‘মধ্যরাত’ শব্দটা মোটেও ভালো নয়। শুনলেই বেশিরভাগ মানুষের গা ছমছম করে। মনে জাগে খটকা। শব্দটার গায়ে লেগে আছে অমঙ্গলের অনুষঙ্গ। ছাড়ানো যায় না। সত্যি বলতে, সব দেশে অধিকাংশ মানুষের মনে মধ্যরাত জড়িয়ে আছে আচমকা আপদ ও আতঙ্কের সঙ্গে। মধ্যরাত– এই একটু শব্দ আমাদের বুকেই শুধু ধরায় না কাঁপন। কাঁপায় আমাদের স্মৃতিকে।
‘মিডনাইট শেকস্ দি মেমরি’– অমোঘ উচ্চারণে বলেছেন টি. এস. এলিয়ট ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’ কাব্যে। সত্যিই স্মৃতি কেঁপে ওঠে যুগে যুগে মাঝরাতের তাণ্ডবের কথা ভাবলে। মধ্যরাতে মানুষের সর্বনাশ। মধ্যরাতে নিয়তির আঘাত। মধ্যরাতের মানুষের অসহায় আর্তি। সবকিছুর ছায়া পড়েছে পুরাণে, ইতিহাসে, সাহিত্যে। মানুষের বুঝি মুক্তি নেই মাঝরাতের ভয় থেকে। তারই সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ মাঝরাতেই আঘাত হানার ছক সাজায়।
রাতের অন্ধকার নামলেই এখনও শুরু হয় বোমা, মিসাইল হামলা, ধ্বংসের মধ্যে মানুষের আর্তনাদ।
ঘড়ি ধরে মাঝরাতেই বাংলার রাজনীতিতে আকস্মিক এমনই আঘাত নেমে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী তাকে যথার্থই বলেছেন, ‘মধ্যরাতে গুপ্ত তাণ্ডব’। মাঝরাতে কড়া নাড়ার শব্দে কার না আঁতকে ওঠে মন ? শাসকের ক্ষমতার জাহির এবং শাসনের দাপট তাই বেছে নেয় মাঝরাতেই কড়া নাড়ার অস্ত্র।
হালের বাস্তব থেকে প্রাচীন কাব্যে যাওয়া যাক। ট্রয়ের যুদ্ধের বিশ বছর পর, হোমারের নায়ক ইউলিসিস ইথাকায় বাড়ি ফিরল রাতের অন্ধকারে ভিখিরির ছদ্মবেশে। এবং বাড়ি ফিরে দেখল কিছু পুরুষ তার রাজত্ব ও স্ত্রীকে ভোগ করছে। তখন কিন্তু ইউলিসিস এসব পুরুষের দরজায় নেড়ে ছিল মাঝরাতের কড়া। এবং তাদের খুন করে। আবার আমাদের মহাকাব্য মহাভারতে পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারতে তাদের লাক্ষাগৃহে গভীর রাতে আগুন লাগিয়ে ছিল কৌরবরা।
কাব্য থেকে বাস্তবে আসা যাক ফিরে। একাদশ শতকে অন্ধকার রাত্রে নিরীহ মানুষের উপর মহম্মদ ঘোরির হামলা এবং নাশলীলা ভারতের ইতিহাসে ও মানসে রেখে গিয়েছে রক্তাক্ত অন্ধকারের চিরকালীন আতঙ্ক।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মধ্যরাতের যে-হত্যালীলা পৃথিবী দেখেছে, সেই রক্তঝরানো রাত কি বাস্তব নয়? রাতের অন্ধকার নামলেই এখনও শুরু হয় বোমা, মিসাইল হামলা, ধ্বংসের মধ্যে মানুষের আর্তনাদ। ১৯৮৪-তে ভারতীয় সেনার ‘অপারেশন ব্লু’! তাও কি ছিল না, আক্ষরিক অর্থে, মধ্যরাতের অতর্কিত আক্রমণ? ডিলান টমাসের কবিতা, ছোটগল্প থেকে এ. কে. রামানুজনের কাব্য, সর্বত্র মধ্যরাত আর্তিময়। বিশেষভাবে, রামানুজনের ‘মিডনাইট পোয়েমস’ কি বহন করছে না মধ্যরাতের প্রতি মানুষের আদিম আতঙ্ক, ‘প্রাইমাল ফিয়ার’? সেই অনুভূতি আমাদের স্মৃতিতে কাঁপন ধরায়। মনে হয় মধ্যরাতের ভয় থেকে থেকে মানুষের বুঝি মুক্তি নেই।
আর তখুনি হঠাৎ মনে আসতে পারে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের “মিডসামার নাইট’স” ড্রিম! যেন হঠাৎ আলোর ঝলকানি। মধ্যরাতেও সোনালি স্বপ্ন!
