এ বছরের ‘কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজ’ বিজেতা ক্যারিবীয় অঞ্চলের জামির নাজির-সহ তিন আঞ্চলিক বিজয়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তঁারা নিজেদের গল্প লেখার ক্ষেত্রে ‘এআই’ ব্যবহার করেছেন। এরপর কি ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার মতো কবিতা, গল্প, উপন্যাসও লিখে ফেলবে? নাকি লেখার বুননে ‘এআই’ সহায়তা নেওয়াকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আত্মীকৃত করে নেবে সাহিত্য সমাজ? লিখছেন অংশুমান কর।
২০২৬ সালের ‘কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজ’-কে ঘিরে বিতর্কের ঝড়। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বিজয়ী জামির নাজির-সহ তিন আঞ্চলিক বিজয়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তঁারা নিজেদের গল্প লেখার ক্ষেত্রে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ ব্যবহার করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, সাহিত্যে তাহলে লেখকের ‘সিগনেচার’ আর কি থাকবে না? এরপর কি তবে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার মতো কবিতা, গল্প, উপন্যাসও লিখে ফেলবে?
পুরস্কারপ্রাপকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে যে-লেখকের বিরুদ্ধে সেই জামির নাজিরের ‘দ্য সারপেন্ট ইন দ্য গ্রোভ’ গল্পটি প্রকাশ পাওয়ার পরেই গল্পটিতে কিছু অর্থহীন উপমা আর একই ধরনের বাক্যগঠনের পুনরাবৃত্তি দেখে অনেকেই সন্দেহ করছিলেন, গল্পটি জামির নাজিরের লেখা কি না। এক সমালোচক দাবি করেন গল্পটিতে এআই ব্যবহারের স্পষ্ট লক্ষণ আছে, বিশেষত গল্পটিতে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে ‘not x, but y’ ধরনের বাক্যগঠন, যা এখন এআইয়ের বাক্যগঠনের এক পরিচিত বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। ‘প্যানগ্রাম’ নামে একটি ‘এআই ডিটেক্টর’-এর মাধ্যমে গল্পটি সত্যিই ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ দ্বারা লিখিত কি না তা পরীক্ষা করেন পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এথান মল্লিক। হাতেনাতে ফল পেয়ে তিনি লেখেন, ‘১০০% এআই-নির্মিত গল্প কমনওয়েলথ পুরস্কার জিতে নিল।’ গল্পটি আদৌ জামির নাজিরের লেখা কি না এই সন্দেহ করার আর-একটি প্রধান কারণ হল এই যে, জামির নাজিরের বয়স ৬১ এবং এ-যাবৎ তিনি খুব বেশি লেখালিখি করেননি। অনেকেরই তাই প্রশ্ন, তঁার পক্ষে হঠাৎ করে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার জেতার মতো গল্প লেখা কি আদৌ সম্ভব?
অভিযোগ উঠেছে যে, তঁারা নিজেদের গল্প লেখার ক্ষেত্রে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ ব্যবহার করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, সাহিত্যে তাহলে লেখকের ‘সিগনেচার’ আর কি থাকবে না?
এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে মুখ খুলেছে কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশন জানিয়েছে যে, শর্টলিস্টেড সব লেখকই দু’বার করে শপথ নিয়ে জানিয়েছিলেন, তঁাদের গল্পগুলি সম্পূর্ণভাবে নিজেদের মৌলিক রচনা। ফাউন্ডেশন অবশ্য এখন নিজেদের নির্বাচন প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করছে। তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে আরও কিছু দিন। তবে তারা ইতিমধ্যেই এটুকু জানিয়েছে যে, পুরস্কারের জন্য শর্টলিস্টেড গল্পগুলিকে কোনও ‘এআই চেকার টুল’ দিয়ে পরীক্ষা করেনি। ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর- জেনারেল রজমি ফারুক বলেছেন, অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি এআই-চেকারে পরীক্ষা করতে বাধ্য করা গোপনীয়তা ও কপিরাইট সংক্রান্ত গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই তাদের আপাতত লেখককেই বিশ্বাস করতে হবে।
কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজ পায় যে-গল্পগুলি সেই গল্পগুলি নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে ব্রিটিশ সাহিত্য পত্রিকা ‘গ্রান্টা’। পত্রিকাটি ‘ক্লদে’ নামের এক ‘এআই ডিটেক্টর’ দিয়ে নাজিরের গল্পটিকে পরীক্ষা করে। ক্লদে কিন্তু গল্পটি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি– তার মতে, গল্পটি পুরোপুরি মানবসৃষ্ট নয় বলে মনে হতে পারে, তবে তার মানেই যে গল্পটি সম্পূর্ণ এআই-নির্মিত, সেটিও বলা যাবে না। তাই চূড়ান্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত গ্রান্টা গল্পটিকে তাদের ওয়েবসাইটে রেখেই দিয়েছে। কিন্তু, গ্রান্টার প্রকাশক সিগ্রিড রাউজিং বলেছেন, ‘এটি সম্ভব যে, বিচারকেরা অজান্তেই এআই-চৌর্যবৃত্তিকে পুরস্কৃত করেছেন– আমরা এখনও নিশ্চিত নই, এবং হয়তো কোনও দিন নিশ্চিত হতেও পারব না।’
সত্যি সত্যিই একটি গল্প এআই দিয়ে লেখা হয়েছে কি না সে সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা বেশ কঠিন। দেখা গিয়েছে যে, এআই ডিটেক্টর চ্যাটবক্সগুলি হামেশাই সম্পূর্ণ ভুল ফলাফল জানাচ্ছে। মানবসৃষ্ট রচনাকে অবলীলায় চিহ্নিত করছে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ দ্বারা লিখিত বলে। অনেকেই বলছেন, প্যানগ্রামের মতো এআই ডিটেক্টরগুলি নিয়ে নতুন ব্যবসাও গড়ে উঠেছে। এবং এই ব্যবসাকে পুষ্ট করতেই অনেক সময় মানবসৃষ্ট রচনাকেও এআই দিয়ে লিখিত রচনা বলে সন্দেহ করানো হচ্ছে। এ-কথা ঠিক যে, এআই এবং ভাষা নিয়ে গবেষণা করছেন যঁারা, তঁারা ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন যে, এআই লিখিত ইংরেজি ভাষায় কতগুলি চিহ্ন ও উপাদান পুনঃপুনঃ ব্যবহার হতে থাকে। যেমন, ‘ডেলভ’ শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার, এম-ড্যাশের আধিক্য, কিংবা ‘কোয়ায়েটলি পাওয়ারফুল’ বা ‘ডিপলি ট্রান্সফর্মেটিভ’-এর মতো অস্পষ্ট, আবেগঘন বিশেষণের ব্যবহার। কিন্তু প্রশ্ন হল, পৃথিবীর এতগুলি ভাষার সবক’টির ক্ষেত্রেই কি এরকম নির্দিষ্ট কতগুলি লক্ষণ দেখে একটি রচনা লেখক ‘এআই’ ব্যবহার করে লিখেছেন কি না তা নির্ণয় করা সম্ভব? বাংলা ভাষাতেই কোনও রচনা এই আই দ্বারা লিখিত কি না সেটিই কি খুব স্পষ্ট করে বোঝা যায়? এআই-লিখিত বাংলা ভাষাতে এক ধরনের আড়ষ্টতা থাকে। কিন্তু সেইটুকুর উপর ভিত্তি করেই কি নির্দিষ্ট করে বলা যাবে যে, রচনাটি এআই-প্রসূত?
কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজ পায় যে-গল্পগুলি সেই গল্পগুলি নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে ব্রিটিশ সাহিত্য পত্রিকা ‘গ্রান্টা’। পত্রিকাটি ‘ক্লদে’ নামের এক ‘এআই ডিটেক্টর’ দিয়ে নাজিরের গল্পটিকে পরীক্ষা করে।
জাপান কিন্তু এদিক থেকে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে। ২০১৬ সালে জাপানে এআই-লিখিত একটি উপন্যাস একটি জাতীয় সাহিত্য পুরস্কারের প্রাথমিক বাছাই পর্ব অতিক্রম করেছিল। ‘দ্য ডে আ কম্পিউটার রাইটস আ নভেল’। ২০২৪ সালে বিখ্যাত ‘আকুতাগাওয়া পুরস্কার’ পাওয়ার পর লেখিকা রিয়ে কুদান জানিয়েছিলেন, তঁার উপন্যাস ‘টোকিও-তো ডোজো-তো’-র একটি অংশ লিখতে তিনি ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ ব্যবহার করেছিলেন। লক্ষণীয়, দু’টি ক্ষেত্রেই কিন্তু চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন করা হয়নি; উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে লুকতে চাওয়া হয়নি।
বাস্তবটা হল, জীবনের সবক্ষেত্রের মতোই সাহিত্য রচনাতেও এআইয়ের ব্যবহার আটকানো যাবে না। ইতিমধ্যেই এমন কিছু চ্যাটবক্স কাজ করতে শুরু করেছে যারা ‘এআই’-সৃষ্ট রচনাকে মানবসৃষ্ট রচনার রূপ দিতে সক্ষম। ‘এআই ডিটেক্টর’-ও আসলে যে এই লেখাগুলি মানুষের লেখা নয় তা চিহ্নিত করতে পারছে না। গবেষকরা অনেকেই মনে করছেন– এআই ডিটেক্টর, এআই মডেল, এবং লেখকদের অভিযোজনের মধ্যে নিরন্তর প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা চলতেই থাকবে। এই প্রতিযোগিতায় কে যে শেষমেশ জিতবে তা এখনই বলা মুশকিল।
সত্যি বলতে কী, প্লট খুঁজে পাওয়ার জন্য, আগে গবেষণাধর্মী উপন্যাস লেখার ফিল্ডওয়ার্ক করে যে-সমস্ত তথ্য কষ্ট করে জোগাড় করতে হত, সেগুলো কয়েক মিনিটে এআইয়ের মাধ্যমে জোগাড় করার জন্য যদি কোনও লেখক এআইয়ের ব্যবহার করেন তাহলে তঁাকে দোষ দেব কেন? শেক্সপিয়রের প্রায় কোনও নাটকের গল্পই তো তঁার নিজের নয়! তাহলে? একইভাবে, বাংলা প্রকাশনার জগতে সেভাবে না থাকলেও পৃথিবীর সমস্ত প্রকাশনার জগতেই এডিটর এবং কপি-এডিটর থাকেন। তঁারা লেখকের রচনার তথ্যগত বা বাক্যগঠনগত ভুল সংশোধন করতেই থাকেন। এই কাজগুলিও যদি এখন এআই করে, তাহলে তা কি দোষের?
বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই এখন গবেষণাপত্রে এআইয়ের ব্যবহার মেনে নিয়েছে। তারা শুধু চাইছে কীভাবে এবং কত শতাংশ এআইয়ের ব্যবহার হয়েছে তা নিয়ে নির্দিষ্ট করে ঘোষণা করুন গবেষকরা। একইভাবে লেখকরাও রচনায় এআই ব্যবহার করে থাকলে কীভাবে এবং কত শতাংশ ব্যবহার করেছেন তা জানান। এক্ষেত্রে ‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা/ যদি না পড়ো ধরা’ এই প্রবাদবাক্যটি তঁারা ভুলে গেলেই মঙ্গল।
(মতামত নিজস্ব)
