রাহুল দেব বর্মণ নিজেকে ভাঙলেন, যেভাবে ভাঙলেন, তা আশা ভোঁসলের সঙ্গত ছাড়া অসম্পূর্ণ যেন। আর, আশা ভোঁসলে যেভাবে গাইলেন, যা গাইলেন, তা রাহুল দেবের সাংগীতিক সাহচর্য ব্যতীত অধরা থেকে গেলে অবাক হওয়ার ছিল না। লিখছেন অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়।
‘ভাল মেয়ে’ ও ‘মন্দ মেয়ে’। এমন উপাখ্যানে গানের জগতে কখনও বিভাজন আসা উচিত না অনুচিত– এর চেয়েও বড় কথা, এমনটিই কিন্তু অলক্ষ্যে ঘটেছিল মঙ্গেশকর পরিবারের দুই মেয়ের সুরচর্চার ফলে। লতা মঙ্গেশকরের গানে ধরা পড়ে শীলিত, স্নিগ্ধ, রুচিময় পারিবারিক মূল্যবোধে বড় হয়ে ওঠা একটি কন্যের হৃদয়বার্তা। আর, আশা ভোঁসলের কণ্ঠে দু’-ডানা ঝাপটে জেগে ওঠে সমাজের বিধি-নিষেধকে অমান্য করতে চাওয়া, খাপ পঞ্চায়েতের চোখে তথাকথিত ‘খারাপ’ একটি কন্যের অবরুদ্ধ আবেগ, তার শিরদাঁড়া তুলে দাঁড়ানোর উচ্ছ্বাস। এই ধরনের জলবিভাজিকা যে কোনও শিল্পীর পক্ষে লেবেলের মতো। কিন্তু আশা ভোঁসলে সমাজের এঁকে দেওয়া এই টিপছাপ ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এমন-এমন গান আমাদের জন্য রেখে গেলেন, যা চিরকালের সম্পদ।
যে-ভারতে তিনি গান গেয়ে হয়ে উঠেছিলেন ‘আশা ভোঁসলে’, সেই ভারতে ক্লাসিক গানের কদর ছিল যতখানি, ক্যাবারের প্রতি উন্নাসিক দুচ্ছাইও ছিল তত দূর ছড়ানো। ক্যাবারেতে বা শরীরী উচ্ছ্বাসের সুরে আমাদের চোখে সংকীর্ণতা ছিল, মনে ছিল অনুদার দাক্ষিণ্য। অথচ ও. পি. নায়ারের সঙ্গে আশা ভোঁসলের যুগলবন্দিতে আমরা যে-ধরনের গান পেয়েছি, তা যেন দৃষ্টি খুলে দেয়। আশা ভোঁসলের জন্য তৈরি হয় বিশেষ সম্ভ্রম, ঈর্ষা, কুর্নিশ।
রাহুল দেব বর্মণ নিজেকে যেভাবে ভাঙলেন, তা আশার সঙ্গত ছাড়া সম্ভব ছিল না!
গানে-গানে নিজেকে বরাবর বিচিত্র পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে আশাজির জীবনবন্দি ভারতীয় সংগীতে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। রাহুল দেব বর্মণ নিজেকে ভাঙলেন, যেভাবে ভাঙলেন, তা আশা ভোঁসলের সঙ্গত ছাড়া অসম্পূর্ণ যেন। আর, আশা ভোঁসলে যেভাবে গাইলেন, যা গাইলেন, তা রাহুল দেবের সাংগীতিক সাহচর্য ব্যতীত অধরা থেকে গেলে অবাক হওয়ার ছিল না। ‘মন্দ মেয়ে’-র সত্তা এবং পরিচয়কে ধারণ করে তিনি মুষড়ে পড়েননি, খাঁজকাটা দাগগুলিকে মুছতে চাননি। হিন্দি থেকে বাংলায় বিচরণ করেছেন স্বচ্ছন্দে, দাপটে। হিন্দির মতো বাংলা গানেও আশা-কণ্ঠে আমরা শুনেছি মোহময়ী নারীর ঝংকারবিট।
যে-মেয়ে ডিভোর্সি, যে-মেয়ে পুরুষের চোখে চোখ রেখে পানশালায় বসতে দ্বিধা করে না, যে-মেয়ে জিন্স ও বেলবটম পরে, যে-মেয়ে সিগারেট খায় ও নেশা করে, সে-মেয়েকে নীতিবাগীশদের সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু অর্ধেক আকাশের প্রতিটি মেঘচূর্ণিকায় তো এই মেয়েও ছড়িয়ে রয়েছে। তাকে ও তাদের বাদ দিয়ে না এই দেশ, না এই কাল! আশা ভোঁসলে এই মেয়েদের কণ্ঠ দিয়েছেন, সুর দিয়েছেন, গানের মায়ায় ভরিয়ে দিয়েছেন তাদের আক্ষেপ ও অনুরাগের ভুবনকে। এখনকার পৃথিবীতে মেয়েদের স্বাধীনতা, মেয়েদের একক অস্তিত্ব, মেয়েদের অপার সম্ভাবনায় যখন আমরা আন্তরিক বিশ্বাস সমপর্ণ করেছি– আশা ভোঁসলের গান তখন যেন আগুনপাখির মতো দিগন্ত পেরিয়ে অন্য দিগন্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে মশালের আলো।
এই মেয়েদের জন্যই তা অনির্বাণ।
(কথা বলে অনুলিখিত)
