shono
Advertisement
Australia

পেঙ্গুইনের সোয়েটার! শতায়ু বৃদ্ধের উল-কাঁটা জাগিয়েছিল বোধের দীপশিখা

আলফ্রেড ডেট ওরফে অ্যালফি মৃত্যুর পরও রয়ে গিয়েছেন প্রাসঙ্গিক।
Published By: Biswadip DeyPosted: 06:56 PM Mar 05, 2026Updated: 07:40 PM Mar 05, 2026

মানবসভ্যতার নেসেসিটি জ্বালানি তেল। তা পেটে ভরে জাহাজেরা এ-দেশ থেকে ও-দেশ ঘোরে। যাত্রাপথে জাহাজ দোলে, ছলকে পড়ে তেল। সমুদ্রে ভাসে তেল। পেঙ্গুইনরা খাবারের খোঁজে লাফ দেয় সমুদ্রে। তেল লেগে যায় পালকে। বোকা পেঙ্গুইনগুলি বারবার ঠোঁট ঘুরিয়ে তেল চিটচিটে পালক সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, পারে না। ঠোঁটের ফাঁক গলে তেল ঢুকে পড়ে অন্ত্রে, বৃহদন্ত্রে, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে দেহ। এর প্রতিকার? লিখেছেন সুমন প্রতিহার।

Advertisement

সেবার আলফ্রেড ডেট সবে ফিরেছেন অবসরকালীন নতুন বাড়িতে। জীবনের যা কিছু আছে বাকি এখনও, এখানেই। তঁার ঠিকানা অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস। ১২ ঘণ্টাও পেরয়নি, হন্তদন্ত দুই নার্স আবদার নিয়ে এল, সোয়েটার বুনে দিতে হবে। পেঙ্গুইনদের সোয়েটার। একরত্তি পাখিগুলোর ভারি বিপদ। না, ঠান্ডা নয়, পেঙ্গুইনদের ঠান্ডাটান্ডা তেমন লাগে না। সমস্যা অন্য? মানবসভ্যতার নেসেসিটি জ্বালানি তেল। তা পেটে ভরে জাহাজেরা এ-দেশ থেকে ও-দেশ ঘোরে। শহরে, বন্দরে আলো জ্বলে। যাত্রাপথে জাহাজ দোলে, ছলকে পড়ে তেল।

সমুদ্রে ভাসে। পেঙ্গুইনরা খাবারের খোঁজে লাফ দেয় সমুদ্রেই। আলাপী সমুদ্র তাদের চেনা, চেনা জল, জলের উষ্ণতা। ডুব দেয়, খাবার খোঁজে, ওঠে আবার ডোবে। ওরা জানে না, ওদের চেনা সমুদ্রে তেল কেন ভাসে! সেই তেল লেগে যায় পালকে। বোকা পেঙ্গুইনগুলি বারবার ঠোঁট ঘুরিয়ে তেল চিটচিটে পালক সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, পারে না। ঠোঁটের ফঁাক গলে তেল ঢুকে পড়ে অন্ত্রে, বৃহদন্ত্রে, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে দেহ। অনেক বছর আগে, আলফ্রেডের ভাইয়ের স্ত্রী তঁাকে এগিয়ে দিয়েছিলেন একখানি উলের ঢেলা, আর দুইখানি উল-কঁাটা, ভাইপোর সোয়েটার বুনে দিতে। সেই শুরু, আর ফিরে চাননি আলফ্রেড, পেশা হয়ে দঁাড়ায় সোয়েটার বোনা (knitting)। আলফ্রেডের ৭ সন্তান, নাতি-নাতনির সংখ্যা ২০। শতায়ু আলফ্রেড এখন সবার আদরের ‘অ্যালফি’। অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বয়স্ক মানুষ। ঝাপসা চোখে অশক্ত হাতে আবার ধরেন উল-কঁাটা। কেন, কীসের তাগিদে, অতশত ভাবতে চান না অ্যালফি। পেঙ্গুইনগুলির কালো হয়ে আসা পালক চোখে ভাসে। ফিলিপ আইল্যান্ডে বিপদে পড়া পেঙ্গুইনদের জন্য কিছু করতেই হবে!

পেঙ্গুইনরা খাবারের খোঁজে লাফ দেয় সমুদ্রেই। আলাপী সমুদ্র তাদের চেনা, চেনা জল, জলের উষ্ণতা। ডুব দেয়, খাবার খোঁজে, ওঠে আবার ডোবে। ওরা জানে না, ওদের চেনা সমুদ্রে তেল কেন ভাসে! সেই তেল লেগে যায় পালকে।

ফিলিপ আইল্যান্ডে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ছোট পেঙ্গুইনদের বড় ঘর। ছোট পেঙ্গুইনগুলির পালক নীল-সাদা, ওজন ১ কেজি, সংখ্যায় প্রায় ৪০ হাজার। কনকনে জলে খাবারের খোঁজে নামলে পেঙ্গুইনগুলির পালকে তেলের চিট ধরে, পাখিরা পালক পরিপাটি রাখতে প্রিনিংয়ে অভ্যস্ত। প্রিন গ্রন্থি থেকে ঠোঁটে তেল নিয়ে সমস্ত পালকে বুলিয়ে নেয়। কুঁচকে যাওয়া পালক সোজা রাখতে, ধুলোটুলো ঝেড়ে পালকে তেল মাখিয়ে পালক চকচকে করে তুলতে, সারাদিনে একটা বড় সময় তাদের খরচ হয়। আর এই সময়ই পালকে মাখামাখি করে থাকা খনিজ তেল চলে যায় শরীরের অভ্যন্তরে। অ্যালফির সোয়েটার থাকলে পেঙ্গুইনগুলির পালক পরিপাটি থাকে। এ সোয়েটার উল দিয়েই বোনা।

ফিলিপ আইল্যান্ডে গিয়ে পরিয়ে দেওয়া হয় পেঙ্গুইনদের। মানুষ এ পৃথিবীতে বাকি সমস্ত প্রাণের মূল্যায়ন করেছে মানবদৃষ্টিতে। যা মানুষের কাজে লাগে তাই ‘গুড’, বাকি প্রাণের তোয়াক্কা তারা করে না। জলপথে তেল পরিবহণে যে-ত্রুটি ঘটে, ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত ভুল যাই হোক, পেঙ্গুইনরা তার মাশুল চোকায়।

মানুষের যেন কিছু যায়-আসে না। শুধু পেঙ্গুইন নয়– কচ্ছপ, তিমি, ডলফিন, সমুদ্রের ধারে ঘুরে উড়ে বেড়ানো হাজারো প্রজাতির পাখি, নানা ধরনের মাছ– প্রত্যেকের এই তেল মৃত্যু বিভীষিকা। সমুদ্রের কচ্ছপ শ্বাস নিতে গলা তুলতেই গিলে নিচ্ছে পেট্রোলিয়ামের বাষ্প, ফুসফুস বেহাল। গাঢ় তেলে কচ্ছপের ত্বকে ঘা, খাদ্যনালীতে ফুটো, চোখে কর্নিয়ায় আলসার। চনমনে কচ্ছপগুলির কাছে সমুদ্র বধ্যভূমি। বিশালাকার তিমিরাও বিপন্ন, পেট্রোলিয়ামের বিষবাষ্পে নিউমোনিয়া। তিমিদের মুখে থাকে বিশেষ বন্দোবস্ত– ব্যালিন প্লেট। ছোট মাছ-সহ হরেক মাপের খাবার ও জল গেলার পর, জিভ দিয়ে জল ঠেলে বের করার রাস্তায়, ছঁাকনির কাজ করে এই ব্যালিন। তা, জল গেল বেরিয়ে, তবে আটকে রইল খাবার। কিন্তু এই ব্যালিন প্লেটে চপচপে তেল, ছঁাকনির দফারফা।

মানুষের যেন কিছু যায়-আসে না। শুধু পেঙ্গুইন নয়– কচ্ছপ, তিমি, ডলফিন, সমুদ্রের ধারে ঘুরে উড়ে বেড়ানো হাজারো প্রজাতির পাখি, নানা ধরনের মাছ– প্রত্যেকের এই তেল মৃত্যু বিভীষিকা।

দস্যু হাঙরের ফুলকায় পেট্রোলিয়ামের পেন্ট, অক্সিজেনের অভাবে হঁাসফঁাস। ছোট হাঙরেরা তেল-মাখানো খাবার খেয়ে বড় হতে পারছে না, পেটে টিউমার। ছোট-বড় সমস্ত মাছের ফুলকায় তেল যাচ্ছে জড়িয়ে, ধিকিধিকি মৃত্যু।

পশ্চিমি সভ্যতা নৈতিকতা, কর্তব্য সমস্ত কিছুই পালন করে কপিবুক স্টাইলে। চিন্তা করেছে লজিক্যালি, সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেপে। কিন্তু এরপরেও তাদের বোধোদয় হয় বিলম্বে। অ্যালফি ব্যতিক্রম। জীবন বঁাচার ঢং দু’টি। প্রথমটি সংগ্রাম অন্যটি সমর্পণ। সংগ্রামের পথে স্রোতের বিপরীতে হেঁটে প্রত্যেককে তাক লাগিয়ে দেওয়া সম্ভব, এ-পথে মানুষ বড়ই অহংকারী। সমর্পণের পথে প্রত্যেকের মাঝে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়ায় অদ্ভুত প্রশান্তি।

মানুষ অবচেতনে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে ফেরে নিত্য। আলফ্রেড ডেট ওরফে অ্যালফি (১৯০৫-২০১৬) এখন নেই। ১০৯ বছরে মারা যান। তবে মৃত্যুর পরও অ্যালফি জাগিয়ে রাখতে পেরেছেন বোধের দীপশিখা। অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এখন এগিয়ে এসেছে পেঙ্গুইনদের সোয়েটার পরাতে।

(মতামত নিজস্ব)

পশ্চিমি সভ্যতা নৈতিকতা, কর্তব্য সমস্ত কিছুই পালন করে কপিবুক স্টাইলে। চিন্তা করেছে লজিক্যালি, সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেপে। কিন্তু এরপরেও তাদের বোধোদয় হয় বিলম্বে। অ্যালফি ব্যতিক্রম।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement
toolbarHome ই পেপার toolbarup মহানগর toolbarvideo শোনো toolbarshorts রোববার