shono
Advertisement
Jyotirmoy Dutta

জ্যোতির্ময় দত্ত, মানবচরিত বা স্পর্ধিত খেলা

এক্সপার্টরা একা-ই আসেন, একা-ই চলে যান; কারও তোয়াক্কা না করে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 09:34 PM Jan 03, 2026Updated: 09:34 PM Jan 03, 2026

জ্যোতির্ময় দত্ত ওরফে জে. ডি আমাকে চিনতেন না, তবে আমি জে. ডি-কে চিনেছি সর্বৈবভাবে। উনিশ শতকের বাংলার তথাকথিত নবজাগরণের বিষয়ে কোটি কোটি শব্দ পড়ে হাঁপিয়ে উঠে হঠাৎই একদিন পড়েছিলাম– ‘শ্লেষ’। ওই ঘাটেই আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা রয়েছি তারপর থেকে। লিখছেন রূপক বর্ধন রায় 

Advertisement

এক্সপার্টরা একা-ই আসেন, একা-ই চলে যান; কারও তোয়াক্কা না করে। চোখে জিন-বাঁধা অনুশীলনের মাধ্যমে একা একা তৈরি হন। আমাদের যা দেওয়ার চুপচাপ দিয়ে একা একা কেটে পড়েন। তাই তাঁদের থাকা-না-থাকা, চলে যাওয়া, এবং সমগ্র জীবনের পরের সময়টায়, আমাদের মতো অর্ধশিক্ষিত যা কুড়িয়ে-কাচিয়ে নিতে পারার, নিয়ে নিই। যাঁরা তা দরকার মনে করেন না তাঁদের কথা এখানে জরুরি নয়, ইতিহাসের কোথাও কখনওই জরুরি নয়, কারণ আমাদের আসল ইতিহাস জে. ডি এবং তাঁর মতো হাতেগোনা এক্সপার্ট-ই লিখে লুকিয়ে রেখে যান। সবকিছু সবার হাতে না পড়াই ভালো। জে. ডি পড়তে বসলে তাই আমার নিজেকে ইন্ডিয়ানা জোন্‌স মনে হয়।

জে. ডি অর্থাৎ জে্যাতির্ময় দত্ত। উনিশ শতকের বাংলার তথাকথিত নবজাগরণের বিষয়ে কোটি কোটি শব্দ পড়ে হঁাপিয়ে উঠে হঠাৎই একদিন পড়েছিলাম– ‘শ্লেষ’। “... সাহিত্যের বিকাশেরও খুব এক সরল বিধান এতে দেয়া আছে। কোন মন্ত্রবলে একটি মৃত, মধ্যযুগীয়, অপাঠ্য সাহিত্যের লাশে প্রাণ ফিরিয়ে আনা যায়? কেন, তার কানের কাছে মিল্টন আর ওয়ল্টর স্কট আর মেকলের বুলি আউড়ে। এই বিধান, স্পষ্টতই, আকাদেমিওয়ালাদের খুব মনোমত। কোটি-কোটি টাকা খরচ ক’রে, রাশি-রাশি অনুবাদ ক’রে, দেশ-বিদেশের শ্রেষ্ঠ চিন্তার বন্যায় ভাসিয়ে দাও উৎকল, অন্ধ্র, তামিলনাদ, রাজস্থান। দেখবে, মুহূর্ত মধ্যে কেমন সনেট, নাটক, ওড, অমিত্রাক্ষর ছন্দে ভেসে যাবে দেশটা!... কিন্তু এই বিধানেই সংশয়ের উৎপত্তি হয়।...”

এই একই লেখায় অজিতকুমার মিত্র বললেন, ‘...যে-কোনো প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর মতো, তঁার সমালোচনার প্রধান লক্ষ্য তঁার নিজের সম্প্রদায়।’ এবং সবশেষে ‘...পঞ্চদশ থেকে বিশ পর্যন্ত অন্য যে-কোনো শতকের প্রথম পঁাচ দশকের তুলনায়, কালজয়ী সাহিত্যসৃষ্টির বিচারে, উনিশ শতক নিষ্ফল।... হাই তুলতে-তুলতেই অর্ধেক শতাব্দী কেটে গেলো।’ এই অজিতকুমারই শিখিয়েছেন, ঋত্বিক কুমার ঘটক আসলে রামপ্রসাদের কথাই বলতে চেয়েছিলেন।

‘কলকাতা’ পত্রিকার সংখ্যায় শিবনাথ বন্দ্যেপাধ্যায়ের ‘গোটা বছর ধরে তৈরি হওয়া’ প্রকাশিত হয়, যেখানে শিবনাথ লিখছেন, ‘আমি আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়েছি। কেন হয়েছি তার কারণ প্রকাশ করলে সকলেই অবিশ্বাস করবেন। এবং সেজন্যেই কারণটা সবিস্তারে বলা সম্ভব।...আমার অভিপ্রায় আমার মৃত্যুকে... নিতান্ত অকারণ প্রতিপন্ন করা।” (মার্চ ১৯৬৬)
প্রায় খান চারেকবার পড়ার পরে আমি বুঝতে পারি– সেই সুইসাইড নোটের অসংলগ্ন প্রসঙ্গগুলোকে যে জালে গেঁথে বঁাচিয়ে তুলেছেন শিবনাথ, তার নাম– বাংলা গদ্য সংস্কৃতি;
আরও মজার ব্যাপার, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের ইতিহাসও সেই সংস্কৃতির আন্তরিক অঙ্গ
উঠেছিল সে-লেখায়।

তেমন এক উত্তরণই বোধহয় চেয়েছিলেন তিনি। শিবনাথ এই বলে লেখাটা শেষ করছেন, ‘আমি কেন ঐখানে থেমে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম বুদ্ধিমান পাঠক নিশ্চয় অনুমান করতে পেরেছেন। আত্মহত্যার চেয়েও অকারণ, আত্মহত্যার চেয়েও কঠিন, এক কার্য সম্ভব, এই শ্বাসরোধী কথা মনে উদয় হওয়ার পর থেকে আমি অস্থির বোধ করছি।... কাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি? আমার চেয়েও বেশি?... আমাকে এখন থেকে প্রত্যেকটি মুখ খুব মনোযোগ সহকারে দেখতে হবে।’

রবীন্দ্রনাথের পর, রাজশেখরের পর, ডায়ালেকটিক্স আবার নতুন করে ধরা দিয়েছিল অত্যাধুনিক বাংলা গদ্যে। আমার মনে হয়, কেউ কখনওই যাতে খুঁজে না পান, অথবা যঁারা সত্যিই জীবন বাজি রেখে আধুনিক বাংলা গদ্যের এক্সপার্টাইজ আয়ত্তে আনতে চান, তঁারা ছাড়া যাতে কেউই খুঁজে না পান– সেটা পাকাপোক্ত করতেই জে. ডি এই রাস্তাগুলো নিয়েছিলেন।

জে. ডি আমাকে চিনতেন না, তবে বুক বাজিয়ে বলতে চাই আমি জে. ডি-কে চিনেছি সর্বৈবভাবে। বেলে, মেখে, চিবিয়ে, খেয়ে ফেলেছি। বাকি জীবন হজম করায় কেটে যাবে। রাজশেখর বসুর পর বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে আমার জে. ডি-কে রোজ প্রয়োজন পড়ে। ঠিক যেমন প্রাগ শহরের লোকসাহিত্য বাংলা ভাষায় আনতে গিয়ে ‘টুনটুনির বই-এর একটি রহস্য’ লেখাটার বারবার প্রয়োজন পড়েছিল, তেমনই।

বাংলা গদ্যের এক্সপার্টাইজের একাধিক রাস্তা খুলে যাক, শিবনাথ, অজিতকুমার, জ্যোতির্ময়– প্রত্যেকেই তেমনটা চাইতেন। যঁার, যখন, যঁাকে প্রয়োজন তিনি তঁার মতো করে শিবনাথের সেই জাল থেকে প্রয়োজনমতো মাছটা তুলে নেবেন। দ্বন্দভিত্তিক গদ্যপ্রবাহের মূলে সেই যে জালটা, ওটাতেই আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছেন জে. ডি।

জে. ডি চলে গেলেন; আবার বাংলা কবিতা, সাংবাদিকতা, মানবিকতার সঙ্গেই আধুনিক বাংলা গদ্যের ডায়ালেক্টিক্সের ইতিহাসে জে. ডি থেকেও গেলেন। যঁার খোঁজার, তিনি খুঁজে নেবেন, যঁার পাওয়ার তিনি ঠিক পেয়ে যাবেন।

আমরা যেন না-ভুলে যাই
ঐ যে যেখানে ক্রমাগত
মাটি পরিণত হচ্ছে গাছে
কিংবা পাখির রেখাহীন উড্ডয়ন
আকাশের নিষ্কলঙ্ক গর্ভে
টোল ফেলছে
সেখানে কোথাও এক কি দুই নেই
সেখানে গণনা
একটি মানবরচিত
স্পর্ধিত
খেলা
(৪, জে. ডি)

গুরুদেব, সেলাম ও বিদায়।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
rupakbroy1@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
  • এই একই লেখায় অজিতকুমার মিত্র বললেন, ‘...যে-কোনো প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর মতো, তঁার সমালোচনার প্রধান লক্ষ্য তঁার নিজের সম্প্রদায়।’
  • রবীন্দ্রনাথের পর, রাজশেখরের পর, ডায়ালেকটিক্স আবার নতুন করে ধরা দিয়েছিল অত্যাধুনিক বাংলা গদ্যে।
Advertisement
toolbarHome ই পেপার toolbarup মহানগর toolbarvideo শোনো toolbarshorts রোববার