মধ্যপ্রদেশ সরকার ‘ভ্রূণের মনকে শিক্ষিত করার’ জন্য সরকারি হাসপাতালে ‘গর্ভ সংস্কার কক্ষ’ তৈরির পরিকল্পনা করেছে। অবাক কাণ্ড!
ভারতে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে কি ঘুরিয়ে লড়াই শুরু করেছে এক শ্রেণির শাসক? প্রসঙ্গত– কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সত্যপাল সিং সম্প্রতি ডারউইনের বিবর্তনবাদকে ‘অবৈজ্ঞানিক’ বলে ঘোষণা করেছেন। বিজেপির আর-একজন নেতা, রাজস্থানের শিক্ষামন্ত্রী বাসুদেব দেবননী, দাবি করে বসেছেন, গরুই একমাত্র প্রাণী, যে-শ্বাসের সঙ্গে একই সঙ্গে অক্সিজেন গ্রহণ ও বর্জন করে! বিজেপি সাংসদ গণেশ সিংয়ের আবার দাবি, নিয়মিত সংস্কৃতে কথা বললে স্নায়ুতন্ত্র শক্তিশালী হয়! নিয়ন্ত্রণে থাকে ডায়াবিটিস ও কোলেস্টোরলের সমস্যা। এছাড়া গরুর দুধে সোনা, গোমূত্র সেবনের উপকারিতা নিয়ে নানা বাগাড়ম্বর তো ছিলই।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু মনে করতেন, ধর্মীয় ভাবধারা যেভাবে অসহিষ্ণুতা, কুসংস্কার ও আবেগাশ্রিত ভাবনার বিস্তার ঘটায়, বৈজ্ঞানিক ভাবধারা তা করে না। মুক্ত মানবের চিন্তার জগৎ বৈজ্ঞানিক ভাবধারাকে গ্রহণ করে। ‘বিজ্ঞানভিত্তিক মনন, মানবিকতা এবং অনুসন্ধান ও সংস্কার’-এর উন্নয়ন ঘটানো প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য, একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু ভারত নামে রাষ্ট্র বর্তমানে সেই কর্তব্য পালনে পরাঙ্মুখ।
এই ঘরগুলি অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে প্রসবপূর্ব যত্নের মাধ্যমে পরিচালিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। লক্ষ্য– অজাত শিশুর মন গঠন করা। কিন্তু তা কতটা বিজ্ঞানসম্মত?
এর মধ্যেই আরও এক ধাপ এগিয়ে মধ্যপ্রদেশ সরকার ‘ভ্রূণের মনকে শিক্ষিত করার’ জন্য সরকারি হাসপাতালে ‘গর্ভ সংস্কার কক্ষ’ তৈরির পরিকল্পনা করেছে। তাদের দাবি, অন্তঃসত্ত্বা মা যা শোনেন, গর্ভস্থ শিশু তা আত্মস্থ করে। অন্তত আমাদের পুরাণ-মহাকাব্যে তেমনই কথিত। যেমনটা রয়েছে মহাভারতে অভিমন্যুর আখ্যানে, চক্রব্যূহ ভেদের কৌশল শেখার গল্পে, অষ্টাবক্র মুনির কাহিনিতে। এই ঘরগুলি অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে প্রসবপূর্ব যত্নের মাধ্যমে পরিচালিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং জীবনযাত্রার শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক সুস্থতা পর্যন্ত নজরে রাখা হবে। লক্ষ্য– অজাত শিশুর মন গঠন করা। কিন্তু তা কতটা বিজ্ঞানসম্মত?
এটা সত্যি যে, গর্ভাবস্থায় ভ্রূণ কিছু বিষয় জানতে-বুঝতে পারে। যেমন শব্দ– মায়ের গলার, গর্ভাবস্থায় মায়ের আশপাশে যারা ছিল, তাদের কণ্ঠস্বরও তার পরিচিত মনে হয়। গর্ভে থাকার ৮ থেকে ১৫ সপ্তাহের মধ্যেই শিশুর স্বাদের তারতম্য বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়। মায়ের পেটে যে ফ্লুইডে শিশু ভেসে থাকে, তার গন্ধ হয় অনেকটাই মায়ের শরীরের গন্ধের মতো। তাই জন্মের পরে মায়ের গায়ের সেই গন্ধ সহজেই বুঝতে পারে সে। মায়ের কোলে নিরাপদ বোধ করে। এটা বিজ্ঞান। কিন্তু অভিমন্যুর উপাখ্যানকে আদর্শ করে যেভাবে গর্ভস্থ ভ্রূণের মনকে শিক্ষিত করার কথা মধ্যপ্রদেশ সরকার ভেবেছে, তা অপরিণামদর্শী। আমাদের পুরাণ-মহাকাব্যকে বিজ্ঞান বলে চালানোর এবং রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা সফল করার কৌশলমাত্র। বরং অপুষ্টি যেন গর্ভবতী মায়েদের গ্রাস না করে তা দেখা জরুরি।
