'যুদ্ধ করতে চাই, যুদ্ধ করছি।' ইরান আক্রমণের পর মার্কিন মনোভাব এমনই। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ রাখঢাক না করে বলেছেন– ‘আমরা যুদ্ধের জন্য কোনও যুক্তি, নৈতিকতা, ব্যাখ্যা বা মূল্যায়নে আগ্রহী নই। ইজরায়েলের বিদেশমন্ত্রীর ব্যাখ্যা: আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের পর যিনিই ‘সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা’ হবেন, তঁাকেই ইজরায়েল খতম করবে। এরপর কী বলার থাকে?
ইরানের যে-যুদ্ধজাহাজটিকে শ্রীলঙ্কার গল শহরের কাছে মার্কিন সাবমেরিন টর্পেডো মেরে ডুবিয়ে দিয়েছে, তা ভারত থেকে সামরিক মহড়া সেরে ফিরছিল। ভারতীয় নৌ-বাহিনীর ওয়েবসাইটে এখনও জ্বলজ্বল করছে ইরানের ওই সামরিক রণতরীটিকে অভ্যর্থনা জানানোর বিজ্ঞপ্তি। ভারত মহাসাগরে যদি মার্কিন সাবমেরিন ইরানের রণতরীটিকে ডুবিয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে যুদ্ধ আমাদের একেবারে দোরগোড়ায় এসে পড়ল না? নিশ্চিতভাবেই। যুদ্ধের যে অর্থনৈতিক দিকটি, সেটি অবশ্য ইতিমধ্যেই আমরা টের পাচ্ছি, কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হু-হু করে বাড়ছে। কাতারের বিভিন্ন গ্যাস প্রস্তুতকারক জায়গায় ইরানি মিসাইল হামলার পর গ্যাসের দামও বাড়তে পারে বলে খবর। তাই যুদ্ধ আমাদের দোরগোড়ায় তো বটেই, হয়তো রান্নাঘরেও।
এখনও পর্যন্ত ইরান বনাম আমেরিকা-ইজরায়েলের (Iran-Israel War) সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে যে– না আমেরিকা, না ইজরায়েল– তাদের যুদ্ধের জন্য কোনও নৈতিক ব্যাখ্যা দিচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব, যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং আস্থাভাজন, যিনি এক সময় খাস মার্কিন মুলুকের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং আক্রমণাত্মক সঞ্চালক ছিলেন– সেই পিট হেগসেথ রাখঢাক না করে বলেছেন, ‘আমরা যুদ্ধের জন্য কোনও যুক্তি, কোনও নৈতিকতা, কোনও ব্যাখ্যা বা কোনও মূল্যায়ন কোনও কিছুতেই আগ্রহী নই। আমরা মনে করেছি ইরান আক্রমণ করব, আমরা করেছি।’ আরও তাৎপর্যপূর্ণ ইজরায়েলের বিদেশমন্ত্রীর ব্যাখ্যা। তিনি এও পরিষ্কার করে দিয়েছেন, আয়াতোল্লা আলি খামেনেই কেন, ইরানের পরবর্তীকালে যিনিই ‘সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা’ হবেন, অর্থাৎ ‘সুপ্রিম লিডার’, তঁাকেই ইজরায়েল খতম করবে।
এখনও পর্যন্ত ইরান বনাম আমেরিকা-ইজরায়েলের সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে যে– না আমেরিকা, না ইজরায়েল– তাদের যুদ্ধের জন্য কোনও নৈতিক ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
যুদ্ধের জন্য এরকম কাঠ-কাঠ, মেদহীন যুক্তি উপস্থাপনা বা নিজেদের বক্তব্য পেশ কোয়ান্তিন তারান্তিনো বা রামগোপাল বর্মার থ্রিলারেও দেখা যায় না। ‘আমাদের মনে হয়েছে, আমরা যুদ্ধ করব’– এইরকম যুক্তি দিয়ে আমেরিকা এবং ইজরায়েল নেমে পড়েছে ইরানকে ধ্বংস করতে! তার জন্য, এমনকী লিবিয়ার কায়দায়, যদি এই প্রাচীনতম সভ্যতার দেশটিকে চার টুকরো করা যায়, তাতেও মার্কিনি পরিকল্পনায় ছেদ নেই। ইরাকের দিক থেকে কুর্দি বাহিনীকে মার্কিনি মদত দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ইরানের একটি অংশ দখল করে নিজেদের ‘স্বাধীন’ এবং ‘সার্বভৌম রাষ্ট্র’ হিসাবে ঘোষণা করতে পারে। অর্থাৎ, ঠিক হিলারি ক্লিনটন এবং আগের-আগের মার্কিন প্রশাসন ইরাক এবং লিবিয়াকে নিয়ে যেরকম ছিনিমিনি খেলেছে, যার জন্য দু’টি দেশই গৃহযুদ্ধে দীর্ণ এবং জীর্ণ হয়ে গিয়েছে, তারই অনুপম পুনরাবৃত্তি। ‘জীর্ণ’ শব্দটি ব্যবহার করলাম তঁাদের উদ্দেশে, যঁারা জানেন, বাগদাদ পৃথিবীর কী মহান ঐতিহ্য, গ্রন্থাগার, সংস্কৃতি ধারণ করত– যঁারা জানেন যে, লিবিয়া কতটা উন্নততর বিজ্ঞান এবং দর্শনচর্চার কেন্দ্র ছিল!
পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা এবং আরব অঞ্চলগুলিকে অামেরিকা আসলে অশান্ত করে রেখেছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প, নোবেল শান্তির জন্য আবেদনপত্র লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া মার্কিনি ধনকুবের, কি এসব বোঝেন? তিনি তো এপাশে ইরান, তো ওপাশে ইকুয়েডরে মার্কিন সেনাবাহিনীকে নামিয়ে দিয়েছেন মাদক চোরাচালানের মোকাবিলা করতে। পৃথিবীর শান্তি ও ‘মরাল পুলিশিং’-এর দায়িত্ব যেন হোয়াইট হাউসের বর্তমান অধিপতির হাতে।
তেহরানও কি চুপ করে বসে আছে? না, তেহরান যে-কাজ করেছে, সেটার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন পশ্চিম এশিয়ার কিছু বিশেষজ্ঞ। এত দিন পশ্চিম এশিয়া বা আরব দেশগুলির মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, বাহারিন, কাতার– এরা নিজেদের তুলে ধরত বিনিয়োগের জন্য, শান্তি এবং সমস্ত সুযোগসুবিধা-সহ থাকার জন্য ‘আইডিয়াল ডেস্টিনেশন’ হিসাবে।
পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা এবং আরব অঞ্চলগুলিকে অামেরিকা আসলে অশান্ত করে রেখেছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প, নোবেল শান্তির জন্য আবেদনপত্র লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া মার্কিনি ধনকুবের, কি এসব বোঝেন?
উপসাগরের ওসব দেশে ধনকুবেরগণ বেড়াতে যেতেন, এমনকী ভারতীয় ধনকুবেররাও বাড়ি, বাংলো, ভিলা কিনতেন, নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করতেন, কেনাকাটা করতেন এবং তারপরে আবার নিজের নিজের দেশে ফিরে যেতেন। দুবাই, দোহা বা বাহারিনের রাজধানীর এই যে শান্ত, নিরুপদ্রব ‘আশ্রয়’ রূপে খ্যাতি ছিল, তা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে ইরানের মিসাইল। ঘুরতে যাওয়া অভিজাত নর-নারীদের সাততারা হোটেল ঘর ছেড়ে পার্কিং লটে বিছানা বিছিয়ে শুতে হয়েছে! এই ভিজু্যয়ালই পৃথিবীর ধনকুবেরদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। দুবাই, দোহা আর ‘আদর্শ ডেস্টিনেশন’ নয়। সেখানে গেলে মিসাইলের তাড়ায় পালাতে হতে পারে!
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক দেখলাম চমৎকার বলেছেন, অরবিন্দ কেজরিওয়াল যেমন গত দশকের শুরুতে সমস্ত রাজনৈতিক নেতাকে একেবারে পাগল করে দিয়েছিলেন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তুলে– ইরানও তেমনই পশ্চিম এশিয়ার তার সমস্ত প্রতিবেশী দেশগুলিকে বুঝিয়ে দিয়েছে, যদি তুমি আমেরিকার সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ করো, তাহলে তুমি ‘ভাল থাকবে’ এই সত্যে বিশ্বাস কোরও না। ইরানি মিসাইলের জোরাল ধাক্কা বোধহয় পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতি, সামাজিক দর্শন, এবং মননকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন সংবাদপত্র দেখলাম লিখেছে, এমনকী সাড়ে ৩ লক্ষ ডলার খরচ করেও ধনকুবেররা দুবাই বা দোহা ছেড়ে পালানোর জন্য বিমান খুঁজেছেন, কিন্তু আকাশপথই তো বন্ধ!
এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী? ইজরায়েলি বোমা হানায় রোজ ইরান কিংবা লেবাননে শয়ে-শয়ে মানুষ মারা যাচ্ছেন। ইজরায়েল তার আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে লেবাননের জমি দখল করে নিচ্ছে। তাহলে পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক এবং ‘গুরুত্বের মানচিত্র’-কে যেভাবে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বদলে দিতে চাইছিলেন, সেটাই সফল হবে? ২০০০ বছরের পারস্য সভ্যতা নুইয়ে পড়বে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘প্রোমোটারির হুঙ্কার’-এর সামনে? আমরা ঠিক জানি না। ডোনাল্ড ট্রাম্প, চিরকালই যিনি ব্যস্ত থাকেন ও দ্রুততার সঙ্গে যে কোনও কিছুকে সেরে ফেলতে চান, সেটা ‘যৌনতা হোক বা যুদ্ধ’ (সেক্স অর ওয়ারফেয়ার), সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ চার সপ্তাহের মধ্যে শেষ করতে চান।
কিন্তু ইরান চায় যুদ্ধটাকে বিলম্বিত করতে। ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ আটবছর ধরে চলা যুদ্ধ থেকে তেহরান জানে, যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে প্রত্যেকে ক্লান্ত হয়, আর মার্কিনরা তো ক্লান্ত এবং বিরক্ত হবেই। এটা ঠিক যে মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আনা প্রেসিডেন্টকে নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব রিপাবলিকানদের একজোট হওয়ার ধাক্কায় ৫৩-৪৭ ভোটে হেরে গিয়েছে। কিন্তু এ-ও সত্যি আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই নিজের দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। প্রতি চারজন মার্কিনির মধ্যে মাত্র একজন বিশ্বাস
করেন প্রেসিডেন্ট ইরান আক্রমণ করে ঠিক করেছেন। অর্থাৎ, ৭৫ শতাংশের মনোভাবই তঁার বিরুদ্ধে। তেহরানও এটা জানে। তাই আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের পরে ইরান মাথা ঝোঁকায়নি; বরং লড়াইটাকে প্রলম্বিত করার কৌশল নিয়েছে। ইজরায়েল বা আমেরিকা যদি কখনও যুদ্ধে ঢিলে দেয়, তখনই তারা আবার ঝঁাপিয়ে পড়বে পূর্ণোদ্যমে। ভারত কোথায় দঁাড়িয়ে? এ প্রশ্ন জরুরি এই কারণে, ইরান আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী। ইতিহাসের কী অদ্ভুত সমাপতন, যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকিতে আমরা নাকি রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছিলাম, সেই রাশিয়ারই এখন
ব্যারেল-ভর্তি তেল নিয়ে জাহাজ অপেক্ষা করছে ভারতের উপকূলে। এবং ভারতের ‘মোদি-বন্ধু’ সব কর্পোরেটকেও নির্ভর করতে হবে ওই রুশ তেলের উপর। ডোনাল্ড ট্রাম্প কি তাহলে শেষ পর্যন্ত জিতলেন, না, হারলেন? তিনি ইরানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মাঝখানে এসে দঁাড়ালেন বটে, কিন্তু আবার যে পুতিন ফিরে এলেন তঁার তেল নিয়ে, সেটার কী হবে?
ইরান চায় যুদ্ধটাকে বিলম্বিত করতে। ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ আটবছর ধরে চলা যুদ্ধ থেকে তেহরান জানে, যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে প্রত্যেকে ক্লান্ত হয়, আর মার্কিনরা তো ক্লান্ত এবং বিরক্ত হবেই।
(মতামত নিজস্ব)
