shono
Advertisement
Rabindranath Tagore

পারস্যে রবীন্দ্রনাথ, আজকের রক্তাক্ত ইরানে কবি চেয়েছিলেন শান্তির বারিধারা

এখনও স্মৃতিতে উজ্জ্বল, তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা সাহিত্যের এক ছাত্রীর হাতে সেই ভাষায় অনূদিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটি। বুদ্ধিদীপ্ত মুখ। আলাপে জানিয়েছিল, প্রতিবাদী রবীন্দ্রনাথকে তার বেশি ভাল লাগে। সত্যিই তো, নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য জীবদ্দশায় কখনও কোনও অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেননি কবিগুরু।
Published By: Kishore GhoshPosted: 06:23 PM Mar 23, 2026Updated: 06:37 PM Mar 23, 2026

১৯৩২ সালে সম্রাট রেজা শাহ পহলভির পক্ষ থেকে পারস‌্য সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। সরকারি উদ্যোগে সাংস্কৃতিক পীঠস্থান শিরাজ শহরে ৬ মে বিখ্যাত ফারসি কবি শেখ সাদির মাজার চত্বরে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন সাড়ম্বরে পালিত হয়। সে সময়ে উপচে পড়া ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হয়! এখনকার রক্তাক্ত ইরানে তখনও কবি চেয়েছিলেন শান্তির বারিধারা। লিখছেন সৌমেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। 

Advertisement

আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধে আরবে বসন্ত এই মুহূর্তে যেন রক্তে সিক্ত। ঐতিহ্যশালী ও প্রাচীন সভ‌্যতা-সমৃদ্ধ ইরান এখন যুদ্ধবাজ আমেরিকার খপ্পরে আর্ত, অসহায়। মনে পড়ে, আমার ঘুরে দেখা শান্তিপূর্ণ ইরানকে। ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেরা সুশোভিত-সুবাসিত গোলাপ বাগিচা। অথবা প্রাণবন্ত বেগুনি রঙের জাফরান ফুলের বাগান। সেসব এখন হয়তো ভস্মে পরিণত হয়েছে।

এখনও স্মৃতিতে উজ্জ্বল, তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা সাহিত্যের এক ছাত্রীর হাতে সেই ভাষায় অনূদিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটি। বুদ্ধিদীপ্ত মুখ। আলাপে জানিয়েছিল, প্রতিবাদী রবীন্দ্রনাথকে তার বেশি ভাল লাগে। সত্যিই তো, নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য জীবদ্দশায় কখনও কোনও অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেননি কবিগুরু। তার অজস্র প্রমাণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ‘সভ্যতা’-র নামে স্বার্থপরতা, শোষণ ও যুদ্ধের ভয়াবহতার রূপ দেখে মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে বীতশ্রদ্ধ রবীন্দ্রনাথ ‘সভ্যতার সংকট’ (১৯৪১) প্রবন্ধটি লেখেন। মূলত বিশ্বব্যাপী নৈতিক ও আত্মিক সংকটের কথাই উল্লিখিত হয়েছে সেখানে। বলা বাহুল‌্য, তা এখন প্রতি মুহুর্তে সমান প্রসাঙ্গিক।

‘বিশ্বকবি’-র সঙ্গে পারস্যের (বর্তমান ইরান) গভীর সখ্য তৈরি হয়েছিল। দু’বার পারস্যে গিয়েছিলেন। ১৯৩২ এবং ’৩৪ সালে। দ্বিতীয়বার বিখ‌্যাত ফারসি কবি ফেরদৌসির জন্ম সহস্রাব্দ উপলক্ষে আমন্ত্রিত হয়ে। ১৯২৫ সালে পারস্যরাজ রেজা শাহ পহলভি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ইরানকে বিশ্বের অন‌্যতম প্রধান শক্তিধর দেশ হিসাবে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। তাই অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথের মিশর সফর তৎকালীন ইরানের শিক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আর্কষণ করে। সেই সময়পর্বে তঁাদের মনে হয়েছিল, এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথই বুঝি একমাত্র ব‌্যক্তিত্ব– যিনি এই সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের বার্তাটি বহন করতে পারবেন। তত দিনে ইরানও রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকৃষ্ট। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পর থেকেই ইরানের সাহিত্যসমাজ রবীন্দ্রনাথের প্রতি উৎসাহিত হয়। ফরাসি, জার্মান, ইংরেজিতে অনূদিত হওয়া রবীন্দ্র রচনাগুলি তারা পড়তে শুরু করে।

ইরানি সংস্কারক মুহাম্মদ তাকি খান পিসিয়ান ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সালে বার্লিনে থাকাকালীন রবি-কবিতা ফারসিতে প্রথম অনুবাদ করেন। ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্রাট
রেজা শাহ পহলভির পক্ষ থেকে কবিকে ইরান সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। রবীন্দ্রনাথ তা সানন্দে গ্রহণও করেন। কবির উদ্দেশ্য ছিল: পারস্যের শাশ্বত স্বরূপটি জানা, যে ‘পারস্য আপন প্রতিভায় উদ্ভাসিত’। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর হাফেজের বড় অনুরাগী ছিলেন। জোড়াসঁাকো ঠাকুরবাড়িতে দেবেন্দ্রনাথ-সহ অনেকেই ফারসি ভাষা ও সাহিত্য নিয়মিত চর্চা করতেন। অতএব, পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলা থেকেই ফারসি কবিদের কাব্যভুবনে বিচরণ করতেন। বালক কবির মানসলোকে পারস্য ছিল এক ‘ভাব রসের পারস্য, কবির পারস্য’।

রবীন্দ্রনাথ জীবনে মাত্র দু’বার বিমানে যাত্রা করেছিলেন। প্রথমবার ১৯২১ সালে লন্ডন থেকে প্যারিস। দ্বিতীয়বার কলকাতা থেকে ইরান। ৭০ বছরের কবির শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে ইরান সরকার তঁার সফরের ব্যয়ভার বহন করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ১১ এপ্রিল যাত্রীবাহী ‘ডাচ এয়ার মেইল ফকার’ বিমানে কলকাতা থেকে রওনা হন। এলাহাবাদ, যোধপুর, করাচি, ইরানের জাস্ক শহর হয়ে অবশেষে বন্দর নগরী বুশেহরে পৌঁছন ১৩ এপ্রিল। এই বিমানযাত্রা কবির জন্য ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। কবির সফরসঙ্গী হয়েছিলেন পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী, অমিয় চক্রবর্তী, কেদারনাথ চট্ট্যোপাধ্যায়, বম্বের পারসি সম্প্রদায়ের সদস্য বিশিষ্ট আইনজীবী ও কবির শুভানুধ্যায়ী দিনশাহ ইরানি।

রবীন্দ্রনাথের ইরান সফরের আগে স্থানীয় সংবাদপত্রগুলি কবির উপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ প্রকাশ করে। বুদ্ধিজীবী বোজোর্গ আলাভি কর্তৃক তেহরানের বিখ্যাত ‘প্রভারেশ’ সংবাদপত্রে ফারসিতে অনূদিত রবীন্দ্রনাথের কবিতাসমূহ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
ইরান সফরের সময় রবীন্দ্রনাথ রাজধানী তেহরান ছাড়াও বুশেহর, শিরাজ, ইসফাহান, পার্সেপোলিস-সহ বেশ কিছু ছোট-বড় শহর পরিদর্শন করেন। একদিকে পারস্যের বর্ণময় ইতিহাস অন‌্যদিকে বসন্তকালে দেশটির নৈস্বর্গিক রূপ তাঁকে কবিকে মুগ্ধ করেছিল। তাঁর এই সফরকে কেন্দ্র করে ইরানের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হয়। তেহরানের রাজপ্রাসাদে পারস্যরাজ রেজা শাহ পহলভি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রদেশের গর্ভনর, শিক্ষাবিদ, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের গুণী জনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভারতীয় কবিকে একঝলক দেখার জন্য সর্বত্র ভিড় উপচে পড়ে। এমনকী, ইরান সরকারের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক পীঠস্থান শিরাজ শহরে ৬ মে বিখ্যাত ফারসি কবি শেখ সাদির মাজার চত্বরে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন সাড়ম্বরে পালনের সময়ে উপচে পড়া ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনাবাহিনী পর্যন্ত্ত মোতায়েন করতে হয়েছিল!

ইরানি সংস্কারক মুহাম্মদ তাকি খান পিসিয়ান ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সালে বার্লিনে থাকাকালীন রবি-কবিতা ফারসিতে প্রথম অনুবাদ করেন। ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্রাট
রেজা শাহ পহলভির পক্ষ থেকে কবিকে ইরান সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। 

জন্মদিন পালনের আগের দিন ইরানের ধর্ম ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কবিকে সাম্মানিক পিএইচডি ডিগ্রিতে ভূষিত করা হয়। কবির জন্মদিন উপলক্ষে ইরানিদের আতিথেয়তা, নানারকম উপহার, শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় আপ্লুত রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি হয়েছিল যে, তিনি যেন দ্বিতীয়বার জন্মালেন। আরও মনে হয়েছিল, ইরানের বন্ধুদের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে তিনি সর্বার্থেই যেন এক সর্বজনীন মানুষ হয়ে উঠেছেন।

প্রিয় কবি হাফেজের সমাধির পাশে বসে আত্মমগ্ন বিশ্বকবির উপলব্ধি হয়েছিল– ‘আজ কত শত বৎসর পরে জীবন মৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুশাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক’। তিনি হাফিজের কাব্যগ্রন্থ থেকে বেশ কিছু কবিতা পাঠ করেছিলেন। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, হাফিজের কাব্যগ্রন্থ স্পর্শ করে
কেউ যদি চোখ বুজে মনে মনে কিছু চায়, তাহলে সেই বাসনা পূরণ হয়। প্রিয় কবির কাব্যগ্রন্থ স্পর্শ করে কবিগুরু বুঝি মনে মনে কামনা করেছিলেন– ‘ধর্ম নামধারী অন্ধতার প্রাণান্তিক ফাঁস থেকে ভারতবর্ষ যেন মুক্তি পায়’!

জন্মদিন পালনের আগের দিন ইরানের ধর্ম ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কবিকে সাম্মানিক পিএইচডি ডিগ্রিতে ভূষিত করা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ইরান-সফরে জোর দিয়েছিলেন দুই দেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সংযোগে। তাঁর অনুরোধে পারস্য সম্রাট ইরানি পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ ইব্রাহিম পুরদাউদকে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়েছিলেন ইরানি সাহিত্য পড়াতে। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ইরানের শিরাজের সরকারি ‘শেরিন হাই স্কুল’-এর নাম বদলে ‘টেগোর হাই স্কুল’ রাখা হয়।

পারস্যে থাকাকালীনই ২৫ বৈশাখ, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে রচিত তাঁর বিখ্যাত ‘পারস্যে জন্মদিনে’ কবিতাটি সেখানকার শুভানুধ্যায়ীদের শুনিয়েছিলেন কবি। দেশটির মঙ্গলকামনায় সংশ্লিষ্ট কবিতায় উল্লিখিত শেষ পঙ্‌ক্তিটি– ‘ইরানের জয় হোক’– বর্তমান যুদ্ধের পরিমণ্ডলে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করি।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক বহুজাতিক সংস্থায়
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ
sinobasan@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement