‘উত্তম’ ইংরেজি লেখার দিন কি গিয়েছে? যেসব লেখা আগে ত্রুটিযুক্ত হয়েও মনুষ্য-গুণাগুণ ভূষিত ছিল, এখন সেসব লেখাই ত্রুটিমুক্ত রোবটিক। সৌজন্যে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’। ধার করা এহেন মেধার দাপটে মানুষের সৃজনধর্মিতার উঠোনে কি তবে মেঘ জমবে? মৌলিকতা মনুষ্য-আবেগবর্জিত উপস্থাপনায় ভাসবে? লিখছেন দেবাশিস পাঠক।
আরও একটি ইংরেজি বর্ষবরণ। এই উপলক্ষে, পার্টির হুল্লোড়ে ভাসতে ভাসতে, ফেনিল উচ্ছলতায় পাশ্চাত্য কেতা পালন করতে করতে, আপন অজ্ঞতা ও উন্নাসিকতার কাছে নতজানু হয়ে জানতে ইচ্ছে করছে– ‘উত্তম’ ইংরেজি জানার আর কি সত্যিই কোনও দরকার আছে? বাবা-দাদুর কাছে ইংরেজি ব্যাকরণের জামাই ঠকানো প্রশ্নের মুখে পড়ে কৈশোরে বহুবার নাস্তানাবুদ হয়েছি। ‘দ্য স্টেটসম্যান’ কাগজের সম্পাদকীয় স্তম্ভ পড়ে, অভিধান হাতড়ে তার অর্থ অনুধাবনের সুবাদে, ইংরেজি ক্লাসে মাস্টারমশাইদের দ্বারা প্রশংসিত ও সেই সুবাদে সহপাঠীদের একাংশের কাছে বিশেষ গুরুত্বও পেয়েছি।
‘ভালো’ ইংরেজি লেখার মকশো করেছি প্রৌঢ়ত্বের চৌকাঠে দঁাড়িয়েও। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সবই নিরর্থক, অতীতের প্রলম্বিত অভ্যাসমাত্র। এখন সেসবের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। শশী থারুরের মতো ইংরেজি বলিয়ে-লিখিয়ে হাততালি পান, পাঠক বা শ্রোতার মন ছুঁতে পারেন না। দুর্বোধ্যতার কারণে বক্তব্য উপেক্ষিতই হয়। আর, সঠিক ব্যাকরণ-সহ শুদ্ধ ইংরেজি সাজিয়ে-গুছিয়ে লেখ্য পরিবেশনার জন্য তন্নিষ্ঠ সম্পাদকের কর্মদক্ষতাও এখন প্রায় অনাবশ্যক।
কিছু দিন আগে পর্যন্তও সম্পাদনার কাজে, ছাত্রপাঠ্য বইয়ের প্রকাশনা সংস্থায়, আলাদা রকমের মজা, অন্য ধরনের গুরুত্ব ছিল। মজাটা যিনি সম্পাদনা করছেন তঁার নিজস্ব, আর গুরুত্বটা সংস্থায় কর্মরত অন্য কর্মীদের চোখে। অগোছালো, পরস্পরের মধ্যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু অনুচ্ছেদ সংবলিত একটি লেখা, ঘষেমেজে, ভেবে ভেবে চয়ন করা শব্দ দিয়ে সাজিয়ে, একটি ছাত্রবোধ্য লেখায় পরিণত করার পরে আত্মতৃপ্তির রেশ থেকে যেত বেশ কয়েক ঘণ্টা। সৃজনের রোমাঞ্চ টের পাওয়া যেত অন্যের কাজ সম্পাদনার মধ্যেও। সম্পাদকদের কথা বাদ দিলাম, প্রুফরিডাররাও কোনও একটি লেখা কাটাছেঁড়ার মধ্যে সৃজনাত্মক
মৌতাত উপভোগ করতেন, যেটি কেবল ‘ভুল’ বানান ঠিক করা, আর সঠিক ছেদ-যতি চিহ্ন প্রয়োগের মতো রেশনের চালে কঁাকড় বাছার প্রাত্যহিকতায় সীমায়িত ছিল না।
কিন্তু হায়! সেসব উধাও এখন। কৃত্রিম মেধার সৌজন্যে সেসবের দিন গিয়েছে। কিছু দিন আগেও যাদের লেখা ত্রুটিযুক্ত হয়েও মনুষ্যগুণাগুণ ভূষিত ছিল, তাদের লেখা-ই এখন ত্রুটিমুক্ত রোবটিক। কম-বেশি একই বিষয়ে প্রত্যেকের লেখা প্রায় একই ধঁাচের, একইরকমভাবে নির্ভুল। ব্যাকরণগত শুদ্ধতা প্রশ্নাতীত। সবই শুনতে, পড়তে প্রায় অভিন্ন।
‘এম ড্যাশ’ বা ‘লম্বা ড্যাশ’ বিরাম চিহ্ন রূপে সেকেলে হয়ে পড়েছে। এটা এরকম হবে, ওরকম হবে না, এসব বিধিতে নিজস্বতার ছাপ উধাও। ইংরেজিতে একটি গোটা বাক্যও সঠিকভাবে লিখতে অসমর্থ ব্যক্তি এখন কৃত্রিম মেধার কল্যাণে ‘চ্যাটজিপিটি’ ব্যবহার করে নিজের বাংলা-ভাবনাকে ইংরেজিতে অনূদিত করে ইমেল পাঠাচ্ছে নির্ভুল ইংরেজি ভাষায়।
‘কৃত্রিম মেধা’ নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থা ‘গ্রাফাইট’। তাদের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের শেষপাদ থেকে মনুষ্যসৃষ্ট মৌলিক রচনার সংখ্যাকে ছাপিয়ে গিয়েছে কৃত্রিম মেধা ব্যবহার করে প্রণীত রচনা। সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট হোক বা পাকিস্তানি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন– সর্বত্র এই কৃত্রিম মেধানির্ভরতা ও তজ্জনিত কার্যবিপত্তির সংখ্যা স্পষ্টতই ক্রমবর্ধমান। গুণমানের সঙ্গে আপস করে, ব্যাপক হারে উৎপাদন যেমন পুঁজিবাদের প্রশ্রয়ে উৎপাদন শৃঙ্খলে বিশিষ্টতাকে লঘু বা গৌণ করে ছেড়েছে– এক্ষেত্রেও সেই একই লক্ষণ প্রকট।
হালে বাংলা সংবাদপত্রে ‘এআই’-এর অনাবশ্যক প্রয়োগ কীরকম ভাষাদূষণ ঘটাচ্ছে, তাও নজরে পড়ল। বহুলপ্রচারিত একটি বাংলা দৈনিকের ষষ্ঠ পাতায় ‘২৪ কোচের এক্সপ্রেসের জন্য হাওড়া প্ল্যাটফর্মের দৈর্ঘ্য বাড়ছে’ শীর্ষক সংবাদে লেখা হয়েছে– ‘যাত্রী পরিবহণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রধান শহরগুলিতে ট্রেন যাত্রা-উৎপত্তি ক্ষমতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে বৃহৎ পরিকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ভারতীয় রেল।... রেল কর্তৃপক্ষের মতে, এই সমস্ত কাজ সম্পন্ন হলে হাওড়া স্টেশনে ট্রেন গ্রহণ ও ছাড়ার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে...।’ পুনঃপুনঃ পাঠেও বুঝতে পারলাম না,
‘ট্রেন যাত্রা-উৎপত্তি ক্ষমতা’ কী কিংবা স্টেশনের ‘ট্রেন গ্রহণ ও ছাড়ার ক্ষমতা’– কী বস্তু। তবে এটুকু বুঝলাম, এআইয়ের ব্যবহার ব্যতীত এরকম শব্দবন্ধ উৎপাদনের ক্ষমতা অন্য কিছুর হতে পারে না। এবং কৃত্রিম মেধার এরকম প্রয়োগে পাঠক আরও সংবাদপত্র-বিমুখ হয়ে উঠতে বাধ্য। পঠিত খবরের বক্তব্য যদি স্রেফ ভাষা প্রয়োগের অপারঙ্গমতায় দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে, তবে অমন খবর পড়ে লাভ কী!
কিছু দিন আগেও ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ প্রয়োগ করে কোনও কিছু লেখা হয়েছে বুঝতে পারলে বিবমিষা জাগত। পড়া বন্ধ করে দিতাম। মনে হত, লেখক এরকম ছাইভস্ম না-লিখলে কী ক্ষতি হত! কিন্তু ২০২৪ সালের ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এর প্রতিবেদন যখন জানাচ্ছে যে, এখন কৃত্রিম মেধাজাত কবিতার থেকে মানুষ-কবির মন থেকে নিঃসরিত কবিতার পার্থক্য করা ক্রমশ দুরূহতর হয়ে উঠছে, তখন টের পাচ্ছি, ওরকম ভাবা বা করা ভুল ছিল।
বুঝতে পাচ্ছি ও ভয় পাচ্ছি, অচিরেই কৃত্রিম মেধার দাপটে মানুষের সৃজনধর্মিতার উঠোনেও মেঘ জমবে, মৌলিকতা মনুষ্য আবেগবর্জিত উপস্থাপনায় ভাসবে। সাহিত্যধর্মিতা, শৈল্পিক উচ্চারণ– ক্রমশ সাধারণ ইংরেজি লেখায় গতযৌবনা নটী হয়ে বর্জিত হবে। এআইয়ের রূপটানে কৃত্রিম সৌন্দর্যের বিধিবদ্ধ ছটায় আমোদিত হওয়া হয়ে দঁাড়াবে সৃজনধর্মিতার অন্তিম পরিণতি!
এতটা ভাবা ও লেখার পরে, উপসংহৃতি সন্ধিতে পৌঁছে আরও একটি কথা মনে হল। আমরা তো সব লেখা, বিশেষত ইংরেজিতে লেখা, সম্পাদিত ও পরিমার্জিত হয়ে প্রকাশিত হবে– এই আশায় লিখি না। কিছু কিছু লেখা তো নিজের আকুতিতে ফেসবুকে বা রেডিটে পোস্ট করি। সেগুলোতেও কি এখন কৃত্রিম মেধার ব্যবহার জরুরি ও অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ছে?
(মতামত নিজস্ব)
