shono
Advertisement
Secular

'সেকুলার', নতুন বছরে আমরা যেন এই শব্দের মর্যাদা রাখতে পারি

অপপ্রয়োগ বা অব্যবহারে যেন মলিন না হয় শব্দ।
Published By: Kishore GhoshPosted: 07:16 PM Jan 01, 2026Updated: 07:16 PM Jan 01, 2026

'সেকুলার'। নতুন বছরে আমরা যেন এই শব্দর ধার ও ভারকে গ্রহণ করতে পারি যথাযথভাবে। অপপ্রয়োগ বা অব্যবহারে যেন মলিন না হয়।

Advertisement

১৯০৫ সালের ৮ নভেম্বর। পূর্ববঙ্গের তৎকালীন মুখ্যসচিব পদমর্যাদায় আসীন আমলাপ্রবর পি. সি. লিয়ন বিজ্ঞপ্তি জারি করে বললেন- প্রকাশ্যে 'বন্দে মাতরম্' ধ্বনি তুললে, বা বঙ্কিম-বিরচিত গানটি গাইলেই পদক্ষেপ করা হবে। অর্থাৎ 'বন্দে মাতরম্'-কে কার্যত 'নিষেধ'-এর দায়রায় ফেলে দেওয়া হল। বলা বাহুল্য, স্বদেশি-করা যুবসমাজ এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ও 'বন্দে মাতরম্' গাইতে আরম্ভ করে নানা সভা ও মিছিলে। ১৯০৬ সালের এপ্রিলে বরিশালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল 'বেঙ্গল প্রভিনশিয়াল কংগ্রেস'-এর সম্মেলন। সেখানে কী কাণ্ড ঘটেছিল, তার তন্নিষ্ঠ বিবরণ পাওয়া যায় 'রাষ্ট্রগুরু' সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবরণ থেকে।

যুবকেরা যে ফেরি বের করেছিল, সেখানে 'বন্দে মাতরম্' গাওয়া হয়। বুকে আঁটা ব্যাজটি ছিল 'বন্দে মাতরম্' খচিত। অর্থাৎ, ব্রিটিশ সরকারের বিজ্ঞপ্তি লঙ্ঘন করা হয় জেনেবুঝে। কিন্তু অন্যতর প্ররোচনা ছিল না। পুলিশ অবশ্য তাতে মজেনি। ভোলেনি। বিষয়টিকে লঘু চোখে দেখেওনি। নৃশংসের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মিছিলে। বেপরোয়াভাবে লাঠি চার্জ করা হয়। অনেকের মাথা ফাটে। আহত হয়ে কেউ কেউ মিছিল থেকে অবসৃত হলেও 'বন্দে মাতরম্' গেয়ে এহেন নিগ্রহের সামনে পড়তে হওয়ার জন্য স্বদেশিদের মধ্যে অসন্তুষ্টির চেয়ে আত্মতৃপ্তিই ছিল বেশি।

এই সিনেম্যাটিক দৃশ্যটি থেকে ক্রমে আমরা এখনকার দিনে যখন 'বন্দে মাতরম্' কেন্দ্রিক বিতর্কের মর্মমূলে এসে উপস্থিত হই- ধর্মের অতিরেক আমাদের পীড়িত করে। বিশেষ সম্প্রদায়ের কাছে এ গান সমাদৃত নয়। ধর্মাচরণ ও ধর্মারাধনার যুক্তিতে। আর, এ গানের রচয়িতার নামে ধ্বনিত হচ্ছে হিন্দুত্বপন্থী মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার একরোখা অভিযোগ। এরই মাঝে ঢুকে পড়েছে রবীন্দ্রনাথের নাম, যিনি প্রথমাবধি 'বন্দে মাতরম্' মুগ্ধ, অথচ পণ্ডিত নেহরু পরামর্শ চাইলে গানটির অবয়ব থেকে কিছু অংশ বর্জনের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, যাতে কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভাবাবেগ আহত না হয়। অন্যদিকে, রেজাউল করিমের মতো মানুষ স্পষ্টবাক্যে ঘোষণা করে দেন- 'বন্দে মাতরম্' নির্বাক প্রাণে ভাষা জোগায়, বীরু চিত্তকে সাহসী করে তোলে।

স্বদেশ ও সমাজ, ধর্ম ও সংগীতমূল্য, ব্রিটিশ রাজশক্তি বনাম আত্মপ্রতিষ্ঠার আকুতি- এমন নানা বৈপরীত্যে আক্রান্ত হয়ে 'বন্দে মাতরম্' আচ্ছন্ন হয়েছে ন্যারেটিভের লড়াইয়ে। এবং গোদা স্বরে এ গানের সমীপে এখন দাবি রাখা হচ্ছে 'সেকুলার' হতে পারা বা না-পারার উত্তরপত্রটি পেশ করা হোক। একটি অসম্ভব সুরময় ও শ্রুতিমধুর গানকে ঘিরে ঐতিহাসিক চর্চা হোক, আপত্তি নেই। কিন্তু গানটি 'সেকুলার' হতে পারল কি পারল না- এমন দড়ি টানাটানির জমিতে গিয়ে যে আমাদের দাঁড়াতে হল, হচ্ছে- এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কি হতে পারে?

অ-বনিবনার ঝাঁজ, ইতিহাস পেরিয়ে, ঢুকে পড়ছে ঘটমান বর্তমানের পরিধিতে। কণ্ঠশিল্পীকে 'সেকুলার' গান গাইতে মঞ্চে নিদান দেওয়া হচ্ছে। 'সেকুলার' শব্দটি কি এত ঠুনকো হয়ে গেল তবে? নতুন বছরে এ নিয়ে কি ভাবব না আমরা তলিয়ে?

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
  • যুবকেরা যে ফেরি বের করেছিল, সেখানে 'বন্দে মাতরম্' গাওয়া হয়।
  • অ-বনিবনার ঝাঁজ, ইতিহাস পেরিয়ে, ঢুকে পড়ছে ঘটমান বর্তমানের পরিধিতে।
Advertisement