেষ্টাতেই পেলে যে সফল হয়েছেন তা তো নয়, কিন্তু তার প্রতিটি কাজে লেগে থাকত একটি বিচিত্র চিন্তাশীল মস্তিষ্কের ছায়া। আর তার এই ভাবনার অভাবনীয় গতিপথই মানুষকে পাগল করে তুলত।

যদি বলি, পেলেকে নিয়ে এই আশ্চর্য বিশ্লেষণী উচ্চারণ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের, তাহলে অনেকেই বোধহয় ভারতীয় ফুটবলের প্রাক্তন নক্ষত্র অধিনায়ক প্রসূনের কথাই ভাববেন। আর, অবাক হবেন ‘আসল’ কথাটি শুনে ও জেনে। এই প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম এবং প্রধান পরিচয়– তিনি কবি, তিনি সাদা পাতার উপরে ড্রিবল করেন শব্দ দিয়ে। সেই আটের দশকের গোড়া থেকে পাঠক মজে রয়েছে তাঁর কবিতায়, আর বাংলা ভাষায় ফুটবল নিয়ে লেখা সম্ভবত শ্রেষ্ঠ বই ‘ফুটবল ঘরানা: বিপ্লব ও বিবর্তন’। প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার আগে প্রসূনের প্রথম বই ‘বালি ও তরমুজ’ (১৯৮৩) থেকে ‘খেলা’ কবিতার কিছু অংশ রেখে যাই–
ওগো চাঁদ, সাদা চাঁদ, কালোছোপ রাশিয়ান ফুটবল তুমি
মেঘেরা তোমাকে নিয়ে কি খেলাই খেলে আজ ওই নীল মাঠে
এমন হাওয়ার দিনে,
আমি লক্ষ করি সুরজিৎ সেনগুপ্তের খেলা, লক্ষ করি
হাবিবের লম্বা থ্রু পাস ধেয়ে আসছে আমাদের জীবনের দিকে

‘বালি ও তরমুজ’-এর প্রকাশকাল ১৯৮৩ হলেও কবিতাগুলি লেখা হচ্ছিল কিন্তু সাতের দশকের গোড়া থেকেই। সেই সময়ের রাজনীতি তো স্বাভাবিকভাবেই ছায়া ফেলবে কবিতায়, কিন্তু সোচ্চারে নয়, বরং কিছুটা সন্তর্পণে– ‘আজ ভোরে ছিঁড়ে ফেলি সংবাদপত্রের ঘোর ছায়া/ কাল রাতে ঝরেছে শিশির, ইস্তেহার/ আজ আর্মিটহল শুরু হল’ (‘সংবাদপত্রের ঘোর ছায়া’)। এই বইয়ে আর-একটি কবিতাও আছে– ‘স্বীকারোক্তি: বন্দুকের নলকে’। নামের মধ্যে ‘বন্দুক’ থাকায় মনে হয়, এই তো সেই চেনা বিপ্লবচিহ্ন, কিন্তু পড়তে গিয়ে বুঝি– উঠে আসছে বিপ্লবের নেপথ্যে নানাপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা আর স্খলনের কথা। একেবারে শেষে দেখি বন্দুকের নল ক্রমশই প্রশস্ত হয়ে যায়, আর ‘তার মধ্যে কীভাবে ক্রমশ আজ একে একে ঢুকে পড়ছে/ পশ্চিমদিনাজপুর বাঁকুড়া বীরভূম পুরুলিয়া’। বাংলার এই জেলার কথা ছড়িয়ে রয়েছে এই বইয়ে। জঙ্গল, জিপগাড়ি, পাহাড়, সমুদ্র, বাস, ডাকবাংলো– সবই আছে, আবার আছে ক্লান্ত ভ্রমণে শিকড় নামানোর কথাও, আছে বিবাহ আর সন্তানের সমৃদ্ধির প্রসঙ্গ। বালির মধ্যে থেকে তরমুজ জন্ম নেয়, আর এসব স্থানিক প্রসঙ্গ থেকে জন্ম নেয় গভীর এক শপথ–
শুধুমাত্র সন্তানের জন্য আজ এই দীর্ঘ পাহাড় সফরে
আমি একাকী এসেছি...
...শোনো
তোমাকে শপথ করে বলতে চাই, আমি
এখানে লুকনো সব তেল, কয়লা, সোনা, ম্যাঙ্গানীজ
সন্তানের জন্য নিয়ে যাব

২০০৯ সালে ‘ভাষাবন্ধন’ থেকে তাঁর যে ‘কবিতা সংগ্রহ’ প্রকাশিত হয়, সেখানে ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’ থেকে কয়েকটি মাত্র কবিতা রাখেন, আরও পরে যখন বেরয় ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, তখন তো একেবারেই বাদ যায় এই বই, সঙ্গে ‘গুপ্ত দাম্পত্যকথা’, ‘রাধাতপা চতুর্দশী’ আর ‘টুরিস্টকাহিনী’।

পরের বই ‘উন্মেষ গোধূলি’ বেরিয়েছিল অনেক বিলম্বে, এক দশকেরও কিছু বেশি সময়ের পর। তারপর প্রকাশিত হল ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’ (২০০২)। এই পর্যন্ত তাঁর জীবন জড়িয়ে ছিল বেশ কিছু ‘অ্যাক্টিভিটি’-তে। ‘ন্মেষ গোধূলি’ পর্যায়ে যেমন ছিল ‘শতজল ঝর্নার ধ্বনি’ আন্দোলন, তেমনই আবার ছিল ভাষা আন্দোলন– যার ফলশ্রুতি ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’। তাঁর এই অ্যাক্টিভিস্ট জীবন যখন সরাসরি ঢুকে পড়ছিল কবিতায়, তখন অতি-সচেতনতায় তা অতিক্রম করে যেতে চাইলেন তিনি, ‘শিল্পের বিষয় উপাদান সামাজিক এবং রাজনৈতিক হলেও তার যে Alchemi দিয়ে Ultimate শিল্পবস্তুটি তৈরি হয়, তা সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে খুব একটা অংশগ্রহণ করে বলে আমার মনে হয় না। শিল্প ব্যক্তিগত আস্বাদনের বিষয়।’ ফলে, এই অতিক্রমের প্রশ্নে সময়ের সাহায্য নিতে চান তিনি। কবিতা লিখতে বসে নিরন্তর কাটাছেঁড়া, প্রথমে গ্রহণ, পরে বাতিল চলতেই থাকে।

২০০৯ সালে ‘ভাষাবন্ধন’ থেকে তাঁর যে ‘কবিতা সংগ্রহ’ প্রকাশিত হয়, সেখানে ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’ থেকে কয়েকটি মাত্র কবিতা রাখেন, আরও পরে যখন বেরয় ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, তখন তো একেবারেই বাদ যায় এই বই, সঙ্গে ‘গুপ্ত দাম্পত্যকথা’, ‘রাধাতপা চতুর্দশী’ আর ‘টুরিস্টকাহিনী’। কবিতা লেখা থেকে প্রকাশ, এই পর্বেও একপ্রকার ‘অ্যাক্টিভিস্ট’-ই থেকে যান তিনি (তবে ২০১৯ সালে ‘রাবণ’ থেকে প্রকাশিত ‘কাব্যসংগ্রহ’-য় এই প্রতিটি বইয়ের কবিতা সংকলিত হয়েছে।)।

‘উত্তর কোলকাতা’-র দৃশ্যে তার আধো-অন্ধকার গলি, তাসাপার্টি, লিমকা সহযোগে বাংলা মদ, বাবুদের লাল রক, জেলেপাড়া, মারহাট্টা ডিচ লেনের মধ্যে যে লোকাচার বা গোপন সাধনা, তার সঙ্গে ক্রমেই বাঁকবদল করতে থাকে প্রসূনের কবিতা।

তবে ২০০৫ সালে ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক বুঝে নিল, স্থানিকতার নতুন এক গল্পে তিনি ঢুকে পড়েছেন। ‘স্থানিকতা’ বলতে নেহাত কোনও ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এই স্থানিকতা একটি চরিত্র, বৈশিষ্ট‌্যপূর্ণ চরিত্র। কবিতার ভিতর জড়িয়ে আছে তা। একইভাবে বদলে যায় তাঁর ভাষাও, গঙ্গার ধার সমীভবনে হয়ে যায় ‘গঙাধ্‌ধার’, স্বর আর ব্যঞ্জনের আগমনে ‘দুঃখু’, ‘স্‌সাল্‌আ’– এসব তো আছেই, আবার ধরুন– ‘পাথরের গলি দিয়ে টানা রিকশা বুঝতেই পারছো/ কানের ইয়ে ফাটে ফাটে হবার যোগাড়/... আর তার মধ্যে রোড ফুটবল... ফুটবল না কচু/ বাতাবি সাইজের রবারের বল বিচিফিচিতে লেগে গেলে...’, আর, এর পাশেই যদি রাখি এই বইয়ের প্রবেশক কবিতাটি–
অতিকাল যাও... আমার অপর এই গঙ্গাধ্‌ধারে
বটবৃক্ষমূলে দ্যাখো গামছা পেতেছে... বাঁকুড়ার...

বাগবাজারের গঙাধ্‌ধারে পক্ষীবিষ্ঠাময় কোনো
বটমূলে বাঁধানো চাতালে... থামো অতিকাল...
দূর থেকে গামছাটিকে প্রণাম জানাও।

‘উত্তর কোলকাতা’-র দৃশ্যে তার আধো-অন্ধকার গলি, তাসাপার্টি, লিমকা সহযোগে বাংলা মদ, বাবুদের লাল রক, জেলেপাড়া, মারহাট্টা ডিচ লেনের মধ্যে যে লোকাচার বা গোপন সাধনা, তার সঙ্গে ক্রমেই বাঁকবদল করতে থাকে প্রসূনের কবিতা। ‘আনন্দভিখিরি’ কাব্যগ্রন্থে মিস্টিক অথচ তীব্র আবেদন, যৌনতা আর অধ্যাত্মবাদের কাটাকুটি চলতে থাকে, যেন স্থানিকতাকে রেখেই স্থান-নিরপেক্ষ অনির্বচনীয় হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে নমুনা রূপে ‘মধ্যপন্থা’ কবিতাটির কথা বলব। ‘ডান’ এবং/ বা বাম নয়, মধ্যিখান দিয়ে নৌকো চালানোর অপরূপ চিত্রকল্পে ঘাপটি মেরে ঢুকে আসে বেলঘরিয়া। তারপর যখন এই ডান-বামের স্বরূপ কিছুটা স্পষ্ট করে দেন, ‘রাগ-দ্বেষ সুখ-দুঃখ ইড়া ও পিঙ্গলা’-র মাঝে যখন নৌকো চালানোর কথা আসে, তখন আবার ‘চাঁদু’ শব্দটি ঢুকে পড়ে– ‘মাঝে এসো... মাঝে এসো... চাঁদু.../ মধ্যখান দিইয়ে বইতে পারলেই ঝলমলে/ ময়ূরপঙ্খী... সহজে তরতরে হাওয়া’। তাঁর এই প্রবণতা আরও গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠতে থাকে পরের অন্যান্য কবিতায়। ‘মধুরতুমুল’ যেন এই জাহাজের মাস্তুলে বসে থাকা একটা ছোটো পাখি, যে, সমুদ্রের মাঝবরাবর যাওয়া পর্যন্ত চুপ করে অপেক্ষা করে, আর পাঠকের উদ্দেশ্যে বলে যায়, “মাধুর্য উদয় হ’লে মধু/ তিক্ততায় নাস্তি শোচনা/ বোধমাত্র একাকার বঁধু/ বিপরীতযুগলের রচনা”।

প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও আছেন তাঁর উত্তর কোলকাতায়, তাঁর থাকা প্রখর নয়, মৃদু, আত্মমগ্ন, যদিও তিনি তাঁর কাব্যদর্শনে বিরাজ করছেন চেতনার শীর্ষে। তাঁর এই তুঙ্গ অবস্থা ‘তুমুলমধুর’ হয়ে ঝরে পড়ুক, এই পাতা ঝরার মুহূর্তে এছাড়া আর কী-ই-বা চাওয়ার থাকে তাঁর কাছে!

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement