পশ্চিমবঙ্গে ভোট-পরবর্তী হিংসা বহু দশকের ঐতিহ্য। বাম আমলে সেই হিংসার চরিত্র তৃণমূল আমলেও অপরিবর্তিত থেকেছে। প্রতিপক্ষের পার্টি অফিস দখল দুই আমলেই দেখা গিয়েছে। পরাজিত দলের পরিচিত ‘দাবাং’ কর্মীদের পাড়াছাড়া ও গ্রামছাড়া করাও নৈমিত্তিক প্রবণতা। এলাকা দখলের মধ্য দিয়ে প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার কারণে হিংসার কম-বেশি প্রকোপ বরাবর দৃশ্যমান। ভোটের আগে-পরের খুনখারাপি নিয়ে সর্বভারতীয় স্তরে চর্চাও কম হয়নি। হিংসা রোখার চেষ্টাতেই ভোটের সময় কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানো ও নির্বাচন কমিশনের নানাবিধ নজরদারি বাড়ানো শুরু। এই ধরনের তৎপরতায় বিহার, উত্তর প্রদেশ কিংবা হরিয়ানায় ভোট-সংঘর্ষ ও সহিংসতা ধীরে ধীরে কমে গেলেও পশ্চিমবঙ্গে তা অব্যাহত। এবার ভোট কেটে গিয়েছে সেই কবে। অথচ হিংসা নিয়ে চর্চায় খামতি নেই।
এবার পশ্চিমবঙ্গের দু’-দফার ভোট পর্বে রক্ত না-ঝরলেও সর্বভারতীয় চর্চায় উঠে এসেছে ভোট পরবর্তী ‘জনরোষ’। তৃণমূল কংগ্রেসের তৃণমূল স্তরের নেতা-কর্মীদের ‘দলবাজি, তোলাবাজি ও অবিরাম অনাচার’-এর দরুন সাধারণ মানুষের রাগ ও ক্ষোভের বর্হিপ্রকাশ গণমাধ্যমে যতটা প্রতিফলিত, তার অনেক গুণ বেশি দেখা যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। স্থানীয় পর্যায়ের এসব কর্মীর অত্যাচারে সাধারণ মানুষ কতটা তিতিবিরক্ত, জ্বালামুখ-নির্গত ছোট ছোট লাভাস্রোত তার প্রমাণ। জনরোষ ফেটে পড়ার এমন ঢালাও উদাহরণ অতীতে দেখা যায়নি।
ফলপ্রকাশের পর থেকে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহের ঘোলাটে ভাব এখনও কাটেনি। ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বাম দলগুলির ঠাসবুনট সংগঠন তাসের ঘরের মতো ভেঙে গিয়েছিল।
যেমন দেখা যায়নি কোনও কিছুর তোয়াক্কা না-করে শীর্ষস্তরীয় নেতাদের মারধর করার এমন বেপরোয়া প্রবণতা এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে জনতার রাস্তায় নামা। ভোটের ফলপ্রকাশের পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দলীয় কর্মীদের সংযত থাকার কথা বলে চলেছেন। সহিংসতাকে রেয়াত না করার হুমকি দিচ্ছেন। এতে তৃণমূল পার্টি অফিস দখলের যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল তাতে রাশ টানা গেলেও ‘তোলাবাজি ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ নেতাদের গণপিটুনি কিন্তু কমেনি।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হাই কোর্টে ও বর্ষীয়ান সাংসদ অধ্যাপক সৌগত রায়কে তঁার নির্বাচনী কেন্দ্রে ‘চোর চোর’ শুনতে হয়েছে। সৌগতবাবুকে লক্ষ্য করে অগুনতি ডিমও ছোড়া হয়েছে। দু’জনের সৌভাগ্য, তঁাদের গায়ে কেউ হাত তোলেনি। কিন্তু ক্রমেই জনরোষের প্রকোপ বেড়েছে। জনতা আরও দুঃসাহসী হয়েছে। পিটুনি খেতে হয়েছে সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মানুষ কতটা খেপে থাকলে এমন ধরনের ঘটনা ঘটে সহজেই অনুমেয়। পাশাপাশি এটাও ঠিক, জনরোষ ঠেকানোর কোনও দৃশ্যমান প্রচেষ্টা পুলিশ বা কেন্দ্রীয় বাহিনীর তরফে দেখা যায়নি। ফলে জনরোষের উস্কানিতে শাসকের প্ররোচনা কতটা তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে।
ফলপ্রকাশের পর থেকে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহের ঘোলাটে ভাব এখনও কাটেনি। ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বাম দলগুলির ঠাসবুনট সংগঠন তাসের ঘরের মতো ভেঙে গিয়েছিল। সিপিএমের কর্মী-সমর্থকদের এক বিরাট অংশ রাতারাতি তৃণমূলে ভিড়েছিলেন। শুরু হয়েছিল দলে ‘আদি ও নব’-র দ্বন্দ্ব। এ-ও এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ঐতিহ্য। এবারও সেই ঐতিহ্যের ঝলক দেখা যাচ্ছে। তৃণমূলের হয়ে যঁারা ১৫টা বছর দাপাদাপি করেছেন, তঁাদের একাংশের মধ্যে শুরু হয়েছে দলবদলের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। বিজেপির ‘পবিত্রতা’ রক্ষায় শমীক ভট্টাচার্য প্রতিদিন নিয়ম করে ‘বেনোজল না ঢোকানো’-র অভিপ্রায়ের কথা শুনিয়ে গেলেও নিচু স্তরে বালির বঁাধ অক্ষত রাখা যাচ্ছে না। মমতাও বুঝতে পারছেন, ঘর অটুট রাখা কঠিন। বিধায়ক মহলে নানা দোলাচল। সাংসদদের মনে অঢেল প্রশ্ন। বিজেপির শীর্ষ মহলেও বিবিধ দ্বন্দ্বের পাশাপাশি চলছে নানা ধরনের অঙ্কের হিসাব। তৃণমূল সংসদীয় দলে ভাঙন ধরিয়ে লোকসভা ও রাজ্যসভায় দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার মতো উপস্থিত। এই সুযোগ কাজে না লাগানোর মতো বোকামি করা কি ঠিক? শাসক দলের শীর্ষ মহলে এ নিয়ে আলোচনা চলছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বিপদ কত ভয়ংকর সম্ভবত এই প্রথম তিনি উপলব্ধি করছেন। তঁার আহ্বানে দলীয় নেতাদের সাড়া না দেওয়া, তঁার ডাক উপেক্ষা করে ৮০ জনের মধ্যে ৬০ জন বিধায়কের গরহাজির থাকা অবশ্যই অশনি সংকেত। শেষের দিনগুলো কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, নির্বাচিত নেতা ও কর্মীদের এই আচরণ হয়তো তারই ট্রেলার। ফেউয়ের ডাকের মতো সংকেতবাহী। কীভাবে এই বিপদের মোকাবিলা করবেন তা তঁাকেই ঠিক করতে হবে। নিতে হবে সেই সিদ্ধান্ত যা তঁাকে রাজনীতির প্রবাহে ভাসিয়ে রাখবে।
কতটা তা হতে পারবে সে অবশ্য বড় কঠিন প্রশ্ন। কারণ, চুরচুর হয়ে যাওয়া মমতার কাছে কংগ্রেস একমাত্র সাহারা হলেও ‘আপ’ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের কাছে রাহুল এখনও ‘মিত্র’ নন।
আধুনিক জার্মানির রূপকার বিসমার্কের অমর উক্তি ‘রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প’– এই আবহে নতুনভাবে আলোচনায় উঠে আসছে। বিপর্যস্ত মমতার পাশে এসে দঁাড়িয়েছে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রত্যেকে। বিশেষ করে রাহুল গান্ধী, যঁার নেতৃত্ব মমতা কোনও দিন মেনে নেননি, যঁাকে ‘নেতা’ বলে কখনও বিবেচনা করেননি। সেই রাহুল দৃঢ়ভাবে পাশে দঁাড়িয়ে বোঝাতে চাইছেন, বিপদের বন্ধুই প্রকৃত। বিজেপির এই রমরমার মধ্যে কংগ্রেসের হাল ‘কানার মধ্যে ঝাপসা’-র মতো। কেরলমে তারা সরকার গড়েছে। প্রায় ছয় দশকের খরা কাটিয়ে তামিলনাড়ুতে সরকারের শরিক হতে পেরেছে। কর্নাটকে নির্বিঘ্নে নেতা বদল ঘটিয়েছে। পাঞ্জাবে পুরনিগম, পুরসভা ও পঞ্চায়েত ভোটে দ্বিতীয় হয়েছে। এখন তারা চেষ্টা করছে ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে জমাট করে তুলতে। রাহুল চাইছেন, ২০২৯-এর লোকসভা ভোটে বিজেপির মোকাবিলায় ‘ইন্ডিয়া’ এখন থেকেই প্রস্তুত হোক। তা করতে গেলে সর্বভারতীয় পর্যায়ে মমতার সান্নিধ্য জরুরি।
কতটা তা হতে পারবে সে অবশ্য বড় কঠিন প্রশ্ন। কারণ, চুরচুর হয়ে যাওয়া মমতার কাছে কংগ্রেস একমাত্র সাহারা হলেও ‘আপ’ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের কাছে রাহুল এখনও ‘মিত্র’ নন। ডিএমকে নেতা এম. কে. স্ট্যালিনের কাছেও। তামিলনাড়ুতে ভোটের ফল প্রকাশের পর রাহুল যেভাবে তড়িঘড়ি বিজয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে সরকারের শরিক হয়েছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দলীয় স্বার্থে তা আবশ্যক হলেও ওই বিচ্ছেদ স্ট্যালিন মেনে নিতে পারেননি। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিক দুই দলই। এখন চেষ্টা চলছে নতুন শক্তি বিজয়ের দলকেও জোটে শামিল করা। কংগ্রেস, ডিএমকে ও টিভিকে-র শান্তি স্বস্ত্যয়নে মমতা অনুঘটক হতে পারেন।
মহারাষ্ট্রের এক সময়কার জনপ্রিয় নেতা সুশীলকুমার শিন্ডে স্বপ্ন দেখতেন দলত্যাগী সব কংগ্রেসিকে ফেরত আনার। শিন্ডে ছিলেন মনমোহন সিং ক্যাবিনেটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছিলেন। প্রকাশ্যেই ওই ইচ্ছার কথা তিনি একাধিকবার প্রকাশ করেছিলেন। এনসিপি নেতা শরদ পাওয়ারকে কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। একটা সময় তা নিয়ে খুব আলোচনা হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর রাজধানীর রাজনৈতিক অলিন্দে সেই সম্ভাবনার গুনগুনানি এখন আবার নতুন করে শোনা যাচ্ছে। মনে করা হচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি এই সম্ভাবনা সাকার করে তুললে দেশের রাজনৈতিক ক্যানভাস আবার ঝলমলে রঙিন হয়ে উঠতে পারে।
অবসরে যাওয়া ৮৭ বছরের বৃদ্ধ সুশীলকুমার শিন্ডে এখনও বিশ্বাস করেন, বিজেপির মোকাবিলা করতে হলে কংগ্রেস থেকে জন্ম নেওয়া জম্মু-কাশ্মীরের পিডিপি, মহারাষ্ট্রের এনসিপি, ওড়িশার বিজেডি, তেলেঙ্গানার বিআরএস, অন্ধ্রপ্রদেশের ওয়াইএসআর কংগ্রেস কিংবা পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস– প্রত্যেকের ঘরে ফেরা দরকার। ‘হাইকমান্ড’-এর নামে ব্যক্তি বিশেষ নন, দলের সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে আঞ্চলিক নেতাদের নিয়ে গড়া ‘প্রেসিডিয়াম’। সুশীলকুমার শিন্ডে মনে করেন, আগামী দিনের নতুন কংগ্রেস ওভাবেই গড়ে তোলা উচিত। কেননা, রাজনীতি যেভাবে এগচ্ছে, তাতে ছাড়া-ছাড়া ছন্নছাড়ারা কেউ-ই প্রাসঙ্গিক থাকতে পারবে না।
হয়তো আকাশকুসুম কল্পনা। কিন্তু অযৌক্তিক কি? রাজনীতি তো সম্ভাবনার শিল্প।
(মতামত নিজস্ব)
saumyabandyo@gmail.com
