shono
Advertisement
Tintin or Asterix

টিনটিন না অ্যাসটেরিক্স? কমিকসের দ্বন্দ্ব সমাস

টিনটিন শেখায় অজানার দিকে এগিয়ে যেতে। অ্যাসটেরিক্স শেখায় ক্ষমতাকে অতিরিক্ত ভয় না পেতে। ১৪ আগস্ট ছিল রেনে গোসিনি-র জন্মশতবর্ষ। অ্যাসটেরিক্স সিরিজ তিনি হাসি লিখতেন।
Published By: Kishore GhoshPosted: 06:19 PM Aug 30, 2026Updated: 06:20 PM Aug 30, 2026

টিনটিন, না, অ্যাসটেরিক্স? দু’জনেই। টিনটিন শেখায় অজানার দিকে এগিয়ে যেতে। অ্যাসটেরিক্স শেখায় ক্ষমতাকে অতিরিক্ত ভয় না পেতে। ১৪ আগস্ট ছিল রেনে গোসিনি-র জন্মশতবর্ষ। অ্যাসটেরিক্স সিরিজ তিনি হাসি লিখতেন। আর সে-হাসিকে শারীরিক রূপ দিতেন ইউদেরজো। লিখছেন অতনু বিশ্বাস

Advertisement

চা, না, কফি? ক্রিকেট, না, ফুটবল? কিশোর, না, রফি? কেরি গ্রান্ট, না কি ডাস্টিন হফম্যান? এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়, কিন্তু মীমাংসা করা যায় না কিছুতেই। ইউরোপীয়– বিশেষত, ফ্রাঙ্কো-বেলজিয়ান– কমিক্‌স পড়ে বড় হওয়া বাঙালির কাছে তেমনই এক চিরন্তন প্রশ্ন: টিনটিন, না, অ্যাসটেরিক্স? এটি কিন্তু জনপ্রিয় ইংরেজি নার্সারি রাইম বা লুইস ক্যারলের বইয়ের টুইডেলডাম আর টুইডেলডি-র মতো– যাদের স্পষ্টতই আলাদা করা যায় না– এমন অভিন্ন-রূপ যমজের মধ্যে তুলনা নয়।

বরং প্রশ্নটি শুনলেই খুলে যায় শৈশবের বইয়ের আলমারি– সেখানে ছিল পুরনো বইয়ের গন্ধ, পাতার কোণে ছিল ভাঁজ, আর পরীক্ষার আগের রাতে ‘আর-একটা পাতা’ পড়তে পড়তে শেষ করে ফেলা পুরো বই। শৈশবের আকর্ষণ বদলে গিয়ে ভিন্নতর রূপ পায় বড়বেলায়। তখন বোঝা যায়, টিনটিন আর অ্যাসটেরিক্সকে একই মাপে মাপাটাই অন্যায্য। কারণ, এদের একজন যেন বলে, ‘চলো, পৃথিবীটা ঘুরে দেখি।’ আর অন্যজন বোধহয় বলে, ‘পৃথিবীটাকে এত সিরিয়াসলি নেওয়ার কী আছে?’

টিনটিন তৈরি এখনকার দিনের প্রেক্ষিতে, আর অ্যাসটেরিক্সের পটভূমিটা দুই সহস্রাব্দ আগেকার।

১৪ আগস্ট ছিল রেনে গোসিনি-র জন্মশতবর্ষ। শিল্পী আলবের ইউদেরজো-র সঙ্গে মিলে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘অ্যাসটেরিক্স’-এর কথা তাই মনে পড়ে নতুন করে। গোসিনির বড় কৃতিত্ব– শিশুদের জন্য লিখতে গিয়ে ভুলে যাননি বড়দের কথা। ছোটবেলায় এই কমিক্‌সের যে কৌতুক নিছক হাসায়, বয়স বাড়লে তার মধ্যে চোখে পড়ে রাজনীতি, সমাজ, ক্ষমতা এবং মানুষের দুর্বলতা।

টিনটিন পৃথিবীটাকে অনেকটাই বড় করে ফেলে; আর অ্যাসটেরিক্স ছোট করে দেয় পৃথিবীর ক্ষমতাবান মানুষগুলিকে। টিনটিনের পৃথিবী জমজমাট রহস্যে ভরা। তরুণ বেলজিয়ান সাংবাদিকটি পৌঁছে যায় কখনও মিশরে, কখনও চিনে, কখনও তিব্বতে, কখনও বা দক্ষিণ আমেরিকায়; এমনকী চঁাদেও। সাংবাদিকের পেশা এমন হওয়া উচিত কি না, সে নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে– কিন্তু টিনটিনের পাঠক রূপে আমাদের কোনও আপত্তি নেই এতে। গুপ্তধন, অপরাধ, গুপ্তচর, অপহরণ, রহস্য– সবকিছুর মধ্যেই টিনটিনের এক অদম্য কৌতূহল। টিনটিন যেন ‘ইনডিপেন্ডেন্ট জার্নালিস্ট’।

শৈশবে টিনটিন পড়ার মূল আকর্ষণ বোধকরি ছিল– এরপর কী হবে, তার মধ্যে জড়িয়ে? কিন্তু সেটাই তো শেষকথা নয়। ‘টিনটিন ইন টিবেট’-এ যেমন রোমাঞ্চের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস ও অসম্ভবকে সম্ভব করার জেদ। ‘ডেস্টিনেশন মুন’-এ আবার বিজ্ঞান, কল্পনা আর অভিযানের মিশেল এমনই যে, বাস্তবে মানুষ চঁাদে পা রাখার বহু আগেই টিনটিন পৌঁছে যায় সেখানে। তাই এ যেন অনেক কিছুর মিশ্রণে তৈরি এক ম্যাজিক মশলা।

অ্যাসটেরিক্সের দর্শন কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। টিনটিন তৈরি এখনকার দিনের প্রেক্ষিতে, আর অ্যাসটেরিক্সের পটভূমিটা দুই সহস্রাব্দ আগেকার। সেটা খ্রিস্টপূর্ব ৫০ সাল। গোটা গল রোমানদের দখলে। পুরোটা নয় অবশ্য। কারণ, ছোট্ট একটি গ্রাম এখনও স্বাধীন। সেখানে আছে অ্যাসটেরিক্স, আছে তার বিশালদেহী বন্ধু ওবেলিক্স, আছে জাদু শরবতের অধিকারী গেটাফিক্স। ছেলেবেলায় ওবেলিক্স পড়ে গিয়েছিল সেই শরবতের কড়াইয়ে– তাই তাকে আর শরবত খেতে হয় না। সত্যি বলতে কী, এমন সুবিধা পেলে বোধহয় সহজ হয়ে যেত পৃথিবীর অনেক সমস্যাই।

আসলে ভাল কমিকস-অনুবাদ তো শুধু ভাষা বদলায় না– হাসিকেও বাঁচিয়ে রাখে নতুন ভাষায়।

রোমানরা বারবার আসে, বারবার ফিরে যায় মার খেয়ে। ছোটবেলায় সেটা মজার, নিশ্চয়ই। কিন্তু আসল কৌতুকটা তো রোমানদের নিয়ে নয়। গোসিনি-ইউদেরজো আসলে হাসেন ক্ষমতা, আমলাতন্ত্র, রাজনীতি, প্রচার, ভোগবাদ এবং আত্মম্ভরিতাকে নিয়ে। ‘অ্যাসটেরিক্স অ্যান্ড দ্য চিফটেন্স শিল্ড’-এ যেমন খাবার, রাজনীতি আর ডায়েট একাকার। ওদিকে, ‘অ্যাসটেরিক্স অ্যান্ড দ্য রোমান এজেন্ট’-এ জনমত আর প্রচারই হয়ে ওঠে অস্ত্র। জুলিয়াস সিজারের সাম্রাজ্য বিশাল– কিন্তু একটি ছোট্ট গ্রামের মানুষজনের কাছে তার গুরুত্ব আশ্চর্য রকমের কম। কী আশ্চর্য!

এখানেই মূল তফাত দু’টি সিরিজের। টিনটিন যেন একটি অভিযাত্রা– তার বিভিন্ন পর্ব। অ্যাসটেরিক্স যেন একটি পাড়া। টিনটিনের জগৎ অজানার দিকে খোলা; অ্যাসটেরিক্সের গ্রাম
আর তার দৈনন্দিন ওঠাপড়ার স্পন্দন নির্দেশ করে আমাদের পরিচিত জীবনের দিকে। টিনটিনের পাশে আছে ক্যাপ্টেন হ্যাডক, আছে প্রফেসর ক্যালকুলাস, টমসন-টম্পসন, স্নোয়ি, এবং অন্যান্য চরিত্র। অ্যাসটেরিক্সের গ্রামে তেমনই আছে ওবেলিক্স, গেটাফিক্স, গ্রামের প্রধান, কামার, মাছওয়ালা এবং এক দুর্ভাগা গায়ক– যাদের দেখে মনে হয়, এদের প্রত্যেককেই আমরা নিশ্চয়ই চিনি, কোনও না কোনওভাবে।

আমাদের, অর্থাৎ বাঙালি পাঠকদের কাছে, অবশ্য টিনটিনের পৃথিবীর খানিকটা নিজস্ব রং আছে। টিনটিনের বাংলা যাত্রা শুরু হয় সম্ভবত ১৯৭৫ সালে, ‘আনন্দমেলা’-য়। অনুবাদে ‘স্নোয়ি’ হয়ে গেল ‘কুট্টুস’, ‘টমসন-টম্পসন’ হল ‘জনসন-রনসন’। ফলে আমাদের অনেকের কাছে তারা আর পুরো বিদেশি চরিত্র রইল না– যেন হয়ে গেল বাংলার শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নিজস্ব মানুষ। মূল নামের চেয়ে এই বাংলা নামগুলি হয়তো বেশি আপন লাগে কখনও কখনও।

ওদিকে ১৯৯৫-তে ‘গলযোদ্ধা অ্যাসটেরিক্স’ দিয়ে অ্যাসটেরিক্স সিরিজের অনুবাদ শুরু। অ্যাসটেরিক্সের ক্ষেত্রে অনুবাদের কাজ বোধকরি আরও কঠিন। কারণ, সেখানে চরিত্রের নামই অনেক সময় কৌতুক। মূল ফরাসি নামের শব্দখেলা অন্য ভাষায় বঁাচিয়ে রাখতে অনুবাদককে নতুন নাম বানাতে হয়– সব ভাষাতেই। ইংরেজিতে যেমন ‘গেটাফিক্স’, ‘ভাইটালস্ট্যাটিসটিক্স’ বা ‘ক্যাকোফোনিক্স’– এসব নামই যেন ছোট ছোট পাঞ্চলাইন। বাংলা সংস্করণেও সেই কৌশল এসেছে নানাভাবে। ‘ভাইটালস্ট্যাটিসটিক্স’ সেখানে হয়ে যায় ‘বিশালাকৃতিক্স’, ‘গেটাফিক্স’ হয় ‘এটাসেটামিক্স’, ‘ক্যাকোফোনিক্স’-এর নাম দেওয়া হয় কলরবিক্স। আসলে ভাল কমিকস-অনুবাদ তো শুধু ভাষা বদলায় না– হাসিকেও বাঁচিয়ে রাখে নতুন ভাষায়। আর অ্যাসটেরিক্সের সবচেয়ে বড় শক্তি বোধহয় এই ভাষার খেলায়। গোসিনি জানতেন, একটি নামও হতে পারে একটি রসিকতা, একটি বাক্যই হতে পারে একটি ব্যঙ্গচিত্র। আসলে ইতিহাসের পটভূমিতে বর্তমানকে বসিয়ে দিলে তৈরি হয়ে যায় দুর্দান্ত কার্টুন– অবশ্যই তার সঙ্গে যদি থাকে গোসিনি-ইউদেরজোর জাদুর ছোঁয়া।

ছোটবেলায় হ্যাডকের চিৎকারে হাসি পায়; বড় হলে তাঁর মধ্যে দেখা যায় বন্ধুত্ব, আনুগত্য আর অসহায় মানবিকতা।

টিনটিনের ছবিতে হার্জের লিগনে ক্লেয়ার– বা স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন রেখার শৈলী– যেন পরিষ্কার করে দেয় পৃথিবীটাকে। অ্যাসটেরিক্সে ইউদেরজোর অঁাকা শরীরগুলি একটু বেশি গোল, একটু বেশি চঞ্চল, একটু বেশি বেয়াড়া। ছবিগুলিও যেন কথা বলছে। বলা যায়, গোসিনি হাসি লিখতেন, আর সে-হাসিকে শারীরিক রূপ দিতেন ইউদেরজো।

ছোটবেলায় হ্যাডকের চিৎকারে হাসি পায়; বড় হলে তাঁর মধ্যে দেখা যায় বন্ধুত্ব, আনুগত্য আর অসহায় মানবিকতা। ছোটবেলায় ওবেলিক্সের রোমান-পেটানো নিছক আনন্দ; বড় হলে বোঝা যায়, এটি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক হাস্যকর বিদ্রোহ। বইগুলি তাই বদলায় না। আমরা বদলে যাই।

টিনটিন, না, অ্যাসটেরিক্স? দু’জনই। তবে দু’জনের কাছ থেকে আমরা আলাদা জিনিস শিখি। টিনটিন শেখায় অজানার দিকে এগিয়ে যেতে। অ্যাসটেরিক্স শেখায় ক্ষমতাকে অতিরিক্ত ভয় না পেতে। টিনটিন আমাদের কৌতূহলী করে। আর, অ্যাসটেরিক্স আমাদের একটু বেয়াড়া করে। গোসিনির জন্মশতবর্ষে মনে হয়, পৃথিবীর এই অদ্ভুত সময়ে– যখন প্রত্যেকে নিজেকে একটু বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে– অ্যাসটেরিক্সের সেই ছোট্ট গ্রামের এখনও আমাদের কিছু শেখানোর আছে। আর টিনটিন? সে বোধ হয় ইতিমধ্যেই বেরিয়ে পড়েছে তার পরের অভিযানে।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক আইএসআই কলকাতার অধ্যাপক
appubabale@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement