সুলতানি আমলে বাংলার নামই হয়ে গিয়েছিল ‘বুলঘাকপুর’। অর্থাৎ ‘বিদ্রোহের দেশ’। এখানকার জলে, বাতাসে, মাটিতে এমন কিছু রয়েছে, যা বাগী হতে প্ররোচিত করে। যা, কেন্দ্রীয় শাসনের মুঠোয় আটকে না থেকে পারদের মতো ছড়িয়ে পড়তে চায়। ইতিহাসের গতিচক্র বলছে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে পরাধীন বাংলা যে বৈপ্লবিক ওজস্বিতা দেখিয়েছে, বা স্বাধীনতার পরে দলীয় রাজনীতির ধারায় যেভাবে বিপ্লবের তুলো ছড়িয়েছে, সময়ের ধারাবিবরণী রূপে তা যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই শিহর-জাগানো। লিখছেন প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত।
বাংলার ব্যাপারটাই যেন একটু অন্যরকম। সারা দেশের, মানে, এই বিশাল ভারত ভূখণ্ডের শুধু নয়, সামগ্রিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের বিচারেও মনে হয় ঠিক ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে’ আর পাওয়া যাবে না। সেই দীর্ঘকায় চিত্র পরিচালক আর আরও নানা গুণে গুণী ভদ্রলোক লিখেছিলেন ‘বাংলাদেশটা ভারতবর্ষের কটিদেশে হওয়াতে এখানে একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটেছে’। উত্তরে হিমালয় আর দক্ষিণে সমুদ্র এ-দেশের আর কোনও প্রদেশে নেই। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রটি বলেছিল, বাংলায় শস্য-শ্যামলা, রুক্ষতা, সুন্দরবনের মতো জঙ্গল, গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনার মতো নদী, সমুদ্র, হিমালয়, কাঞ্চনজঙ্ঘা– সব পাওয়া যাবে।
এ তো গেল প্রাকৃতিক ব্যাপার। এখানকার মানুষের মানসিকতা আর তার থেকেই উদ্ভূত রাজনৈতিক চিন্তাধারা মতাদর্শ বা চেতনার বিষয়টির দিকে যদি নজর রাখা হয়, তাহলেও দেখা যাবে ভারতের অন্যান্য অনেক প্রদেশের থেকে এই ব্যাপারে পার্থক্য এবং অনন্যতা আছে এই রাজ্যের মানুষের।
জাতীয় সংহতি, অখণ্ডতা, ভারতীয় ঐক্য ইত্যাদি নিয়ে এখনকার যুগে বিস্তর প্রচার এবং বক্তৃতা চলে। কিন্তু ইংরেজরা যাওয়ার সময় যে সার্বভৌম ভারত রাষ্ট্রের সৃষ্টি হল, তার আগে পর্যন্ত এই গালভরা নামের ব্যাপারগুলো ছিল সম্পূর্ণ অবান্তর। ইতিহাসের যুগ, অর্থাৎ এ-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস অদ্যাবধি যতটুকু জানা গিয়েছে, তার শুরু মনে করা যায় বৈদিক যুগকে। তখন থেকে আরম্ভ করে ‘ষোড়শো মহাজনপদ’-এর যুগ পার করে ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগ একটি অংশকে একই শাসনতন্ত্রের আওতায় প্রথম নিয়ে আসা গিয়েছিল মৌর্য যুগে, যার শুরু ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ। তখন, বিশেষ করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং সম্রাট অশোকের শাসন পর্বে বিশাল ভারত ভূখণ্ডের অনেকখানি অংশের সঙ্গে এখন যে-অঞ্চল বাংলা রূপে চিহ্নিত, তাও ছিল মৌর্য শাসনের আওতায়।
এখানে খেয়াল করার মতো বিষয় হল, মৌর্য সম্রাটরা প্রায় সারা ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য কিন্তু দিল্লি থেকে নয়, চালাতেন পাটলিপুত্র অর্থাৎ এখনকার পাটনা থেকে। তাই তাদের রাজধানী থেকে বাংলার দূরত্ব খুব বেশি ছিল না।
জাতীয় সংহতি, অখণ্ডতা, ভারতীয় ঐক্য ইত্যাদি নিয়ে এখনকার যুগে বিস্তর প্রচার এবং বক্তৃতা চলে। কিন্তু ইংরেজরা যাওয়ার সময় যে সার্বভৌম ভারত রাষ্ট্রের সৃষ্টি হল, তার আগে পর্যন্ত এই গালভরা নামের ব্যাপারগুলো ছিল সম্পূর্ণ অবান্তর।
মৌর্যদের পর শুঙ্গ শাসকরা ক্ষমতায় আসে। তারপর কিছুকাল ক্ষমতায় ছিল সাতবাহন বংশীয় রাজারা। এই সময়ে বাংলা অঞ্চল নামেই সাম্রাজ্যের আওতায় থাকলেও আদতে ছড়ি ঘোরাত স্থানীয় নেতাগোছের লোকজন। তারা শুঙ্গ বা অন্য শাসকদের প্রতিনিধি হিসাবে কাজ চালাতে বটে, বাস্তবে কিন্তু তারা ওই শাসকদের বড় একটা পাত্তা দিত না বলেই মনে করেন ইতিহাসবিদরা। বরং ভারতসম্রাটের শাসন বাংলা মুলুকে অনুভব করা গিয়েছিল গুপ্ত বংশের শাসনে, যাকে ভারতের ইতিহাসে ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়।
তখন অবশ্য ‘বাংলা’ নামে কিছু ছিল বলে মনে হয় না। ওই সময়ে, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় ৩২০ থেকে ৫৫০ পর্যন্ত, বা তারপরেও এই এলাকাকে বলা হত ‘পুন্ড্রবর্ধন’। অবশ্য ‘বঙ্গ’ ধরনের একটি নামও প্রচলিত ছিল। এই ‘বঙ্গ’ নামটি সুদৃঢ় হল– যখন এই অঞ্চলে একটি শক্তপোক্ত সাম্রাজ্য স্থাপন করতে পারলেন এখানকার শাসক। প্রতিষ্ঠা হল গৌড় রাজ্যের। এর আগে স্থানীয় দলপতি বা গোষ্ঠীপতিরা তাদের এলাকায় ছড়ি ঘুরিয়েছে, কিন্তু মৌর্য, শুঙ্গ বা গুপ্ত শাসকদের একেবারে অগ্রাহ্য করতে পারেনি।
এবার আর ব্যাপারটা সেইরকম থাকল না। জয়নাগ-এর স্থাপন করা গৌড় রাজবংশ পরবর্তী
রাজা শশাঙ্কের শাসনকালে পরিণত হয়ে হলো এক পরাক্রমী সাম্রাজ্যে। আর্যাবর্তের বেশিরভাগ অঞ্চল তখন পুষ্যভূতি বংশীয় রাজা হর্ষবর্ধনের করায়ত্ত। দক্ষিণে চালুক্যদের রমরমা। হর্ষবর্ধনকে বিস্তর বেগ পেতে হল শশাঙ্কের দাপটে। গৌড়রাজ্য কারও অধীনস্থ ছিল না। ছিল স্বশাসিত সার্বভৌম রাজ্য। শশাঙ্কের পর পুত্র মানবদেবের সংক্ষিপ্ত শাসন আর তারপর শ’-খানেক বছরের অরাজকতার যুগ, ইতিহাস যাকে বলে ‘মাৎস্যন্যায়’। মাৎস্যন্যায়ের অন্ধকার ঘুচল পাল বংশের শাসন শুরু হতে। তাদের এবং পরবর্তী সেন বংশকে কারও অধীনস্থ হতে হয়নি। গৌড়বঙ্গের সার্বভৌম শাসক ছিলেন পাল এবং সেন রাজারা। বোঝাই যাচ্ছে, বিশাল ভারত ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা অজস্র স্বাধীন রাজ্য বা রাষ্ট্রের মধ্যে পাল এবং সেন বংশের শাসনাধীন অন্যতম একটি সার্বভৌম রাজ্য ছিল বাংলা।
তখন অবশ্য ‘বাংলা’ নামে কিছু ছিল বলে মনে হয় না। ওই সময়ে, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় ৩২০ থেকে ৫৫০ পর্যন্ত, বা তারপরেও এই এলাকাকে বলা হত ‘পুন্ড্রবর্ধন’। অবশ্য ‘বঙ্গ’ ধরনের একটি নামও প্রচলিত ছিল।
উপমহাদেশের এই রাজ্যেগুলির শাসকরা প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন হিন্দু। কেউ বৌদ্ধ বা জৈন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব যে তখনও কমেনি, নালন্দা বা বিক্রমশিলার জনপ্রিয়তার কারণে তাও বোঝা যায়। এরকম এক অবস্থায় দ্বাদশ শতক বা তার কিছু আগে থাকতেই শুরু হয়ে গিয়েছিল পশ্চিমি হামলা। আরব ও তুর্কিস্তানের মরু অঞ্চল থেকে ধর্মপ্রচারের নামে খলিফার প্রতিনিধির ভেক ধরে ভারতের, মানে, হিন্দুকুশ পার হয়ে হিন্দুস্তানের দিকে রওনা দিত দুর্মদ যোদ্ধারা। নিজেদের ধর্ম এখানকার মাটিতে প্রচার করতে ভরসা তাদের অসি, ভল্ল, শূল, বর্শা। তারা যে এদিকেই শুধু এগিয়েছিল, তা নয়। পশ্চিমমুখোও চলেছিল তাদের বিশাল ফৌজ। ওদিকের, অর্থাৎ ইউরোপের শাসকরা তখন এদেশের মতোই বিচ্ছিন্ন। একে অপরের বন্ধু নয়। কিন্তু ধর্মরক্ষায় জোট বাঁধল তারা। ‘ক্রুসেড’ বা ধর্মযুদ্ধ দেখল ইউরোপ। ভারতীয় রাজারাও একে-অপরের শত্রু। তাঁদের পক্ষে একে অপরের সঙ্গে ‘বেঁধে বেঁধে’ থাকা সম্ভব হল না।
ফলে সুলতানি শাসন কায়েম হল হিন্দুস্তানে আর দিল্লি হল তাদের রাজধানী।
সেই আক্রমণের ঢেউ বাংলায় পৌঁছেছিল ১২০৪ নাগাদ। বখতিয়ার খিলজি নালন্দা ছারখার করে আরও এগিয়ে এসে লক্ষ্মণাবতী বা লখনৌতি থেকে বিতাড়িত করলেন লক্ষ্মণ সেনকে। যদিও এই নিবন্ধের বিষয় নয়, তবুও বলে রাখা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, সপ্তদশ অশ্বারোহী নিয়ে বখতিয়ারের লক্ষ্মণাবতী আক্রমণ কেউ বিশ্বাস করুক বা না-করুক, বখতিয়ারের আক্রমণের নেপথ্যে যে লক্ষ্মণ সেনের সভাসদ বা দরবারের প্রমুখ কর্তাব্যক্তির একাংশের প্ররোচনা বা আমন্ত্রণ ছিল না, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এমন লোকদেরই বোধহয় ‘ফিফ্থ কলামিস্ট’ বা ‘বিশ্বাসঘাতক পঞ্চম বাহিনী’ বলা হয়। ‘ঘরশত্রু বিভীষণ’, আর কী! বিভীষণের মতো বিশ্বাসঘাতক চিরকালই ছিল। এখনও আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। সাধে কি আর পুরাণ এবং মহাকাব্য রচয়িতা ঋষিরা বিভীষণকে অমর করে রেখেছেন!
তা, বখতিয়ার যে গৌড় বা বঙ্গবিজয় করলেন খলিফার প্রতিনিধি সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকের সেনাপতি রূপে, এই জয় তো তাঁর কপালেও সইল না। বাংলার পর উত্তরবঙ্গ পার হয়ে ভোট রাজা মানে তিব্বতিদের সঙ্গে মহড়া নিতে গিয়ে যখন বেজায় নাকাল হয়েছেন বখতিয়ার, সেই সুযোগে তাঁর দলেরই এক হোমরাচোমরা আলি মর্দান খিলজি নিকেশ করে দিয়েছেন বখতিয়ারকে।
বাংলায় তখন খিলজিদের প্রতিপত্তি। খুবই স্বভাবিক। বখতিয়ার তো চাইবেনই তাঁর গুষ্টির যত ভাই-ভাতিজার প্রতিপালন হোক। ওই খিলজি আমির-ওমরাহরা আলি মর্দানকে বন্দি করে
শিরান খিলজি নামের একজনকে বসিয়ে দিলেন বখতিয়ার খিলজির পরবর্তী বাংলায় সুলতানের প্রতিনিধি রূপে। কিন্তু তত দিনে দিল্লিতে গুছিয়ে বসা সুলতান কুতুবউদ্দিন মানবেন কেন বাংলার খিলজিদের সিদ্ধান্ত!
তাই অযোধ্যা থেকে ওখানকার প্রতিনিধি বা ‘রিজেন্ট’ কায়মাজ রুমিকে পাঠালেন বাংলায়। এদিকে আলি মর্দানও পালিয়ে দিল্লিতে গিয়ে পৌঁছেছেন। রুমিকে বাংলায় কর্তৃত্ব করতে সহায়তা করলেন গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খিলজি। তাঁকেই বসানো হল বাংলায় সুলতানের ‘প্রতিনিধি’ হিসাবে। এর কিছু দিন পর বখতিয়ারের হন্তারক আলি মর্দান আবার ফিরে এসেছিল বাংলায়। কিন্তু ইওয়াজ খিলজি কী করে আর তাকে বেঁচে থাকতে দেন?
সুলতানি আমলে বাংলার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘বুলঘাকপুর’। সুলতান ইলতুতমিসের দরবারের ওমরাহরা বাংলার, বিশেষ করে লক্ষ্মণাবতী বা লখনৌতির নাম দিয়েছিল ‘বুলঘাকপুর’, অর্থাৎ ‘বিদ্রোহের দেশ’। এখনকার লব্জে হয়তো বলা যেত ‘যে যায় বাংলায় সে হয় বিদ্রোহী’। এই যে অযোধ্যা থেকে রুমি এসে গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খিলজিকে বাংলায় গদিতে বসালেন, তাঁকেও কি ‘বিশ্বস্ত’ বলা যায়? এর ক’-দিন পরে কুতুবউদ্দিন লাহোরে পোলো ধরনের খেলা খেলতে গিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যেই না চোখ বুজেছেন, আর দিল্লিতে কে মসনদে বসবে, সেই নিয়ে লেগেছে সংঘাত, ওই ফাঁকতালে ইওয়াজ খিলজি ফস করে নিজেকেই বাংলায় ‘স্বাধীন’ শাসক ঠাউরে বসলেন।
দিল্লিতে বিস্তর বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে তারপর সুলতান হয়েছেন ইলতুতমিস। তিনি নিজের ঘর সামলে বড় ছেলে নাসিরউদ্দিনকে পাঠালেন বাংলা মুলুকে। তিনি এসে ইওয়াজ খিলজি আর তাঁর অনুগামীদের কোতল করে বিদ্রোহ দমন করলেন, আর ইলতুতমিস তাঁকেই বহাল করলেন বাংলার প্রতিনিধি রূপে। কিন্তু সুশাসক হয়েও বেশ সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে দেহ রাখতে হল নাসিরউদ্দিনকে। নতুন করে সুলতানকে প্রতিনিধি বা গভর্নরের মতো কাউকে পাঠাতে হল বাংলায়।
বাংলায় তখন খিলজিদের প্রতিপত্তি। খুবই স্বভাবিক। বখতিয়ার তো চাইবেনই তঁার গুষ্টির যত ভাই-ভাতিজার প্রতিপালন হোক। ওই খিলজি আমির-ওমরাহরা আলি মর্দানকে বন্দি করে
শিরান খিলজি নামের একজনকে বসিয়ে দিলেন বখতিয়ার খিলজির পরবর্তী বাংলায় সুলতানের প্রতিনিধি রূপে।
গবেষকরা বলেন, ‘যে যায় বাংলায়, সে হয় বাগী’ ব্যাপারটার কয়েকটি বাস্তব কারণ ছিল। প্রথমত, দূরত্ব। তখনকার দিনে দিল্লি থেকে লখনৌতি (লক্ষ্মণাবতী) পৌঁছতে কম-বেশি মাসখানেক সময় লাগত। দ্বিতীয় কারণটি হল, গরমকালের পোকামাকড়, প্রখর রোদ ইত্যাদি থেকে নানারকমের রোগ, আর বর্ষায় পথঘাট অগম্য হয়ে ওঠা, এবং বর্ষার পর বন্যায় নদী-নালা স্ফীত হওয়া শুধু নয়, উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের গ্রাম-শহর বন্যায় ভেসে পথঘাট প্রায় বন্ধই হয়ে যেত। তৃতীয় কারণ ছিল, বাংলার উর্বর জমিতে ফসলের আধিক্য, নদী এবং সমুদ্রপথে ব্যবসা প্রভৃতি কারণে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। বাংলার শাসককে দিল্লির প্রভুদের উপর নির্ভর করতে হয়নি কখনও। বরং দিল্লিতে সুলতান বা বাদশাহ অপেক্ষা করতেন বাংলার রাজস্বের জন্য।
‘সোনার বাংলা’ নাম তো আর এমনি-এমনি হয়নি! বাংলাকে যে সুলতানি আমলে ‘বুলঘাকপুর’ বা ‘বিদ্রোহের দেশ’ আখ্যা দেওয়া হল, এর কারণ হিসাবে কেউ হয়তো তখনকার বিদ্রোহীদের ধর্মের ধাতের কথা তুলবেন। কিন্তু এখনকার সময়ে পৌঁছে একবার সিংহাবলোকনে পিছনে তাকালে দেখা যাবে– শুধু সুলতানের প্রতিনিধি বা মুঘল যুগের নবাবরা নন– বাংলায় অন্য কারও কর্তৃত্ব সহ্য করা হয়নি ইংরেজ শাসনে, এমনকী স্বাধীনতা অর্জনের পরেও।
ইওয়াজ খিলজির বিদ্রোহ দমন হওয়ার কয়েক বছর যেতে না যেতেই আবার মাথাচাড়া দিয়েছিল বাংলার শাসকের নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করার প্রবণতা। তখন দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন আর বাংলায় নিজেকে একচ্ছত্র ঘোষণা করেছেন তুঘরিল তোগন খঁা। ১২৭৯ সালে মাথাচাড়া দেওয়া তুঘরিলকে দমন করতে বছর তিনেক সময় লেগেছিল বলবনের। তারপর বাংলায় পাঠানো হল বলবনের পুত্র বুঘরা খঁা-কে। বলবনের মৃত্যুর পর ‘দাস’ বংশের সমাপ্তি ঘটে যখন খিলজিরা মসনদে বসেছেন তখন আর বাংলার প্রতিনিধিদের উপর দিল্লির খবরদারি বড় একটা ছিল না।
বাংলায় পাঠানো সুলতানের প্রতিনিধিদের দিল্লিকে পাত্তা না দেওয়ার ব্যাপারে আবার সুলতানের টনক নড়ল চতুর্দশ শতকের তৃতীয় দশকে, ১৩২৪ নাগাদ। তত দিনে খিলজিদের দিন গিয়েছে। সুলতান হয়েছে গাজি মালিক ওরফে গিয়াসউদ্দিন তুঘলক। বাংলার বিদ্রোহী প্রতিনিধি বাহাদুর শাহকে দমন করতে সুলতান নিজেই চললেন ফৌজ নিয়ে। বাহাদুরকে বন্দি করে দিল্লিতে ফেরত নিয়ে আসার পথে শাহজাদা জওনা খাঁ সুলতানের সংবর্ধনার নাম করে নিকেশ করলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিনকে। আর, নিজে ‘মহম্মদ বিন তুঘলক’ নাম নিয়ে বসলেন দিল্লির তখ্তে।
বিন তুঘলকের ‘তুঘলকি’ কারবারে ব্যস্ত থাকা তঁাকে বাংলার দিকে চোখ ফেরাতে দেয়নি। তাই সেই সময়ে বাংলার বিভিন্ন এলাকায়– যেমন গৌড় বা লখনৌতি, সোনারগাঁ, টানডা প্রভৃতি অঞ্চলে নিজেদের ‘স্বাধীন শাসক’ হয়ে বসা শাসকদের হটিয়ে, ১৩৪২ নাগাদ বাংলার সুলতানির সূত্রপাত ঘটালেন সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। তাঁর স্থাপন করা ইলিয়াস শাহি বংশ অবশ্য কয়েক দশক পরে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল, ১৪১৪ সালে রাজা গণেশের বিদ্রোহের ফলে।
এই হিন্দু সুলতানের বংশ বাংলা শাসন করে বছর কুড়ি। তারপর ইলিয়াস শাহি বংশের ক্ষমতা
ফিরেছিল, তবে বছর পঞ্চাশের বেশি তারা আর টিকতে পারেনি। তারপর ৭ বছর শাসন চালিয়েছিল আবিসিনি বংশোদ্ভূত সুলতানরা, যাঁদের পরিচয় ‘হাবশি’ বংশ নামে। তঁাদের পরে আসেন ১৪৯৪ থেকে ১৫৩৮ পর্যন্ত হুসেন শাহি বংশীয় চার সুলতান। ১৫৩৮ সালে আবার পরাধীন হয়েছিল বাংলা।
তবে সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন যে, বাংলার সুলতানদের প্রধান কেন্দ্রগুলি গৌড় বা লখনৌতি সাতগঁা সোনারগাঁ পাণ্ডুয়া বা বাণিজ্য কেন্দ্র চট্টগ্রাম হলেও শুধু বঙ্গদেশ নয়, বিহারের কিছু অংশ অসম ও ত্রিপুরার বহু এলাকা এবং আরাকানের কিছু অঞ্চলও কখনও বাংলার সুলতানির আওতায় চলে এসেছিল। তাছাড়া এক বংশের হাতে থাকা ক্ষমতা যে শান্তিপূর্ণ পন্থায় অন্য সুলতানি বংশের করায়ত্ত হয়েছে, তেমন মনে করারও কোনও কারণ নেই। জাতিগত বিচারে এই সুলতানদের কাউকেই ‘বাংলার ভূমিপুত্র’ বলা যায় না। এঁরা প্রধানত তুর্কি আফগান পাঠান হাবশি বা আরব বংশোদ্ভূত। তবু তাঁরা এখানে এসে থেকে গিয়েছিলেন, আর হিন্দুস্তানের অন্য কোনও অঞ্চলের শাসকদের খবরদারি না মানার ব্যাপারটা গেঁথে গিয়েছিল তাঁদের মানসিকতায়।
অবশ্য ১৫৩৯ সালে আবার পরাধীন হতে হয়েছিল বাংলাকে। এবার শেরশাহ সূরি-র শাসনাধীন হল বাংলা। কিন্তু ১৫৫৪ সালে তঁাদের বিদায় করে স্থাপিত হল ১০ বছরের জন্য মহম্মদ শাহি সুলতানদের স্বাধীন শাসন আর ১৫৬৪ থেকে ১৫৭৬ পর্যন্ত কাররানি সুলতানদের রাজত্ব। এই সময়েই মাথাচাড়া দিয়েছিল কুখ্যাত ‘কালাপাহাড়’। ১৫৭৬ সালে আবার এখানকার বেশ কিছু এলাকার দখল গেল সম্রাট আকবরের মুঘল সাম্রাজ্যের হাতে।
কিন্তু আকবরও খুব সুস্থিরভাবে সুবা বাংলাকে শাসন করতে পারেননি। থাঁকে এবং পরবর্তী সম্রাট জাহাঙ্গিরকে বরাবর নানাভাবে ব্যতিব্যস্ত করেছে ঈশা খাঁ, থাঁর পুত্র মুসা খাঁ বা যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্য, এবং বিখ্যাত ১২ জন ভূস্বামীর অন্যরাও। একবার তো আকবরের সৎভাই মির্জা হাকিমকে নেতা বানিয়ে বাবা খাঁ কাকশাল এবং জবায়েদ খাঁ বাংলা ও বিহারকে ‘স্বাধীন’ বলে ঘোষণাও করে ফেলেছিল। সেবার প্রথমে রাজা টোডরমল এবং পরে মির্জা আজিজ কোকা-কে পাঠিয়ে কোনওমতে বিদ্রোহ দমন করতে পেরেছিলেন আকবর বাদশাহ।
বাংলার ‘বুলঘাকপুর’ নামটির খাতিরেই বোধহয় একবার জাহাঙ্গিরের তৃতীয় পুত্র শাহজাদা খুররম বাপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বাংলায় এসে ঠাঁই নিয়েছিলেন। সেই বিদ্রোহ অবশ্য অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে বাদশাহি ফৌজ। বাংলায় মুঘল সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়েছে আওরঙ্গজেবের শাসনেও। মেদিনীপুরের জমিদার শোভা সিং এবং আফগান সর্দার রহিম খঁা দখল করে নিয়েছিল বর্ধমান মেদিনীপুর মুর্শিদাবাদ হুগলি প্রভৃতি বাংলার পশ্চিমদিকের কিছু এলাকা। সপ্তদশ শতকের একেবারে শেষদিকে এই বিদ্রোহ মুঘল বাহিনী দমন করতে পেরেছিল বটে। কিন্তু তার বছর-কুড়ি পার হতে না হতে বাংলায় যা ঘটল, তাকে বোধহয় এখানকার মাটিতে বিপ্লব আর বিদ্রোহের বীজ থাকার ফলাফল মনে করা যায়।
সূর্যনারায়ণ মিশ্র পরে ধর্মান্তরিত হয়ে মহম্মদ হাদি-কে বাংলা, বিহার, ওড়িশার নবাব অর্থাৎ বাদশাহের প্রতিনিধি নিয়োগ করা হল বাদশাহ ফারুকশিয়রের শাসনকালে। মুঘল সম্রাটের অবস্থা তখন বেজায় নড়বড়ে। মহম্মদ হাদি, বাদশাহি খেতাবে মুর্শিদকুলি খাঁ এখানে এসে এখানকার মাটির গুণেই হয়তো স্বাধীন হয়ে পড়তে বেশি সময় নিলেন না। থাঁর পরবর্তী নবাব, জামাই সুজাউদ্দিন মহম্মদ খাঁ, তারপর সুজাউদ্দিনের পুত্র সরফরাজ খাঁ, কেউ আর দিল্লির দিকে ফিরে তাকায়নি।
অবশ্য ১৫৩৯ সালে আবার পরাধীন হতে হয়েছিল বাংলাকে। এবার শেরশাহ সূরি-র শাসনাধীন হল বাংলা। কিন্তু ১৫৫৪ সালে তঁাদের বিদায় করে স্থাপিত হল ১০ বছরের জন্য মহম্মদ শাহি সুলতানদের স্বাধীন শাসন আর ১৫৬৪ থেকে ১৫৭৬ পর্যন্ত কাররানি সুলতানদের রাজত্ব।
তবে সরফরাজকে উৎখাত করল তাঁরই অধস্তন, বিহারের নবাব-নাজিম, পাঁচ-হাজারি মনসবদার মির্জা মোহাম্মদ আলি ওরফে আলিবর্দি খাঁ। আলিবর্দি ‘নবাব’ হলেন। বাংলার ‘স্বাধীন নবাব’ তিনিও এবং স্বাধীন তাঁর পরবর্তী নবাব, দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা। সিরাজের পতনের পর আবার স্বাধীনতা চলে গিয়েছিল বাংলার। এবার আর মুঘল, তুর্কি বা আফগান নয়; আরও দূর পশ্চিম থেকে আসা ইংরেজরা প্রথমে বাংলা, তারপর প্রায় সমস্ত ভারত ভূখণ্ডের দখল নিয়েছিল।
কিন্তু বাংলার মাটিতে, জলে, হাওয়ায় ছড়িয়ে থাকা বিপ্লবের ভাইরাস ইংরেজদের নিশ্চিন্ত হতে দেয়নি। এই বাংলার মাটিতেই মঙ্গল পাণ্ডে দেশব্যাপী ছড়ানো ১৮৫৭-র ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম গুলিটি ছুড়েছিলেন। ‘অগ্নিযুগ’-এর বিপ্লবীদের সবচেয়ে বড় ঘঁাটি তথা কর্মভূমি ছিল এই বাংলা। এখানকার বিপ্লবীদের ভয়েই ইংরেজরা ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল দিল্লিতে। ব্রিটিশ সরকার বা ইংল্যান্ডের রাজা তঁাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ গণ্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন এই বাংলারই বীর সুভাষচন্দ্র বসুকে।
ভারতের স্বাধীনতা এসেছিল অনেক ঘাম-রক্ত, শ্রম-প্রাণ, আবেগ ইত্যাদির বিনিময়ে। এগুলির সিংহভাগ গিয়েছিল এই ‘বুলঘাকপুর’ বা বিদ্রোহের ভূমি থেকেই। সেই বিদ্রোহের ভূমিকে দ্বিখণ্ডিত হতে হয়েছিল স্বাধীনতার মূল্য চোকাতে। স্বাধীনতার সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছিল সার্বভৌম গণরাজ্যের। একটি কেন্দ্রীয় সরকার আর প্রত্যেক রাজ্যে একটি করে বিধান পরিষদ সংবলিত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সৃষ্ট ‘গণরাজ্য’ বা ‘রিপাবলিক’-এর একটি রাজ্য হয়ে থেকে গিয়েছিল বঙ্গদেশের পশ্চিম দিকের অংশটি। তার বাকি অংশ ভাগ হয়ে অন্য দেশে পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু বাংলা অঞ্চলের সেই বিপ্লবী, বিদ্রোহী মনোভাব স্বাধীনতার পরেও তো গেল না। ১৯৪৭ থেকে বছর ২০ কেন্দ্রে ও রাজ্যে, অর্থাৎ সংসদে ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায়, একই রাজনৈতিক দলের, অর্থাৎ কংগ্রেসের, সরকার ক্ষমতাসীন থাকলেও ১৯৬৭ সালে কংগ্রেস থেকে ভাগ হয়ে বেরিয়ে আসা ‘বাংলা কংগ্রেস’ ক্ষমতায় আসে। এই ঘটনাকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ‘বিপ্লব’ মনে করতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু অনেক বিপ্লবের মতো এই বিপ্লবে পাওয়া ক্ষমতাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, বাংলা কংগ্রেস যাদের সঙ্গী হিসাবে পেয়েছিল তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসভঙ্গে। অল্প সময়ের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি শাসন ঘোষিত হয়, আর কিছু দিনের আবার ফিরে আসে কংগ্রেসি সরকার।
পঁাচ বছর পর কংগ্রেস ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল আর পশ্চিমবঙ্গের গদি দখল করে বাংলা কংগ্রেসের সেই জোটসঙ্গীরা, যারা আপন পরিচয় দেয় ‘বামপন্থী’ রূপে। পশ্চিমবঙ্গে তাদের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস তখন কেন্দ্রে সরকার গড়েছে, আর দ্বিচারিতার চূড়ান্ত ঘটিয়ে নিজেদের ‘বামপন্থী’ মনে করা পশ্চিমবঙ্গ শাসনকারী দল সংসদে সমর্থন জুগিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে কংগ্রেস সরকারকে, এ-রাজ্যে যারা তাদের প্রধান বিরোধী।
বিপ্লবের দেশ পশ্চিমবঙ্গ শাসন করলেও তাদের নীতিকথার ‘বিপ্লব’ তখন মাথায় উঠেছে! কেন্দ্রে তাদের সমর্থন পেতে উন্মুখ কংগ্রেস বাংলায় তাদের বিরোধিতার কথা ভাবতেই পারে না। এমতাবস্থায় আরও একবার বিদ্রোহ ঘটল ‘বুলঘাকপুর’ বাংলার মাটিতে। বিদ্রোহ এবারও কেন্দ্রে থাকা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। কংগ্রেসেরই একাংশ দল ছেড়ে বেরিয়ে এসে নতুন দল সৃষ্টি করল আরও বছর ১৪ চেষ্টায় হটিয়ে দিতে পারল পশ্চিমবঙ্গের মৌরসিপাট্টা গেড়ে বসা, নিজেদের ‘বামপন্থী’ মনে করা সরকারকে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, সেই ঘটনার বছর তিনেকের মধ্যে সংসদে ক্ষমতা হারাল কংগ্রেস দল, আর কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হল অ-কংগ্রেসি দক্ষিণপন্থী দল ভারতীয় জনতা পার্টি।
আর তার থেকেও বেশি আশ্চর্যের ঘটনা– সেই থেকে এখনও পর্যন্ত বাংলার সরকার আর কেন্দ্রের সরকার পরিচালনা করে এমন দু’টি দল, যারা পরস্পরের ঘোর বিরোধী। কোন দলের নীতি বা দুর্নীতি কোন পর্যায়ের, তাদের ক্ষমতায় থাকা বা না-থাকার ‘ফল কাঁচা বা পাকা’, তা নির্ধারণের দায় এই আলোচকের নেই। এখানে শুধু দেখানো হল, সে-ই কোন যুগে সুলতানি আমলে বাংলা মুলুককে যে ‘বুলঘাকপুর’ আখ্যা দেওয়া হল, সেই নামটির যৌক্তিকতা বাংলার মাটি এখনও বজায় রেখেছে– বৈপ্লবিক মানসিকতার ‘দুর্জয় ঘাঁটি’ হয়ে থাকার সুবাদে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
prasenjit2012@gmail.com
