একটি সুন্দরী মেয়ে হেঁটে চলেছে রাস্তা দিয়ে আনমনে। একটি ছেলে তার পথ আটকে প্রেম নিবেদন করে। মেয়েটি প্রত্যাখ্যান করে। অন্য একটি ছেলে বিলাসবহুল গাড়ি নিয়ে আসে। সেও প্রেম নিবেদন করলে, মেয়েটি প্রত্যাখ্যান করে। দূর থেকে এসব দেখছিল অন্য একটি ছেলে। সে এবার বখাটে ছেলের মতো শিস দিয়ে ডাকে মেয়েটিকে। প্রচণ্ড রাগে মেয়েটি যখন কিছু বলতে যাবে, তখন দেখে, এই ছেলেটি আসলে বাড়ি বাড়ি গ্যাস পৌঁছে দেওয়ার কাজে যুক্ত। মেয়েটি আর কোনও কথা বলে না। হাসি মুখে ওই ছেলেটির সঙ্গে ভাব করতে এগিয়ে যায়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এলপিজি সিলিন্ডারের বর্ধিত দাম ও আকালের প্রেক্ষিতে এই ‘কনটেন্ট’ বানিয়েছে জনৈক ইউটিউবার। রান্নার গ্যাস এখন এত মহার্ঘ যে, এর জন্য সব করতে আমরা প্রস্তুত! মিড ডে মিল থেকে রেস্তোরাঁ– সব বিপন্ন রান্নার গ্যাসের অনটনে। কোন-কোন রান্নায় আঁচ কম লাগবে, সেসব ‘রেসিপি’ ভাইরাল হতে শুরু করেছে। ‘বিকল্প’ জ্বালানি রূপে ‘ইনডাকশন’ কুকারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সংবাদপত্রে বেরিয়েছে কাশ্মীরের ছবি, যেখানে ফাঁকা সিলিন্ডার নিয়ে লম্বা ‘লাইন’ দিয়েছে জনতা। দেশ এভাবে ত্রস্ত ও শঙ্কিত হয়ে এর আগে নোটবদলির সময় ‘লাইন’ দিয়েছিল। ‘কোভিড ১৯’ ঠেকাতে যখন টিকা বিতরণ করা হয়েছিল, তখনও চোখে পড়েছিল এ ধরনের দীর্ঘ লাইন, যেখানে প্রান্তিক ও অভিজাত, সব মানুষ একীভূত হয়েছিল। লাইনের এমনই মহিমা!
‘লাইন’ শব্দটি সরাসরি জড়িয়ে নিয়ে বাংলা ভাষায় একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। বইটির নাম: ‘লাইনেই ছিলাম বাবা’।
নামের মধ্যে ‘লাইন’ শব্দটি সরাসরি জড়িয়ে নিয়ে বাংলা ভাষায় একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। বইটির নাম: ‘লাইনেই ছিলাম বাবা’। লেখক শঙ্খ ঘোষ। কবিতাগুলির রচনাকাল আগের তিনটি বছর ধরে, ১৯৯০-’৯৩। এ বইয়ের কয়েকটি কবিতা এত বিখ্যাত যে, বারবার উদ্ধৃতির ফলে তা ‘মিথ’ হয়ে গিয়েছে। যেমন, ‘লাইন’ কবিতায় আঁকা হয়েছে মহল্লা-কলোনির পুরনো অভ্যাস– ফাঁকা ডালডার টিন বা আধলা ইট বা জুতোর পাটি রেখে রেশনের দোকানে কেরোসিনের জন্য ‘লাইন’ রক্ষা করা। একজন উপভোক্তার টিনটি লহমার জন্য ছিটকে গিয়েছে লাইন থেকে। সেটিকে আর সে শনাক্ত করতে পারছে না। অন্যের টিন নিয়ে টানাটানি করতেই অশান্তি, প্রতিবাদ। ‘হোই হেই হাট’ আপত্তি।
‘কোভিড ১৯’ ঠেকাতে যখন টিকা বিতরণ করা হয়েছিল, তখনও চোখে পড়েছিল এ ধরনের দীর্ঘ লাইন।
কবিতা শেষ হচ্ছে এ-কথা বলে, ‘কোনোমতে ফিরে যাব ফাঁকা টিন বাজিয়ে সহজে/ আগুনই কোথাও নেই– কী হবে-বা জ্বালানির খোঁজে।’ যে আগুন শুদ্ধের প্রতীক, যে আগুন নিয়ন্ত্রক, যে আগুন সমর্পণ ও সংস্কারের বাহক, সেই আগুনই যদি সমাজ থেকে অন্তর্হিত হয়, তাহলে ‘জ্বালানির খোঁজে’ কী হবে, এই আক্ষেপ নিয়ে কবিতাটি শেষ হয়। কিন্তু ন্যায়-অন্যায় নিয়ে, ক্ষমতার গতিচক্র সম্বন্ধে কত অবারিত কথাই না বলে দেয় নিশ্চুপে! ‘লাইন’ যতক্ষণ শৃঙ্খলা, ততক্ষণ কাম্য। কিন্তু ‘লাইন’ যখন অভাব, অবিচার ও যাতনার রূপক, তখন হতাশা জাগে বইকি।
