এই লেখার শুরুতেই মনে পড়ে গেল জগদ্বিখ্যাত ইতালিয়ান দার্শনিক লেখক উমবের্তো একো-র দু’টি বই। একটি, ‘অন আগলিনেস’। অন্যটি, ‘অন বিউটি’। দু’টি বইয়ের সারাৎসার হল, ‘বিউটি ইজ ফাইনাইট। আগলিনেস ইজ ইনফিনিটলি ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড মাচ মোর এন্টারটেনিং
টু এক্সপ্লোর।’ সৌন্দর্য সীমাবদ্ধ। কুরূপতা সীমাহীনভাবে সৃজনশীল, এবং তার অন্তরের অন্বেষণে পাওয়া যায় অনেক বেশি আনন্দ। অধিকাংশ মানুষ কিন্তু ‘সুন্দর’ এবং ‘কুৎসিত’-কে এভাবে দেখে না। যা দেখতে ভাল, তার প্রতি আমরা আকৃষ্ট হই, অন্তত আপাতভাবে। কিন্তু আমাদের মধ্যে অন্য এক নিহিত প্রবৃত্তিও কাজ করে। সেই প্রবৃত্তি ঈর্ষার।
কোনও কিছু সুন্দর যখন অন্যের অধিকারে, সে সুন্দরকে আমরা হিংসার চোখে দেখতে থাকি। এবং কোনও না কোনওভাবে সেই সুন্দরের গায়ে আমাদের আঁচড় পড়ে অনেক ক্ষেত্রেই। প্রতিবেশীর নতুন গাড়ির গায়ে আমাদেরই বাড়ির বাচ্চা আঁচড় টেনে ঝলমলে পালিশ চটিয়ে দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে কুৎসিত আনন্দ পায়। আবার পাড়ার মেয়ে চোখে-মুখে বুদ্ধির দীপ্তিতে আটপৌরে ভাবের বাইরে পা ফেললেই আমরা সেই ধৃষ্টতা বেশি দিন সহ্য করতে পারি না। তার চরিত্রহননের সহজ পথে আমাদের নিহিত প্রবৃত্তি আমাদের টেনে নিয়ে যায়। মোট কথা, নাগালের বাইরে ‘সুন্দর’-কে আমরা বেশি দিন ভাল চোখে দেখতে পারি না। ঈর্ষার দহন জাগিয়ে তোলে ক্ষতি করার তাড়না। কোনও প্রতিবেশীর মনে এমন ঈর্ষার দহন ও তাড়না কত ভয়ংকর হতে পারে এবং কোন পর্যায়ের ক্ষত ও ক্ষতির কারণ হতে পারে সেই বিদ্বেষ, সেটা সম্প্রতি দেখল মালদার ইংরেজ বাজারের বিনপাড়া এলাকার এক আটপৌরে পরিবার।
অন্যের পরিবারে, অন্যের সংসারে, অন্যের বাড়িতে আমরা ‘সুন্দর’ কিছু অনেকেই সহ্য করতে পারি না। অন্যের সম্পদ, অন্যের সংসার-সুখ, অন্যের সাফল্য– সবই হয়ে উঠতে পারে আমাদের অনেকের পক্ষে অসহনীয়।
এই পরিবারের ১৪ বছরের মেয়ে খুশি মণ্ডল। তার অপরাধ– সে ছিল দেখতে ভালো। আর বাসনমাজা, নাচ, লেখাপড়া, রিল বানানো– সব কাজে সে ছিল চৌকস। তার রিল পাড়ার অনেকেরই ভালো লাগত। সুতরাং খুশির বেশ নাম হয়ে গেল পাড়ায়। খুশির এক প্রতিবেশীর বাড়িতে জ্বলে উঠল অসূয়ার আগুন। তারা সুযোগ বুঝে খুশিকে বিষ মেশানো কোল্ড ড্রিংক খাইয়ে অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি পাঠায়। এবং খুশি মারা যায়। খুশিকে হত্যার মূল কারণ, প্রতিবেশীর কন্যাও তো খুশির বয়সি। কিন্তু খুশির মতো তার কেন চটক নেই! খুশি নাকি মারা যাওয়ার আগে বলে যায়, ওই প্রতিবেশী দম্পতি তাকে বলেছে, ‘তুই বড্ড বেড়েছিলি। এবার ওপরে যা।’
অন্যের পরিবারে, অন্যের সংসারে, অন্যের বাড়িতে আমরা ‘সুন্দর’ কিছু অনেকেই সহ্য করতে পারি না। অন্যের সম্পদ, অন্যের সংসার-সুখ, অন্যের সাফল্য– সবই হয়ে উঠতে পারে আমাদের অনেকের পক্ষে অসহনীয়। এবং আমাদের মধ্যে জেগে ওঠে অন্যের জীবনে এই সৌন্দর্যকে নষ্ট করার বিকৃত বাসনা। শেক্সপিয়রের ভাষায় এটাই ‘মোটিভলেস ম্যালিগনিটি’।
যে সৌন্দর্য প্রাপণীয় হল না, সেই সৌন্দর্যের প্রতি, ঈর্ষার দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আমরা কি সহজ সাড়া প্রসারিত করতে পারি?
