নির্বাচন যত আসছে এগিয়ে, তত ঝেঁপে আসছে প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতির বৃষ্টি। নেতানেত্রীরা কথা দিচ্ছেন। ছড়িয়ে দিচ্ছেন দেদার শপথ ও অঙ্গীকারের হরির লুট। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেওয়া যত সহজ, প্রতিজ্ঞা রাখা ততই কঠিন। তবে এ-কথাও ঠিক, নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পূরণের আপ্রাণ চেষ্টাও দেখা যায় নেতানেত্রীদের মধ্যে।
বর্তমান যুগে কেউ প্রতিশ্রুতি দিলে বা শপথ নিলে আমরা সহজে তা বিশ্বাস করি না। এই যুগে সমাজ ও সংসার অনেক বেশি সিনিকাল। পুরাকালে তেমন ছিল না। ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার প্রতি কোনও সংশয়ের স্থান নেই মহাভারতে। তবে, মহাভারত থেকে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য– সর্বত্রই যেমন ছড়িয়ে আছে সংকল্প এবং প্রতিজ্ঞা, তেমনই সেখানে শপথভঙ্গ ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতিরও অভাব নেই।
বর্তমান যুগে কেউ প্রতিশ্রুতি দিলে বা শপথ নিলে আমরা সহজে তা বিশ্বাস করি না। এই যুগে সমাজ ও সংসার অনেক বেশি সিনিকাল।
অর্জুন– দ্রৌপদীর কাছে প্রতিশ্রুত ছিলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কর্ণ এবং জয়দ্রথকে হত্যা করে অপমানের প্রতিশোধ নেবেন। অর্জুন কথা রেখেছিলেন। কর্ণ দুর্যোধনকে কথা দিয়েছিলেন তিনি অর্জুনকে পরাজিত করবেন এবং হত্যা করবেন। কিন্তু মহাকাব্যের সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি। কর্ণই নিহত হলেন অর্জুনের হাতে। মানুষ কথা দেয়, শপথ করে ভাবাবেগ তাড়িত হয়ে, অথবা স্বার্থের তাগিদে। অনেক সময়ই সেই প্রতিশ্রুতির নেপথ্যে বাস্তববোধ থাকে না। তাছাড়া ভাগ্যও অনেক সময় তৈরি করে এমন পরিস্থিতি, যার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিজ্ঞা রাখা সম্ভব হয় না। তবে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও, ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে হোমারের মহাকাব্যে ওডিসির অ্যাজ্যাক্স তার প্রতিশ্রুতি রেখেছিল। কথা দিয়েছিল, গ্রিক নৌবাহিনীকে সে রক্ষা করবেই। এবং সে নিজের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনেও কথা রেখেছিল।
মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ভয়াবহ ছলনা কীভাবে ডেকে আনে ধ্বংস, সেটা দেখিয়েছেন ইউরিপিদিস তাঁর ‘মেদিয়া’ নাটকে।
মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ভয়াবহ ছলনা কীভাবে ডেকে আনে ধ্বংস, সেটা দেখিয়েছেন ইউরিপিদিস তাঁর ‘মেদিয়া’ নাটকে। জেসন, স্ত্রী মেদিয়াকে, চিরকালীন প্রেমের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এবং সেই ছলনার ফল কী ভয়ংকর হতে পারে, বলে গিয়েছেন ইউরিপিদিস। এই প্রসঙ্গে বলতেই হয়, পৃথিবীর সমস্ত বিয়ের প্রতিশ্রুতিই চিরকালীন প্রেম ও বিশ্বস্ত থাকার। এই প্রতিশ্রুতি যদি রাখতে পারা যেত, তাহলে প্রতিদিন সারা পৃথিবীতে তাসের বাড়ির মতো ভেঙে পড়ত না সংসার আর সহবাস!
এই প্রসঙ্গে ভি. এস. নয়পলের উপন্যাস ‘আ হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস’-এর কথা ভাবা যেতে পারে। মিস্টার বিশ্বাসের আশ্রয় স্বপ্ন কি বারবার চুরমার হচ্ছে না মিথ্যা প্রতিশ্রুতির আঘাতে ? আর, সলমন রুশদির “মিডনাইট’স চিলড্রেন” উপন্যাসের মূল বিষয় কি নয় ঔপনিবেশিক ভারতের ছলনাময় প্রতিশ্রুতি? যে-ছলনার পরিব্যাপ্ত জালের মধ্যে মিথ্যা আশায় বড় হয়ে উঠতে লাগল ভারতের স্বাধীনতার মধ্যরাত্রে জন্মানো ছেলেমেয়েরা? তারা কি নয় ছলনাময় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির শিকার? একটি পুরো প্রজন্ম কি নষ্ট হয়ে গেল না মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ছলনায়, ভিত্তিহীন আশাবাদের ফাঁদে পড়ে?
