‘বন্ধুত্ব’ বললে আমরা জয়-বীরুকে বুঝি। হরিহর আত্মা। মনের খবর মুখে প্রকাশ না করলেও তারা পরস্পরকে বুঝতে পারত। কিন্তু সব বন্ধুতা তো এমন হয় না। এক কাঠখোট্টা ব্রিটিশের সঙ্গে অসম বন্ধুত্ব হয়েছিল এক হিন্দু ভারতীয়র। যে অত স্মার্ট নয়, অত বলিয়ে কইয়ে ও উদ্দাম নয়, যে সংস্কারের সামনে নত, যে অঙ্ক রহস্যকে মনে করত দৈবীর স্বপ্নাদেশ তুল্য। সাহেবের নাম গণিত বিশারদ জি এইচ হার্ডি। ভারতীয়ের নাম শ্রীনিবাস রামানুজন। তাঁদের ‘ইয়ে দোস্তি’ কি উদ্যাপনের নয়? লিখলেন অনমিত্র বিশ্বাস।
ইংল্যান্ডের সমারসেটের মেন্ডিপ হিল্স স্যানাটরিয়ামে শ্রীনিবাস রামানুজন আয়েঙ্গার (১৮৮৭-১৯২০) তখন মৃত্যুর থাবার মুখে ভেঙে পড়ছেন ক্রমশ। ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় থেকে উৎপাটিত হয়ে এসেছেন অর্ধেক পৃথিবী দূরে। তেমন কাছের বন্ধু তঁার কেউ ছিল না, যুদ্ধের বাজারে যে গ্যঁাটের কড়ি খরচ করে নিয়মিত বিলেতে তঁাকে চিঠি লিখবে। মা এমএ ডিগ্রি না নিয়ে ফিরতে বারণ করছেন। বালিকা বধূর থেকে চিঠির অপ্রাপ্তি ও আড়ষ্টতায় তিনি মর্মাহত। উপনিবেশ ও শাসকের দূরত্ব অতিক্রম করে, আজন্মের সংস্কার আর পাশ্চাত্য দস্তুরের মধ্যে সেতুস্থাপন করতে পারেননি। ফলে ইংল্যান্ডে তঁার একজনও বন্ধু হয়নি।
১৯১৭ সালের অক্টোবরে ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ তঁার জোটেনি, সমরূপ যে-কারণে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট থাকা সত্ত্বেও, দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যারিস্টার মোহনদাস গান্ধীকে ট্রেন থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ব্রিটিশ অধ্যাপক গডফ্রে হ্যারল্ড হার্ডি (১৮৭৭-১৯৪৭) ইংল্যান্ডে রামানুজনকে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনিই রামানুজনের গবেষণার উপদেষ্টা। হার্ডিরই উদ্যোগে রামানুজন সেই ডিসেম্বরে ‘লন্ডন ম্যাথেম্যাটিকাল সোসাইটি’-র সদস্য নির্বাচিত হলেন। হার্ডি ও লিটল্উড– যঁাদের সঙ্গে রামানুজন কাজ করছিলেন, এবং তঁাদের অনুরোধে হোয়াইটহেড-সহ কয়েকজন অঙ্কবিদ রয়্যাল সোসাইটির ফেলোশিপের জন্য রামানুজনের নাম উত্থাপিত করেন– ‘FRS’ উপাধির ময়ূরপুচ্ছ। কিন্তু রামানুজনের তখন মাত্র ২৯ বছর বয়স, আর আড়েবহরে তঁার কাজের যা পরিমাণ– গুরুত্বে যেমনই হোক– তাতে মনোনীত হওয়া একটু অবাক করা বিষয়। তাছাড়া প্রথম দরখাস্তেই মনোনয়ন বিরল।
এক কাঠখোট্টা ব্রিটিশের সঙ্গে অসম বন্ধুত্ব হয়েছিল এক হিন্দু ভারতীয়র। যে অত স্মার্ট নয়, অত বলিয়ে কইয়ে ও উদ্দাম নয়, যে সংস্কারের সামনে নত, যে অঙ্ক রহস্যকে মনে করত দৈবীর স্বপ্নাদেশ তুল্য।
রয়্যাল সোসাইটির অধ্যক্ষ জে. জে. টমসনকে বলেছিলেন হার্ডি, “ও যদি অসুস্থ না হ’ত, আমি ওর নাম দিতে দেরি করতাম– এমন নয় যে ওর দাবি নিয়ে কোনও প্রশ্ন আছে, কেবল স্বাভাবিক গতিতে সব হতে দিতাম। তবে যা পরিস্থিতি, তাতে বোধহয় সময় বেশি নেই।’ হার্ডির চিঠির অন্যত্র এই উৎকণ্ঠা, ‘(ট্রিনিটির) ফেলোশিপ নিয়ে হতাশার পরে কোনও লক্ষণীয় স্বীকৃতি ওর জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই সাফল্যের স্বাদ ওকে মনোবল আর বঁাচার তাগিদ দেবে। রয়্যাল সোসাইটি ওকে চিরদিনের জন্য হারাতে পারে, তার চেয়ে এই দিকটাই আমাকে বেশি ভাবাচ্ছে।’
‘এক হতভাগ্য একলা হিন্দু–পাশ্চাত্যের সম্মিলিত পাণ্ডিত্যের সঙ্গে দ্বৈরথে’ মাথা কুটে মরছিল। হার্ডি অনেক পরে বুঝতে পারেন, তঁাদের চার বছরের দৈনিক পরিচয় সত্ত্বেও তিনি এই বিদেশি ছেলেটির মানসিক পরিস্থিতির কিছুই খোঁজ রাখেননি। হয়তো উচিত ছিল, হয়তো তঁার কোনও দায় ছিল না। কিন্তু এই একটিবার হার্ডি সব সামর্থ ঢেলে রামানুজনকে সাহায্য করেন।
হার্ডি আর রামানুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত কোনও প্রসঙ্গ প্রায় আলোচিত হয়নি। তঁারা একসঙ্গে কাজ করতেন, ব্যস। এমনকী হার্ডি বহু দিন পর্যন্ত জানতেন না যে ‘রামানুজন’ পদবি নয়– নাম। সেই অপরিচয়ের জন্য রামানুজনের দ্বিধা ও জাড্য দায়ী ছিল।
সাময়িক সুস্থ হয়ে রামানুজন দেশে ফিরে আসেন, পত্রযোগে হার্ডির সঙ্গে তঁার আরও আলোচনা হয়, স্ত্রী জানকী আম্মালের সাক্ষ্য অনুযায়ী মৃত্যুর চারদিন আগে পর্যন্ত। বিলেতফেরত রামানুজন সেই অভিযানের জন্য ‘প্রায়শ্চিত্ত’ করতে অস্বীকার করেন। মাদ্রাজি ব্রাহ্মণ সমাজ তঁার শ্মশানযাত্রাও বয়কট করে। রামানুজনের সম্ভাবনার অকালমৃত্যুর জন্য কী দায়ী ছিল, বলা কঠিন। তিনি জন্মেছিলেন তৎকালীন বম্বে বা কলকাতার আলোকিত বৃত্তে নয়, দূর দাক্ষিণাত্যের মাদ্রাজে (এখন চেন্নাই)। যে-বছর তিনি যক্ষ্মায় ধুঁকে মরছেন ভারতের এক প্রান্তে স্বীকৃতিহীন একাকী, সেই বছরই দেশজুড়ে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের হুজুগ। দেশোদ্ধারের ম্যানিফেস্টোয় বিশ্ববিদ্যালয় বয়কট করার কথা ছিল, গড়ে তোলার কথা নয়। এবং বিশ্বযুদ্ধ সূর্যাস্তহীন সাম্রাজ্যের দুই কোণের দূরত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছিল। তঁার সংস্কার তঁাকে তাড়া করে গিয়েছে স্যানেটরিয়ামেও, কিন্তু তঁার সমাজ ওই জয়যাত্রার পথ দুর্লঙ্ঘ্য করে তুলেছিল। তঁার পরিবার তঁার মতো মনীষাকে সাহচর্য না দিতে পারুক, স্বস্তি দিতে পারত। ভাই লক্ষ্মী নরসিংহন ‘চিতাটা পর্যন্ত জোড়ার আগে’ হার্ডিকে ‘টেম্পেস্ট’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে ফলাও করে লেখেন, তিনি ‘অল ডেডিকেটেড টু ক্লোজনেস্ অ্যান্ড দ্য বেটারিং অফ মাই মাইন্ড’ হতে ইচ্ছুক– ‘আমাকে সাহায্য আপনার দায়বদ্ধতা’। স্পষ্টত, দাদার প্রতিভার অসাধারণত্ব সম্পর্কে তঁার শ্রদ্ধা দূর অস্ত, ধারণাও ছিল না।
হার্ডি আর রামানুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত কোনও প্রসঙ্গ প্রায় আলোচিত হয়নি। তঁারা একসঙ্গে কাজ করতেন, ব্যস। এমনকী হার্ডি বহু দিন পর্যন্ত জানতেন না যে ‘রামানুজন’ পদবি নয়– নাম। সেই অপরিচয়ের জন্য রামানুজনের দ্বিধা ও জাড্য দায়ী ছিল। তেমনই দায়ী ছিল ইংরেজ সমাজের ‘গোয়িং ফার?’-এর এটিকেট, ‘গোয়িং হোয়্যার’ সেখানে পরিশীলনের বাইরে। তদুপরি, হার্ডি ছিলেন স্বভাবত আলাপবিমুখ।
তঁাদের দু’জনের চিত্তাকাশ অসম্পৃক্ত। হার্ডির নববর্ষের রেজোলিউশন শুরু হত ‘রিম্যান হাইপোথেসিস প্রমাণ করব’ দিয়ে, আর শেষ হত ‘মুসোলিনিকে খুন করব’-সহ। সেখানে রামানুজনের মনন অসহায় ভারতীয় তরুণের, নিজের পায়ে দঁাড়াতে হবে আর পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে– দুনিয়াদারি নিয়ে সাকুল্যে এই তঁার মাথাব্যথা। মুসোলিনিকে নিয়ে ভেবে তিনি আধ মিনিট সময়ও খরচ করেছিলেন বলে মনে হয় না।
হার্ডি ‘প্রাচ্যের অনাদি অধ্যাত্মজ্ঞানে’ অবিশ্বাসী। তঁার মতে, রামানুজনের প্রজ্ঞা সেই ক্ষণজন্মা পর্যবেক্ষকের, যিনি মাপজোক বা আরোহণ ছাড়াই দূর থেকে মেঘাবৃত পর্বতমালা দেখে তার সম্যক টপোগ্রাফি অনুমান করতে পারেন। রামানুজন স্বয়ং তঁার গাণিতিক সিদ্ধান্তকে আরাধ্যার স্বপ্নাদিষ্ট বলে দাবি করেছেন। অর্থাৎ গাণিতিক সূত্র তঁার কাছে দৈববাণীর অর্থ বহন করত। জীবনীকার রবার্ট ক্যানিজেল একটি আস্ত অধ্যায় ধরে আলোচনা করেছেন দু’জনের জীবনদর্শনে আগাগোড়া অমিল নিয়ে, যা তঁাদের বন্ধুত্বের পক্ষে ছিল অন্তরায়।
আমিষের ছোঁয়াও না-খেয়ে ইংল্যান্ডের শীত অতিবাহিত করা রামানুজনের জন্য দুঃসাধ্য ছিল বটে। হার্ডি সেসব জানতে পারেননি, জানলেও আমল দেননি। কিন্তু স্যানাটরিয়োমে হার্ডির লেখা একটি চিঠি বেশ বকুনি দেওয়া– উপদেষ্টা নয়, বন্ধু বা অভিভাবকের অধিকারে: ‘খাওয়া নিয়ে বাড়াবাড়ি করছ কিন্তু! তোমাকে নিয়ম পালন আর আত্মহত্যার মধ্যে বেছে নিতে হবে। পড়িজ বা ওটমিল, দুধের ক্রিম, ভালো না লাগে তো লাগানোর চেষ্টা করো। আচার আর লঙ্কা তোমাকে দেওয়া যাবে না। বিফ টি বা বোভরিল খেতে বলছি না, কিন্তু ধর্মীয় দায়কে একটু তো মচকাও।’
আবার শেষ পারানির কড়িও তঁার হাতে তুলে দিয়েছিলেন– আর কেউ নন, হার্ডিই। হার্ডির পক্ষে যা দেওয়া সম্ভব ছিল, তা দিয়েছিলেন উজাড় করে। ১৯৪৭ সালে হার্ডিকে যখন ‘রয়্যাল সোসাইটি’-র সর্বোচ্চ সম্মান কপলি মেডেল দেয়া হয়, ৩০ বছর আগের কথা মনে পড়ে হার্ডির। ব্যারন স্নো-কে তিনি বলেন, ‘আমারও সমাপ্তি ঘনিয়ে আসছে। যা প্রাপ্য সব মিটিয়ে দেওয়ার হুড়োহুড়ি পড়লে, তার থেকে কী বুঝে নিতে হয় আমি তো জানি।’ হার্ডি-ই হয়তো রামানুজনের একমাত্র বন্ধু ছিলেন। তামিল আর ইংরেজির অসেতুসম্ভব ব্যবধান ডিঙিয়ে রামানুজনকে আর সবার চেয়ে বেশি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। দৈনন্দিন তুচ্ছের বাইরের মহৎ চর্চায় তঁারা সতীর্থ ছিলেন। কাঠখোট্টা হার্ডি জীবনসায়াহ্নে লিখেছিলেন, ‘রামানুজনের সঙ্গে পরিচয় আমার জীবনের একমাত্র রোমান্টিক ঘটনা।’ এই স্বীকারোক্তি যেন-বা অঙ্কের রোমাঞ্চকেই আরও বাড়িয়ে দেয়।
(মতামত নিজস্ব)
