‘মে বি আই ক্যান স্পিক ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ’। হঠাৎ হেঁটে যাওয়া কোনও মানুষকে বা একদল মানুষের উদ্দেশে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ-কথা বলতে দেখা যায় এক জাপানি যুবককে। তাঁর নাম য়ুজি বেলেজা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন যেসব কারণে ‘সেনসেশন’ তৈরি হয়, তার সিংহভাগ অপাচ্য কনটেন্টে ভরা। হয় তা অতিরিক্ত যৌনতায় মশগুল বা অন্যতর অশালীনতায় ম-ম করে। কিছু কনটেন্ট ডার্ক হিউমার গোত্রের। কিন্তু নিখাদ আনন্দ, রোমাঞ্চ ও রুচির সমন্বয় চোখে প্রায় পড়েই না। য়ুজি বেলেজা ব্যতিক্রম, কারণ, তিনি ভাষাচর্চার মতো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করেন, তাতে মনোরম মানবিকতার স্পর্শও থাকে।
পথচলতি লোকজনকে আকস্মিকভাবে য়ুজি গিয়ে ইংরেজিতে বলেন, ‘মনে হয় আপনার ভাষায় আমি কথা বলতে পারি?’ এখানে ‘আপনার ভাষা’ মানে বিলক্ষণ সে-ব্যক্তির মাতৃভাষা। এমন শুনে কেউ অবাক হন, কেউ বুঝতে পারেন না, কেউ সন্দেহের চোখে দেখেন। কারণ, য়ুজি যখন এ প্রশ্ন রাখেন, তখন পুরোটা ক্যামেরাবন্দি হতে থাকে। ক্যামেরার সামনে অপরিচিত ব্যক্তি কিছু জানতে চাইলে অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক।
কার ভাষা আরবি, কার ভাষা আফ্রিকার কোনও জনগোষ্ঠীর, কোনটা থাই বা ইন্দোনেশীয় ভাষা, কোনটা কুর্দিশ বা সার্বিয়ান– অব্যর্থভাবে বলে দেন!
কেউ কেউ এরপরেও কথা বলেন মাতৃভাষায়। কেউ কেউ এড়িয়ে যেতে চান। য়ুজি বেলেজা কিন্তু দমে যান না। তিনি নরম সুরে প্রার্থনা করে চলেন। “আরে, বলুন না, দু’-একটা কথা নিজের ভাষায়, যা ইচ্ছে। হয়তো বলতে পারব আপনার ভাষা কী?” এরপরে ঘটে সেই আশ্চর্য ম্যাজিক। ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায়, ওপারের লোকেরা যেই না কিছু বলে ওঠেন বিজাতীয় ভাষায়, তৎক্ষণাৎ য়ুজি বেলেজা তাঁদের সঙ্গে সংযোগ করতে থাকেন তাঁদেরই ভাষায়।
কার ভাষা আরবি, কার ভাষা আফ্রিকার কোনও জনগোষ্ঠীর, কোনটা থাই বা ইন্দোনেশীয় ভাষা, কোনটা কুর্দিশ বা সার্বিয়ান– অব্যর্থভাবে বলে দেন! অন্যদিকের মানুষগুলি হেসে ওঠেন। চমৎকৃত হন। মুগ্ধতায় জড়িয়ে ধরেন। জানতে চান– কী করে জানলেন আমার ভাষা, আহা অ্যামেজিং! এখানে মানবিকতার স্পর্শ মায়াকাজল বিছিয়ে দেয় আমাদের সতৃষ্ণ নয়নে। বিদেশের মাটিতে হঠাৎ করে কেউ এগিয়ে এসে আমাদের কারও মাতৃভাষায় যদি কথা বলে ওঠে, সে তো বিনা মেঘে জলের মতো! এর সঙ্গে যে-মনখুশি জড়িয়ে থাকে, তা অমূল্য। য়ুজি বেলেজা এই তৃপ্তিটুকু তৈরি করে অকাতরে ছড়িয়ে দেন বহু মানুষের মধ্যে। সোশ্যাল মিডিয়া বা ইউটিউবে কয়েক সেকেন্ডের রিল দেখে আমাদের হৃদয়ও আর্দ্র হয়ে ওঠে। মাতৃভাষার শক্তি ও সৌন্দর্য যেন নতুন করে ধরা দেয় আমাদের চোখে!
য়ুজি বেলেজার জন্ম জাপানে। মা আইরিশ। চারটে ভাষা বলতে পারতেন। ছোট থেকেই য়ুজির ঝোঁক ছিল নতুন নতুন ভাষা শেখার দিকে। রুশভাষা দিয়ে শুরু, এখন ৪০টি ভাষা জানেন। সবই যে ভীষণ ঝরঝরে, তা নয়। তবে অন্য ভাষার কিছু কিছু শব্দ ভাঙা ভাঙা বলতে পারলেও বিদেশি মানুষের আহ্লাদ হয়। তবে একবার মণিপুরের কয়েকটি মেয়ে নিজেদের ‘ভারতীয়’ বলে পরিচিতি দেওয়ায় য়ুজি তৎক্ষণাৎ হিন্দি বলেছিলেন ‘ভারতীয় ভাষা’ ভেবে। কিন্তু ভারত কি আর শুধুই হিন্দি?
