অর্থোডক্স ইস্টার উপলক্ষে ৩২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি শর্ত মেনেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। আমরা বিরতি নয়, পূর্ণাঙ্গ সমাপ্তি চাই যু্দ্ধের।
‘রাজকাহিনী’-তে পৃথ্বীরাজের বীরত্ব ও মানবিকতার গল্প শুনিয়েছেন অবন ঠাকুর। মহারানার আত্মীয় সুরজমল ও সারংদেব বিদ্রোহী হয়েছেন। পৃথ্বীরাজ তখন অনেক দূরে, কমলমীরে। গাভিরী নদীর ধারে রানার ফৌজের সঙ্গে সুরজমলের ফৌজের যুদ্ধ শুরু হল। দিনের শেষে দেখা গেল, রানার ফৌজ পিছু হটছে। তাহলে কি আশা শেষ? এমন সময়, সূর্যাস্তের মুখে, হাজারখানেক সেনা নিয়ে হাজির পৃথ্বীরাজ। তখন আলো নেই আর। অতএব, বিরতি।
অনেকগুলি অস্ত্রাঘাতে সুরজমল কাবু হয়ে পড়েছিলেন। নাপিত ডেকে ধুয়ে-মুছে পট্টি লাগানোর কাজ যখন চলছে, তখন শিবিরে প্রবেশ করলেন পৃথ্বীরাজ। এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না সুরজমল। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বুকের পট্টি ছিঁড়ে রক্তপাত ঘটল। শত্রু স্বয়ং হাজির শিবিরে! আঘাত হানতে কতক্ষণ! কিন্তু পৃথ্বীরাজের তরফে আক্রমণের কোনও চিহ্ন দেখা গেল না। সম্পর্কে ‘খুড়ো’ সুরজমলকে যত্ন করে বিছানায় বসিয়ে খোশগল্প শুরু করলেন। এত দিন পরে দেখা! এক সময় দাসী খাবার নিয়ে এল। এক থালা থেকেই দু’জনে ভাগ করে নিলেন রাতের দানাপানি। বিদায় নেওয়ার সময় অবশ্য দু’-পক্ষের তরফেই জারি হল হুঁশিয়ারি– পরের দিন দেখে নেওয়ার।
আধুনিক সমরবিদ্যায় যুদ্ধ চলবে সূর্যে-সূর্যে এমন নিয়ম আর নেই। যুদ্ধ মানে ‘টোয়েন্টি ফোর ইনটু সেভেন’ কর্মকাণ্ড। তারই মাঝে যুদ্ধরত রাষ্ট্রনেতারা ‘যুদ্ধবিরতি’ হাঁকেন।
এমন ললিত, মধুর, স্নেহপাশে আবদ্ধ ‘যুদ্ধবিরতি’ বুঝি সাহিত্যেই সম্ভব? এ প্রশ্ন তুললে যদিও মনে পড়ে যায় ‘মহাভারত’-কথা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ভ্রাতৃনাশী। পরিবারের আত্মীয়দের বিরুদ্ধে অস্ত্রঝংকারে আর্ত। কেউ কাউকে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নয়। অথচ, রাতের আঁধারে যুদ্ধবিরতির ফাঁকে যুধিষ্ঠির গিয়েছিলেন কুরু-পিতামহ ভীষ্মের সাক্ষাৎ পেতে তাঁরই শিবিরে। এবং অস্পষ্টতা না রেখে সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন, ভীষ্মকে পরাস্ত করার উপায়। আমরা আরও অবাক হই, যখন ভীষ্ম স্মিত হেসে সত্যি বাতলে দেন কী পন্থায় যুদ্ধ করলে, দেবতারাও যাঁকে জয় করতে পারেন না, সেই শান্তনু-পুত্র ভীষ্মকে কী করে পরাজিত করা যাবে। যুদ্ধবিরতি এখানে যেন নতুন যুদ্ধকৌশলের পথসন্ধানে ব্যস্ত। মহাভারতে ‘যুদ্ধবিরতি’-র অর্থ: রাতের অন্ধকারে যুদ্ধ হবে না। যুদ্ধ হবে সূর্যে-সূর্যে। দীনকরের উদয় থেকে অস্ত অবধি সময়পর্বে। অথচ, অশ্বত্থামা এই ধ্রুপদী নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাণ্ডব শিবিরে অতর্কিত ও অভাবনীয় আক্রমণ হেনেছিলেন। যুদ্ধবিরতি এখানে হিংসাকে ত্বরান্বিত করেছে, রক্তপাতের জোয়ার ডেকেছে।
আধুনিক সমরবিদ্যায় যুদ্ধ চলবে সূর্যে-সূর্যে এমন নিয়ম আর নেই। যুদ্ধ মানে ‘টোয়েন্টি ফোর ইনটু সেভেন’ কর্মকাণ্ড। তারই মাঝে যুদ্ধরত রাষ্ট্রনেতারা ‘যুদ্ধবিরতি’ হাঁকেন। ইরানের মাটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমানের চক্কর তখন থেমে যায় ক’-দিনের জন্য। অর্থোডক্স ইস্টার উপলক্ষে রাশিয়া যেমন ৩২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে ইউক্রেনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে। আমজনতার কাছে এই যুদ্ধবিরতির তাৎপর্য ধোঁয়াশায় ঢাকা। ক্ষণিক বিশ্রাম নিয়ে আবার রক্তের ফিনকি তোলা, কোন দেশি সভ্যতা বাপু!
