কোভিড টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। এই ‘নো ফল্ট’ ক্ষতিপূরণ নীতি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যা সরকারকে মনে করিয়ে দিল– জনস্বাস্থ্য কেবল পরিসংখ্যানের ম্যাজিক নয়, তা মানুষের জীবন, আস্থা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
কোভিড টিকা নেওয়ার পরে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট নীতি প্রণয়নে সম্প্রতি কেন্দ্রকে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই ধরনের ঘটনার জন্য সরকারকে একটি নির্দিষ্ট ত্রুটিহীন (‘নো ফল্ট’) ক্ষতিপূরণ নীতি তৈরি করতে হবে। ২০২১ সালে কোভিশিল্ডের প্রথম ডোজ নেওয়ার পরে দুই তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে একগুচ্ছ মামলা দায়ের করা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। আদালতে আবেদনকারীদের দাবি ছিল, ওই দুই তরুণী টিকা নেওয়ার পরে শারীরিক অসুস্থতায় মারা গিয়েছে।
এই নির্দেশ এ-কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ যে, ভারতে এত দিন পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালিত জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে দায় নির্ধারণের প্রশ্নে যে ‘ত্রুটিভিত্তিক’ ব্যবস্থা চালু ছিল, এই রায় কার্যত সেই কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করে এক মানবিক ও বাস্তবসম্মত বিকল্পের দিকে পথ দেখাল। প্রসঙ্গত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি দীর্ঘ দিন ধরে দাবি করে আসছিল, রাষ্ট্র পরিচালিত একটি কর্মসূচির ফলে যদি এমন ক্ষতি হয়, তবে তার জন্য কোনও নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। সরকার এত দিন যুক্তি দিয়েছিল যে, টিকাকরণ ছিল স্বেচ্ছাভিত্তিক, গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার অত্যন্ত কম, এবং ক্ষতিগ্রস্তরা চাইলে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে পারে। কিন্তু আদালত এই যুক্তিকে অবাস্তব বলে খারিজ করে। সাধারণ নাগরিকের পক্ষে বহুজাতিক ওষুধ সংস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালানো প্রায় অসম্ভব– এই মৌলিক সত্যটিকেই গুরুত্ব দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
২০২১ সালে কোভিশিল্ডের প্রথম ডোজ নেওয়ার পরে দুই তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে একগুচ্ছ মামলা দায়ের করা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। আদালতে আবেদনকারীদের দাবি ছিল, ওই দুই তরুণী টিকা নেওয়ার পরে শারীরিক অসুস্থতায় মারা গিয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্তরেও এর নজির রয়েছে। আমেরিকা এবং ব্রিটেনের মতো দেশে বহু দিন ধরেই টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্ষতির ক্ষেত্রে ‘নো ফল্ট’ ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যেখানে অভিযোগকারীকে অবহেলার প্রমাণ দিতে হয় না, বরং টিকার সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক দেখালেই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ খুলে যায়। অথচ বিশ্বের বৃহত্তম টিকাকরণ কর্মসূচিগুলির একটি পরিচালনা করেও ভারত এতদিন এমন কোনও কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে আদালতের রায় শুধু একটি নীতিগত পরিবর্তনই নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ। আদালত স্পষ্ট করেছে যে, এই নির্দেশ কোনও নির্দিষ্ট টিকা মৃত্যুর কারণ কি না তা নির্ধারণের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করা।
একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, ‘নো ফল্ট’ ক্ষতিপূরণ নীতি তৈরি করা মানে এই নয় যে, ভারত সরকার বা কোনও কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায় বা ভুল স্বীকার করছে। আগামী দিনে ক্যানসার প্রতিরোধী ‘হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস’-এর মতো নতুন টিকাকরণ কর্মসূচি চালু হওয়ার আগে এই নির্দেশ এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এটি সরকারকে মনে করিয়ে দেয়– জনস্বাস্থ্য কেবল পরিসংখ্যানের ম্যাজিক নয়, তা মানুষের জীবন, আস্থা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। ‘নো ফল্ট’ ক্ষতিপূরণ নীতি সেই আস্থাকে পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
