হুমায়ুন কবীর কি আকাশ থেকে পড়লেন, না কি তেমন দরের কোনও রাজনীতিবিদ! গল্পের গরু তাহলে গাছে উঠল কেন? তিনি কে, কী তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার, লোকাল স্টেটাসই বা কী, মোল্লার দৌড় আসলে কত দূর- সবই মুর্শিদাবাদের মানুষের জানা। আপাদমস্তক খামখেয়ালি এবং বিপজ্জনক এই ব্যক্তি তৃণমূল, বিজেপি এবং কংগ্রেস, তিন দলের হয়েই ব্যাটিং করেছেন। এবং সেই সেই দলে ঘরে-বাইরে অস্বস্তির কারণ হয়েছেন। ভোটের মুখে তিনি বাবরি মসজিদ গড়তে উদ্যোগী হলেন যখন, তখনই বোঝা গিয়েছিল পিছনে বড় খেলা আছে। দাবার বোড়ে 'বাবরপুত্র'।
আমি নতুন দল গড়ছি। ১০০ আসন জিতব এবং বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হব। নতুন দল যে কেউ গড়তে পারে, তাই বলে মুখ্যমন্ত্রী। হুমায়ুনের মুখে একথা শুনে ঘোড়াও হেসে ফেলে। তদুপরি তাঁকে নিয়ে মিডিয়া এত বাড়াবাড়ি শুরু করে যে সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহলের উদ্রেক হয়। অনেকেই বিশ্বাস করছিল, তৃণমূলের মুসলিম ভোট বেশ খানিকটা কেটে শাসক দলকে বেগ দেবেন তিনি। কিন্তু দ্রুত ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে গেল। ঠিক কী উদ্দেশ্য নিয়ে কাকে সুবিধা করে দেওয়ার জন্য হুমায়ুন বাবরি মসজিদের নাটক করেছিলেন, কেন মুসলিম ভোট কাটতে নতুন দল গড়তে উদ্যোগী হয়েছেন, কোথা থেকে এসে গেল এত টাকা, কে দিল সবুজ রঙের হেলিকপ্টার, কেন পেলেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা বলয়, তা এখন জলের মতো পরিষ্কার। এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে 'ডিল' করলে মুখ পুড়বেই। একটা
স্টিং অপারেশনে নিজের অভিসন্ধি দাপিয়ে বলে হুমায়ুন বুঝিয়ে দিলেন তিনি আসলে একজন ওভাররেটেড নেতা। তাঁর কোনও ক্রেডিবিলিটিই নেই। বাঁদরের হাতে তরবারি তুলে দিলে এমনই হয়।
কিন্তু আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি এটা দেখে যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হঠাৎ হুমায়ূনকে বাঁচাতে নামলেন কেন? তাঁর আগ বাড়িয়ে 'এআই' প্রসঙ্গ তোলার খুব কি দরকার ছিল? এটা কি প্ল্যান ভেস্তে যাওয়ার ক্ষোভ? ভিডিওটি যে এআই ব্যবহার করে তৈরি নয় তা শুরুতেই বুঝিয়ে দেয় হুমায়ূনের জোটসঙ্গী আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল আইমিম। কালবিলম্ব না করে তারা তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে একা লড়ার কথা ঘোষণা করে। বিজেপির সঙ্গে হুমায়ুনের এই সখ্যর ভাগীদার হতে রাজি হয়নি আইমিম। তাদেরও মুসলিম ভোট হাতে নিয়ে করেকস্মে খেতে হয়। সে'দলের দ্রুত পলায়ন হুমায়ুনকে আরও বেআব্রু করে।
আর্টিফিশিয়াল ইন্ট্যালিজেন্স বা এআই এক আশ্চর্য ও প্রগতির অনিবার্য আবিষ্কার। যেখানে একজন মানুষকে জ্যান্ত নকল করা যায়। এমন সূক্ষ্ম সেই কাজ যে হুবহু এক মনে হয়। পাশাপাশি এও ঠিক, কিছু বিষয় আছে যা অনুরূপ করা শক্ত। যেমন ভিডিও এবং অডিওর মিশ্রণ এখনও এআই সেভাবে রপ্ত করতে পারেনি। ফাঁকফোকর থাকেই। তাছাড়া এখন প্রচুর এআই ট্র্যাকার অ্যাপ বাজারে বেরিয়ে গিয়েছে। তা দিয়ে সহজেই সত্য-মিথ্যা ধরে ফেলা সম্ভব। ফলে দ্রুত সবাই জেনে যায় ভিডিওটি খাঁটি কি না। হুমায়ুন ফেঁসে গিয়ে এআইকে শিখণ্ডী করছেন। পরে অবশ্য স্বীকার করতে বাধ্য হন। এখন তিনি খুঁজছেন তাঁর বহরমপুরের বাড়িতে ২০২৫ সালে ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় যাওয়া দিল্লির ছদ্মবেশী সাংবাদিক ও এক মহারাজকে। যারা খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অপারেশনটি করেছেন। ডিলটা সামনে এনেছেন। পৃথিবীতে যাবতীয় স্টিং প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্তরা যা করে, হুমায়ুনও তাই করেছেন। কিন্তু তাঁদের খুঁজে কী হবে, বন্দুক থেকে গুলি বেরিয়ে গিয়েছে। এখন আর কিছু করার নেই।
প্রশ্ন, নরেন্দ্র মোদি এই কেচ্ছায় নিজেকে জড়ালেন কেন? এড়িয়ে গেলেই তো ভাল হত। প্রধানমন্ত্রী কি খোঁজ রাখেন না, না কি তাঁর বৃত্তে যাঁরা আছেন, তাঁরা সঠিক খবর তাঁকে দেন না? হুমায়ুন যখন ভেঙেছেন তখন আগ বাড়িয়ে মচকাতে যাওয়ার দরকার ছিল না। রাজনৈতিক সভায় বলে দিলেন, তৃণমূল এআই ভিডিও বানাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই 'ঠাকুরঘরে কে, আমি তো কলা খাইনি' প্রবাদ সামনে এসে গেল। এমনও হতে পারে মোদি ইচ্ছা করে বলেছেন। তাঁর পিএমও যেহেতু জড়িয়ে গিয়েছে হাজার কোটি কাণ্ডে, তাই ভোটের মুখে ডিফেন্স নয়, অ্যাটাকে গেলেন। কিন্তু তাতে সত্য আড়াল হল না। আমি আগেও লিখেছি, এবারের নির্বাচনে বিজেপির একমাত্র স্টস্ট্র্যাটেজি তৃণমূলের পক্ষে থাকা মুসলিমদের একছত্র সমর্থন ভেঙে দেওয়া। এর কারণ, বাংলায় হিন্দু ভোটের সম্পূর্ণ মেরুকরণে ব্যর্থতা। তাদের বোঝা উচিত, বাংলা অসম নয়।
এই মাটিতে নবজাগরণের একটা ইতিহাস রয়েছে। হাজার হাজার বছরের প্রাচীন উর্বর সংস্কৃতি রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরব থেকে দেশের প্রথম নোবেল রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলার মানুষের একটি সুমহান অহংকার। সুলতানি আমল, মুঘল আমল, নবাবি আমল, ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন, দেশভাগ থেকে '৭১-এর যুদ্ধ পেরিয়ে এলেও মুসলিম লীগ অথবা হিন্দু মহাসভা এই বাংলায় দাঁত ফোটাতে পারেনি।
এই মাটিতে নবজাগরণের একটা ইতিহাস রয়েছে। হাজার হাজার বছরের প্রাচীন উর্বর সংস্কৃতি রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরব থেকে দেশের প্রথম নোবেল রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলার মানুষের একটি সুমহান অহংকার। সুলতানি আমল, মুঘল আমল, নবাবি আমল, ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন, দেশভাগ থেকে '৭১-এর যুদ্ধ পেরিয়ে এলেও মুসলিম লীগ অথবা হিন্দু মহাসভা এই বাংলায় দাঁত ফোটাতে পারেনি। অনেকে বলবে, তাহলে এখন বিজেপির বাংলায় উত্থান কেন হল? অঙ্ক খুব সোজা। বিজেপি দিল্লিতে ক্ষমতায়। সিপিএম কংগ্রেস বাংলায় শক্তিহীন। তাদের ভোটাররা রাতারাতি কি হারিয়ে যাবে? মোটেই না। একটা মঞ্চ তাদের চায় তৃণমূলের বিরোধিতা করার জন্য। বিজেপি যে ৩৮ শতাংশ ভোট পায়, সেটার সিংহভাগ তৃণমূল তথা প্রতিষ্ঠানবিরোধী মানুষের ভোট। বহু ধর্মনিরপেক্ষ মানুষেরও ভোট। যারা মূলত তৃণমূলকে চায় না। সবটা মোটেও হিন্দুত্বের বা মেরুকরণের ভোট নয়। বাংলার হিন্দু সমাজ ধর্মপ্রাণ হলেও বেসিক্যালি অসাম্প্রদায়িক। তারা দিনের শেষে হিন্দু-মুসলিম বুটিঝামেলা চায় না। তবু লাগাতার হিন্দুত্বের প্রচারে মুসলিমপ্রধান এলাকায় বিজেপি হিন্দু ভোটের মেরুকরণে অনেকটা সফল হলেও হিন্দুপ্রধান প্রায় ২০০ অধিক আসনে মেরুকরণ করা যায়নি। বিশেষ করে সাধারণ খেটে খাওয়া গরিব মানুষের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধায়ের জনপ্রিয়তা তারা এখনও পর্যন্ত মেরুকরণ দিয়ে ভাঙতে পারেনি। 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার'-সহ সামাজিক প্রকল্পের আলোয় সাধারণ মানুষ এতটাই আলোকিত যে ভোট দেওয়ার আগে হিন্দুত্বের চেয়েও 'মমত্ব' বেশি গুরুত্ব পায়। তৃণমূল নেত্রী এমনি বলেন না, '২৯৪ আসনে আমিই প্রার্থী'। তদুপরি বিজেপির অঙ্ক ছিল তাদের ঝুলিতে না-আসা ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটে যদি বিভাজন করে দেওয়া যায় তাহলে তৃণমূলের আসন আর দুই তৃতীয়াংশ ছোঁবে না, বরং ম্যাজিক ফিগারের সীমা সামান্য পেরিয়ে থাকবে। তেমন হলে অচিরেই মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটক ও গোয়া মডেলের প্রতিফলনে নবান্নের নীল রং গেরুয়া করে দেওয়া যাবে। ধুরন্ধর রাজনীতিক অমিত শাহ এমন একটি প্ল্যান করতেই পারেন।
কিন্তু তাই বলে দাবার বোড়ে হুমায়ুন কবীর? একটু মেপে পা ফেলা উচিত ছিল। তাঁর ক্ষমতা আগেই দেখে নেওয়া হয়েছিল। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে হুমায়ুন বিজেপির প্রার্থী ছিলেন বহরমপুরে। স্টিং অপারেশনে গোপন ক্যামেরার সামনে হুমায়ুন যা বলছেন তা ভয়ংকর। তৃণমূলের মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক ভাঙতে হাজার কোটির ডিল। প্রধানমন্ত্রীর দফতরকে যুক্ত করেছেন তিনি। একাধিক বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে মুসলমান ভোট ভাঙা নিয়ে পরিকল্পনার কথা তাঁর মুখে। টাকা দিয়ে মুসলিমদের বোকা বানানো পরিহাস করে বলেছেন। সর্বোপরি ভোটের আগে বাবরি মসজিদ আবেগ উসকে ভোট মিটলে চুপ করে যাওয়া। ফেঁসে গিয়ে হুমায়ুন বলেছেন, তাঁর এই ভিডিওটি আরও বড়, দেখানো হয়েছে মাত্র ১৯ মিনিট। তাতে কী হবে? পুরো ভিডিওয় যদি আরও কিছু চমকপ্রদ নতুন তথ্য থাকেও তাতে ১৯ মিনিটের হাটে হাঁড়ি ভাঙা বিষয় মিথ্যা হয়ে যাবে না। স্বাভাবিকবেই তিনি আর কিছু আড়াল করতে পারবেন না।
এবারের ভোটে এসআইআর কাণ্ড, ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়া যদি প্রধান ইস্যু হয়, তা হলে বলতে দ্বিধা নেই এই স্টিং অপারেশন এখনও পর্যন্ত সব চেয়ে বড় চমক। ঠিক ১০ বছর আগে এমনই বিধানসভা ভোটের মুখে নারদ স্টিং অপারেশন সামনে এসেছিল। মূলত নেতাদের হাতে টাকা গুঁজে দেওয়ার পরিকল্পিত ভিডিও। সেটা তৃণমূলের কোনও ক্ষতি করতে পারেনি। কারণ, মানুষ তৃণমূলকে ভোট দেয় মমতাকে দেখে। কিন্তু হুমায়ুনের ভিডিও তাঁর নিজের কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি। সাংঘাতিক পরিকল্পনার পর্দা ফাঁস।
এবারের ভোটে এসআইআর কাণ্ড, ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়া যদি প্রধান ইস্যু হয়, তা হলে বলতে দ্বিধা নেই এই স্টিং অপারেশন এখনও পর্যন্ত সব চেয়ে বড় চমক। ঠিক ১০ বছর আগে এমনই বিধানসভা ভোটের মুখে নারদ স্টিং অপারেশন সামনে এসেছিল।
প্রশ্ন উঠবে হুমায়ুনের স্টিংয়ের প্রভাব ভোটে কতটা পড়বে। সেটা পরে বোঝা যাবে। কিন্তু মুসলিম সমাজের চোখে 'গদ্দার' হয়ে গেলেন হুমায়ুন। তাঁকে তারা বিশ্বাস করবে না তো বটেই, গোপনে মদত দেওয়া বন্ধুরাও সরে যাবেন পাশ থেকে।
বঙ্গ সফরের তৃতীয় রাউন্ডের এই লেখা লিখছি উত্তরবঙ্গে বসে। বর্ষশেষের সূর্য অস্ত যাচ্ছে পাহাড় জঙ্গল চা বাগানে। নতুন বছর স্বাগতম। সেই সঙ্গে নতুন বাঁক এল বিধানসভা ভোটে। শোনা যায় সিঁড়িতে পড়ে মাথায় মারাত্মক জখম হয়ে যবনিকা নেমে এসেছিল দিল্লির মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের। মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে রাজনীতির ফুটো মস্তানের সঙ্গে তাঁর পরিণতির তুলনা টানছি না। শুধু বলি, বিপদে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দিল্লির শাসক দেশের প্রধানমন্ত্রী। না জেনে 'বঙ্কিমদা' বলার মতোই এও এক মহাভুল।
