ভেনেজুয়েলায় যে-কাণ্ড ঘটিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন, তা আইন-বিরুদ্ধ। আন্তর্জাতিক সমাজ ব্যবস্থা না নিলে, দুর্দিন আসন্ন।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে ট্র্যাজেডি নতুন কিছু নয়, তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে সেই ট্র্যাজেডির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রহসন। ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রকাশ্য অবজ্ঞা ও নৈতিকতার মুখোশে আগ্রাসন– এই তিনের মিশ্রণে এখনকার বিশ্ব রাজনীতি আরও বিপজ্জনক। ২০০৩ সালে ইরাকে ভুয়ো গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাতে আগ্রাসন চালিয়ে ‘গণতন্ত্র রপ্তানি’-র যে-নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল, তার প্রতিফল বিশ্ব দেখেছে। অস্থির হয়েছে পশ্চিম এশিয়া। একনায়ক অপসারণের নামে একটি রাষ্ট্রকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা হয়েছিল, যার গর্ভ থেকেই জন্ম নেয় আইসিসের মতো বর্বর সন্ত্রাসী শক্তি।
পশ্চিম এশিয়ার সেই আগুন এখনও নেভেনি। সেই একই সাম্রাজ্যবাদী চিত্রনাট্য পরে উত্তর আফ্রিকায় প্রয়োগ করা হয়। ২০২৬ সালে দঁাড়িয়ে বিশ্ব আবার দেখছে তার এক নতুন, আরও বেপরোয়া পুনরাবৃত্তি– ভেনেজুয়েলায়। কূটনৈতিক চাপ, আলোচনা, বা বহুপাক্ষিক কাঠামোর পথ ছেড়ে ট্রাম্প প্রশাসন বেছে নিয়েছে বোমাবর্ষণ, নৌ অবরোধ এবং সরাসরি শক্তি প্রয়োগের পথ। ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে দেশছাড়া করা শুধু একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে আঘাত নয়, আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্র সংঘ সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের নির্লজ্জ অমর্যাদা। ক্যারিবিয়ান সাগরে তথাকথিত মাদকবিরোধী অভিযানের আড়ালে তেলবাহী জাহাজ আটকানো, সাধারণ নাবিক ও যাত্রীদের হত্যার অভিযোগ এবং নিরাপত্তা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে বিচারক ও কার্যনির্বাহকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া– আমেরিকা আবারও প্রমাণ করেছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম তাদের কাছে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য একটি কাগজ মাত্র।
এই হস্তক্ষেপের নেপথ্যের অঙ্ক মোটেই নতুন নয়। একদিকে, মনরো নীতির ভূতকে নতুন করে জাগিয়ে লাতিন আমেরিকাকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসার বাসনা, অন্যদিকে চিনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার তাগিদ। মাদুরো সরকারের পূর্বমুখী বিনিয়োগ ও তেল বাণিজ্য ওয়াশিংটনের চোখে ছিল অমার্জনীয় অপরাধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভেনেজুয়েলার বিপুল অপরিশোধিত তেলের ভাণ্ডারের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার কর্পোরেট লালসা।
মাদুরোর শাসন নিঃসন্দেহে কর্তৃত্ববাদী ছিল, কিন্তু ভেনেজুয়েলার ইউনাইটেড সোশালিস্ট পার্টি ও বলিভারীয় আন্দোলনের গভীর সামাজিক শিকড় রয়েছে এখনও। এই আন্দোলনের উত্থান হয়েছিল সেই দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে, যা মার্কিন সমর্থিত অভিজাত শাসন যুগের পর যুগ ধরে লালন করেছিল। ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন আসলে ট্রাম্পবাদের সেই বিচ্ছিন্নতাবাদী-সাম্রাজ্যবাদী মিশ্রণের স্বাভাবিক ও হিংস্র পরিণতি। আন্তর্জাতিক সমাজ যদি নীরব থাকে, তবে তারা এমন এক বিশ্বব্যবস্থাকে বৈধতা দেবে, যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ওয়াশিংটনের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
