shono
Advertisement
BJP

বিজেপির বঙ্গ-জয় অপ্রত্যাশিত নয়

নতুন প্রশাসনের সামনের দিনগুলি অবশ্য ফুরফুরে নয়। অনেক চ্যালেঞ্জ। মানুষের প্রত্যাশাও অনেক।
Published By: Biswadip DeyPosted: 11:05 AM May 23, 2026Updated: 11:05 AM May 23, 2026

ভোট চলাকালীন দিন কুড়ি রাজ্যে ঘুরেছি। মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও রোষ দেখেছি। পাশাপাশি, নজর কেড়েছে অবাঙালি সমাজের অসম্ভব মোদি-মুগ্ধতা। মহিলা ও মুসলমান ভোটও জমাট বরফ হয়ে থাকেনি। নতুন প্রশাসনের সামনের দিনগুলি অবশ্য ফুরফুরে নয়। অনেক চ্যালেঞ্জ। মানুষের প্রত্যাশাও অনেক।

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন প্রকৃত অর্থে ‘তৃণমূল কংগ্রেস বনাম ভারত রাষ্ট্র’-এ পরিণত হয়েছিল কি না, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা কতটা বিতর্কিত, নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে প্রায় ১ কোটি ভোটার ছঁাটাই ও ট্রাইবুনালে বিচারাধীন ২৭ লাখের ভোটাধিকার হরণ সুপরিকল্পিত ছক ছিল কি না কিংবা সুপ্রিম কোর্টের আচরণ কতটা নিরপেক্ষ– এসব প্রশ্ন এখন অবান্তর। তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে রায় দিয়েছে, এটাই সত্যি। ভোটের প্যাটার্ন ও ফল তারই প্রমাণ। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা না-দেওয়া কিংবা তঁাদের জোর করে হারানো হয়েছে বলে বিবৃতিদান অর্থহীন হাহাকার। তঁাদের উচিত আত্মবিশ্লেষণে নিবিষ্ট হওয়া। প্রত্যাবর্তনকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষ কেন পরিবর্তন চাইছিল তা অনুধাবন করা। ঘুরে দঁাড়ানোর উপায়ের খোঁজ করা।

প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রায়শই বলতেন, যে উঠছে তাকে একটু ঠেলা দিলে আরও কিছুটা তোলা যায়। যে নামছে তাকে একটু ঠেলা মারলে খানিকটা নামানোও যায়। কিন্তু যে উঠছে তাকে নামানো কিংবা যে নামছে, তাকে ওঠানো কঠিন। তৃণমূল কংগ্রেস নামছিল। প্রতিপক্ষের ঠেলা তাকে অসম্মানজনক অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে এই যা।

ট্রাইবুনালে বিচারাধীন ২৭ লাখের ভোটাধিকার হরণ সুপরিকল্পিত ছক ছিল কি না কিংবা সুপ্রিম কোর্টের আচরণ কতটা নিরপেক্ষ– এসব প্রশ্ন এখন অবান্তর।

বিজেপির বঙ্গজয় সেই অর্থে অপ্রত্যাশিত ছিল না। ভোট চলাকালীন দিন কুড়ি রাজ্যে ঘুরেছি। মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও রোষ দেখেছি। পাশাপাশি নজর কেড়েছে অবাঙালি সমাজের অসম্ভব মোদি-মুগ্ধতা। এই বাস্তবতা তৃণমূল নেতারাও অনুধাবন করেছিলেন। কিন্তু ভেবেছিলেন, মহিলা ও মুসলমান ভোট তরিয়ে দেবে। তঁারা বিশ্বাস করেছিলেন, খুব খারাপ করলেও ১৫৫-১৬০ আসন আসবেই। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গ যে এভাবে পথে বসাবে তা তঁারা কল্পনা করেননি। তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, শিক্ষিত সুভদ্র বাঙালি ও অবাঙালি জনগোষ্ঠী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মহিলা ও মুসলমান ভোটও জমাট বরফ হয়ে থাকেনি। তৃণমূল নামছিলই। তাদের বাড়তি ঠেলা সব পক্ষই মেরেছে।

ভোট হল পঁাচ রাজ্যে। অপ্রত্যাশিত ফল একমাত্র তামিলনাড়ুতে। ছয় দশকের ট্র‍্যাডিশন ভেঙে দুই দ্রাবিড়ীয় দলকে সেখানে পথে বসিয়েছে এক অদ্রাবিড়ীয় শক্তি। দু’বছর আগে যে-দলের জন্ম, তারা এভাবে নেপো সেজে দই মেরে দেবে, কল্পনার অতীত ছিল। ঠিকঠাক সমীক্ষা করেছিলেন একজনই। ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’-র প্রদীপ গুপ্ত, যিনি স্যাম্পল কম হওয়ার দরুন পশ্চিমবঙ্গের বুথ ফেরত সমীক্ষার ফল জানাননি। প্রদীপই বলেছিলেন, জোসেফ বিজয়ের দল টিভিকে ৯৮-১২০টি আসন পাবে। হয়েছেও তা-ই। ১০৮টি আসনে গিয়ে টিভিকে থেমেছে।

বিজেপির বঙ্গজয় সেই অর্থে অপ্রত্যাশিত ছিল না। ভোট চলাকালীন দিন কুড়ি রাজ্যে ঘুরেছি। মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও রোষ দেখেছি।

কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, স্থানীয় দল ভিসিকে ও বামপন্থীদের সাহায্যে ১২০ জনের সমর্থন নিয়ে সরকার গড়ার দাবি জানান বিজয়। আস্থা ভোটের দিন এআইএডিএমকে ভেঙে ২৫ জন সমর্থন করেন। পালানিস্বামীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এআইএডিএমকে ছাড়েন ভেলুমনি, বিজয় ভাস্কর ও সম্মুগমেরা। বিজয়ের ঘাড়ের উপর ঝুলে থাকা খঁাড়া সরে গিয়েছে। ঘেঁটে গিয়েছে দ্রাবিড়ীয় সমাজ।

শুরু হয়েছে তামিল রাজনীতির নতুন অধ্যায়। জোসেফ বিজয় বা শুভেন্দু অধিকারীরা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মেনে ঠিকভাবে সরকার চালাতে পারবেন কি? প্রশ্নটি উঠছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কৃচ্ছ্রসাধনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। এক বছর সোনা কিনো না, অহেতুক গাড়ি হঁাকিয়ে অফিস-কাছারি যেও না, ওয়ার্ক ফ্রম হোম নীতি, অনলাইন ক্লাস ফের চালু করো, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবহার বাড়াও, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমাও, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং ও বিদেশযাত্রা ‘নৈব নৈব চ’ বলে যা যা তিনি শুনিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট, আগামী দিনগুলি মোটেই ফুরফুরে থাকবে না। পেট্রল-ডিজেল-গ্যাসের দাম বেড়েই চলেছে। মহার্ঘ হয়েছে দুধ, পাউরুটি, মাছ, মাংস, ডিম, সবজি। টাকার দাম হু হু করে কমছে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ে টান পড়েছে। কোষাগারের উপর চাপ বাড়ছে। ইরান যুদ্ধ না মিটলে, হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকলে আরও অপ্রিয় হওয়া ছাড়া সরকারের উপায় থাকবে না।

শুরু হয়েছে তামিল রাজনীতির নতুন অধ্যায়। জোসেফ বিজয় বা শুভেন্দু অধিকারীরা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মেনে ঠিকভাবে সরকার চালাতে পারবেন কি? 

বিজয়-শুভেন্দুরা প্রতিশ্রুতি পালন করছেন। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তঁাদের দুশ্চিন্তা বাড়বে। উত্তরাধিকার সূত্রে ঋণের যে-বিশাল গন্ধমাদন তঁাদের ঘাড়ে চেপেছে, তার ভার কমানো শিবেরও অসাধ্যি। কঠোর হলে, কৃচ্ছ্রসাধন করতে গেলে অপ্রিয় হতে হবে। আবার প্রতিশ্রুতি পালিত না হলে গদি রাখা দায়। অক্ষরে অক্ষরে প্রতিশ্রুতি পালনের অর্থ আরও ঋণের ভারে নু‌্যব্জ হওয়া। এটাই হালের ভারতীয় রাজনীতির ভবিতব্য।

তামিলনাড়ুর ঋণের বোঝা সবচেয়ে বেশি। মুখ্যমন্ত্রী হয়েই বিজয় বলেছেন, সরকারের ‘ভঁাড়ে মা ভবানী’। কোষাগার ঢং ঢং করছে। রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা! যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মানুষের মন জিতেছেন– যেমন: ৬০ বছরের কমবয়সি নারীদের মাসে ২৫০০ টাকা, বিনামূল্যে প্রতি পরিবারে বছর ৬টা করে রান্নার গ্যাস, মাসে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ফ্রি, গরিবদের মেয়ের বিয়েতে ৮ গ্রাম সোনা ও সিল্কের শাড়ি, সিনিয়র সিটিজেন ও ভিন্নভাবে সক্ষমদের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা পেনশন– স্রেফ এসব মেটাতে হলে চলতি আর্থিক বছরে লাগবে বাড়তি ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। পশ্চিমবঙ্গের ঋণের পরিমাণ চলতি আর্থিক বছরে সোয়া ৮ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান। এ রাজ্যের নাগরিকদের মাথাপিছু ঋণের বোঝা এখনই ৮০ হাজার টাকা। এই অবস্থায় জুন মাস থেকে রাজ্যের মা লক্ষ্মীদের ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’-এ দ্বিগুণ টাকা ঢুকবে। ৩০০০। সেই সঙ্গে বেকার ভাতা, বিনা ভাড়ায় সরকারি বাসে মহিলাদের ভ্রমণ এবং সরকারি কর্মী ও পেনশনারদের বকেয়া ‘ডিএ’ দিতে হলে বছরে লাগবে অতিরিক্ত দেড় লাখ কোটি! এর উপর সপ্তম বেতন কমিশন বোঝার উপর শাকের অঁাটি হয়ে দঁাড়ালে কোন ‌‘গৌরী সেন’ মুশকিল আসান হবেন? এ দেশে সবচেয়ে সহজ– প্রতিশ্রুতি দেওয়া। লাগামছাড়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটে জেতাও সহজ। সবচেয়ে কঠিন সেই প্রতিশ্রুতি পালন।

প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বারবার ‘রেউড়ি’ রাজনীতিকে তুলোধোনা করেছিলেন। প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করে বছরখানেক আগেও বলেছিলেন– অবিলম্বে এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে অর্থনীতি চৌপাট হয়ে যাবে। ঋণের ফঁাদে দেউলিয়া হতে হবে। ভাবা হয়েছিল, দেরিতে হলেও প্রধানমন্ত্রী ‘ডোল’-এর রাজনীতির বিপদ বুঝেছেন। পাইয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসার দৃঢ়তা দেখাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তব কি তা বলছে?

এবারই বা কী হবে? গণমাধ্যমে একটি ছবি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা হয়, প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বহরের সংখ্যা নাকি মাত্র দু’টিতে নেমে এসেছে! অথচ প্রত্যেকে জানে– একটি পাইলট কার, অ্যাম্বুল্যান্স, জ্যামার, প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী একই মডেলের একই রঙের দু’টি গাড়ি (যাতে বোঝা না যায় কোনটিতে তিনি আছেন) এবং নিরাপত্তারক্ষী বহনকারী অন্তত একটি গাড়ি, কম করে ছ’টি গাড়ি ছাড়া প্রধানমন্ত্রী রাস্তায় বেরতে পারেন না।

কৃচ্ছ্রসাধনের দৃষ্টান্ত এ-দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা বারবার রেখেছেন। ১৯৬৫-র যুদ্ধের সময় খাদ্য সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী ১০, জনপথের বাসভবনের প্রশস্ত বাগানে ফুলের বদলে শস্য চাষ করেছিলেন। স্রেফ ছবি তোলার জন্য প্রতীকী না-করে বরেণ্য নেতারা কৃচ্ছ্রসাধনে আন্তরিক হলে সমাজও অনুপ্রাণিত হয়। খদ্দর এভাবেই সর্বজনীন হয়েছিল।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement