'এআই' ব্যাপক ব্যবহার করে লেখা হয়েছে বই। পাঠকদের এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ইউকে-র বিখ্যাত প্রকাশনী সংস্থা তুলে নিল সেই উপন্যাস!
'লিখনে কী ঘটে?' এই নিয়ে সাহিত্যের শব্দকর্মীগণ বারবার সরব হয়েছেন। ব্যাখ্যা দিয়েছেন, বিশ্লেষণ করেছেন। তা হতে পারে কোনও একটি বিশেষ বই ঘিরে। তা হতে সার্বিক সাহিত্যসৃষ্টির প্রেক্ষিত ধরে। 'নবপর্যায় বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় বৈশাখ ১৩০৮ থেকে কার্তিক ১৩০৯ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল রবীন্দ্র-উপন্যাস 'চোখের বালি'। সেটি বই আকারে বের হয় ১৩০৯ বঙ্গাব্দেই। এ উপন্যাসের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ 'সূচনা' বলে একটি স্বতন্ত্র গদ্যাংশ যোগ করেছেন। যা বলছে অনেকগুলি কথা। যেমন- 'চোখের বালি' উপন্যাসটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের পথযাত্রার পরম্পরায় 'আকস্মিক'। একদা 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় 'বিষবৃক্ষ'-র মতো 'কাল্ট' উপন্যাসের রস সম্ভোগ বাঙালি পাঠক করেছিল। এবার 'নবপর্যায় বঙ্গদর্শন'-এর জন্য সহসম্পাদকের অনুরোধ রবীন্দ্রনাথ ফেলতে পারেননি। আর, যথার্থ 'আধুনিক' উপন্যাসের খোঁজে অবতরণ করেন 'মনের সংসারের কারখানাঘরে', যেখানে আগুনের জ্বলুনি ও হাতুড়ির পিটুনি থেকে দৃঢ় ধাতুর মূর্তির মতো করে চরিত্ররা জেগে উঠতে থাকে। 'মায়ের ঈর্ষা' যে কত বিপজ্জনক হতে পারে, তা দেখাতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পশুশালার দরজা খুলে মনের হিংস্র ঘটানবলি বেরিয়ে আসার স্রোতে পাঠক মজে বটে, তবে একটি প্রশ্নও উঠে আসে: লেখক যদি স্বয়ং বলে দেন কী উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি উপন্যাসে হাত দিয়েছেন, তাও আবার বইয়ের শুরুতেই, তাহলে তো পড়ার আনন্দ মাটি হতে বাধ্য। শৈলীর এমন অবলম্বন কি বাস্তবেই প্রয়োজনীয়? পাঠক নিজের মতো করে লেখার নির্যাস শুষে নেবে, এই তো কাম্য!
'লিখনে' অতএব 'কী ঘটে'- তা যতক্ষণ প্রকাশ করা হচ্ছে ব্যক্তিগত অনুভূতির ভূমি থেকে, এবং তাতে লেখার প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শিত হচ্ছে না, ততক্ষণ তা সাহিত্যের সম্পদ। লেখকের ভয়, পিছুটান ত্রাস প্রতিফলিত হয় সেই আঁতের কথায়। লেখকের যাতনা, বিভ্রম, মুক্তির স্বপ্ন ডানা মেলে সেই প্রতিফলনে। সব মিলিয়ে লিখনে যা ঘটে, তা লেখকের অন্তরের মনচ্ছবিকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করে। কিন্তু হালফিলে অন্য একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে, এবং তা অভাবিত না হলেও বিপজ্জনক নিশ্চয়ই।
মার্কিন লেখক-কবি মিয়া ব্যালার্ডের 'শাই গার্ল' নামের একটি উপন্যাস সম্প্রতি বইবাজার থেকে তুলে নিয়েছে ইউকে-র বিখ্যাত প্রকাশনী সংস্থা 'হ্যাচে'। পাঠক ও অনুরাগীদের অভিযোগ- এ বইটি লিখতে তিনি 'এআই' বা 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা'-র নেহাত সহায়তা নেননি, বরং ব্যাপকভাবে 'এআই' ব্যবহার করেই বইটি লিখেছেন। মনের কারখানার এমন স্বরূপ সত্যি অচেনা! 'এআই'-কে গবেষণায় ব্যবহার করার নিয়মকানুন তৈরির দিকে শিক্ষাজগতের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সক্রিয়। কিন্তু মৌলিক গল্প-উপন্যাসের বেলায় এমন নিয়ম কে তৈরি করবে, কী করেই-বা তা তৈরি করা সম্ভব হবে? কিন্তু পাঠকের অভিযোগের ভিত্তিতে যদি বই তুলে নিতে হয় প্রকাশককে, তাও তো বিড়ম্বনা। এর চেয়ে লিখিত বস্তুর প্রতি পাঠকের আগাম অনুধ্যান টেনে নেওয়ার চেষ্টাই কি শ্রেয়?
