প্রধানমন্ত্রী চিন্তিত। 'শুদ্ধ' বাংলা বলা লোপ পাচ্ছে বঙ্গে। কারণ, অনুপ্রবেশ। কে বলবে তাঁকে, বাংলা ভাষা বহুস্বরিক, বহুস্তরীয়, মান্য-অমান্যে ভরা!
কয়েকটি মার্কামারা দিনক্ষণ আছে, যখন 'দুয়োরানি' বাংলা ভাষার ছিপে টান পড়ে। পঁচিশে বৈশাখ ও বাইশে শ্রাবণের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারটি জমকালো। বাঙালির হেন অনুভূতি নেই যা নাকি রবীন্দ্রনাথ স্পর্শ করতে পারেননি- এই গর্বিত পদক্ষেপ বাঙালিকে বাংলা ভাষার উঠোনে টেনে নিয়ে যায়, 'কবিগুরু'-র জন্ম ও মৃত্যুদিনে। নববর্ষও একটি উপলক্ষ বটে। বাঙালির হাতে পেনসিল ব্যতীত আর কী রহিল তা জানতে ও বুঝতে। এর পরের দফায় আসবে, ভোট।
এ রাজ্য বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রাসীন রাজনৈতিক দলটির 'পাখির চোখ'। সাম-দাম, দণ্ড-ভেদ। সর্বতো পন্থায় গেরুয়া শিবির বিচিত্রমুখী প্রয়াস চালিয়ে চলেছে এখানকার রাজনৈতিক দায়িত্বভার অর্জন করতে। কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টির গোবলয়-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক ন্যারেটিভ বঙ্গে অদ্যাবধি সেভাবে দাগ কাটতে পারেনি। গরম-গরম বুলি, লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতি ভোটের আগে সব দলই কম-বেশি প্রচারের অভিমুখ করে তোলে। নবীন প্রজন্মের ভোটার এ বিষয়ে অবহিত। তাদের কাছে বরং যেটি অভিনিবেশের বিষয়, তা হল, বাঙালি-মানসের মর্যাদা রক্ষিত হচ্ছে তো! না কি প্রমিসের বানে ভেসে যাচ্ছে বাঙালির সাংস্কৃতিক কৌলীন্য?
এই প্রশ্নটি উঠলে, বিজেপির তরফে ফ্রন্টফুটে এসে, সপাটে ড্রাইভ হাঁকানো শক্ত। হতে পারে, অন্য রাজ্য থেকে আগত গেরুয়া-নেতাদের মুখে বাংলা ভাষাটি সেভাবে রপ্ত হয়নি। না হওয়ার মধ্যে অস্বাভাবিকত্ব নেই। ক'জন বাঙালি নিপুণ হিন্দি বলতে দক্ষ? ক'জন বাঙালি চমৎকার গুজরাটি বা ওড়িয়া বা কন্নড় বলতে পারে? বিজাতীয় ও বিমাতার ভাষা রপ্ত করা সহজ নয় কারও পক্ষে। কিন্তু অন্যের ভাষা ভুলভাবে বলা হচ্ছে জানলে- বাঙালি শরম বোধ করে। অন্য প্রদেশের কোনও স্মরণীয় ব্যক্তির নামটি ভুল পন্থায় উচ্চারণ করে বাঙালি স্বস্তি পায় না, সে-ত্রুটি ধরা পড়লে, অসোয়াস্তি আরও বাড়ে। অথচ 'বহিরাগত' ভিন্ন সংস্কৃতির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বগণ অক্লেশে, অবহেলায়, অনাদরে ভুল বাংলা বলে চলেন, কেবলমাত্র নির্বাচনী প্রচারে মানুষের মন জয় করতে। এর ফলে যে হৃদয়ে স্থান পাওয়া দুষ্কর হতে পারে, সে-জ্ঞান তাঁদের লোপ পায়।
গরম-গরম বুলি, লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতি ভোটের আগে সব দলই কম-বেশি প্রচারের অভিমুখ করে তোলে। নবীন প্রজন্মের ভোটার এ বিষয়ে অবহিত। তাদের কাছে বরং যেটি অভিনিবেশের বিষয়, তা হল, বাঙালি-মানসের মর্যাদা রক্ষিত হচ্ছে তো!
এ-বঙ্গে, বাংলা ভাষার ব্যবহারিক পুঁজির ভাঁড়ারটি আহামরি সবল নয়। প্রচুর মানুষ কথা বললেও বাজার অর্থনীতিতে বাংলা ভাষা তেমন দাগ কাটতে পারে না তাই। এই ক্ষত ও মনখারাপ সঙ্গে নিয়েই বাঙালি ঘর-করা। এমতাবস্থায় ভুল বাংলা শুনে চিত্তবিক্ষেপ ঘটবেই। তায় প্রধানমন্ত্রী, যাঁর 'শুদ্ধ' বাংলায় কথা বলতে পারার দক্ষতা প্রশ্নাতীত নয়, ভোটপ্রচারে এসে, বাঙালি অস্মিতা জাগিয়ে তুলতে গিয়ে, 'নির্ভুল' বাংলার বলার দক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক বয়ান তৈরিতে ব্যস্ত! তাঁর মতে, অনুপ্রবেশের কারণে, বঙ্গে অশুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলার প্রবণতা ও দৃষ্টান্ত নাকি বাড়ছে। এগুলিকে শনাক্ত করতে অনুরোধ করেছেন তিনি। তাঁকে কে বোঝাবে- 'অনুপ্রবেশ' শব্দের ভৌগোলিক পরিধি অনেক ছড়ানো। আর, 'ধ্রুপদী' ভাষা বাংলার অস্তিত্বটি বহুস্বরিক, বহুস্তরীয়। 'মান্য' বাংলা নিয়ে রাজনীতি সেজন্য মানায় না।
