shono
Advertisement
PM Modi

জগৎসভায় প্রশ্নবিদ্ধ, নরওয়ের সাংবাদিকের মুখোমুখি মোদি

নরওয়ের এক সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান– কেন তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কঠিন বা বিতর্কিত প্রশ্নের উত্তর দেন না। ভারতের ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’-এ (২০২৬) ১৫৭তম স্থানে থাকার বিষয়টি তুলে ধরে ওই সাংবাদিক কিউবা (১৬০), প্যালেস্তাইনের (১৫৬) মতো দেশের সঙ্গে ভারতের তুলনা করেন। ভারত কিন্তু কড়া কূটনৈতিক জবাব দিয়েছে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 03:28 PM May 21, 2026Updated: 04:11 PM May 21, 2026

​সম্প্রতি, নরওয়েতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের সময় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নরওয়েজিয়ান সাংবাদিক হেলি লিং ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে কিছু প্রশ্ন করেন, এবং পরক্ষণেই ভারতীয় কূটনীতিকরা তার জোরালো জবাব দেন। এই ঘটনাটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক বিতর্ক নয়, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের পরিবর্তিত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একচোখা দৃষ্টিভঙ্গির গভীর মনস্তত্ত্বকে সামনে এনেছে। এই পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বর্তমান বিশ্বে ‘প্রেস ফ্রিডম’ কীভাবে অনেক সময়ে একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাকে আঘাত করার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, আর ভারতই বা কীভাবে তার শক্ত কূটনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে সেই আখ্যানকে খণ্ডন করছে।

Advertisement

ঘটনার সূত্রপাত, যখন নরওয়ের ওই সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, কেন তিনি সরাসরি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কঠিন বা বিতর্কিত প্রশ্নের উত্তর দেন না। তিনি ভারতের ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’-এ (২০২৬) ১৫৭তম স্থানে থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন একে কিউবা (১৬০) ও প্যালেস্তাইনের (১৫৬) মতো দেশের সঙ্গে ভারতের তুলনা করেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তা ভাইরাল হয়, এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর ঢেউ আছড়ে পড়ে। ‘বিরোধী’ দলগুলি এই ঘটনাকে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার প্রমাণ হিসাবে লুফে নেয়। কিন্তু এই ঘটনার আসল নাটকীয়তা শুরু হয়, যখন ভারত সরকারের তরফ থেকে পরদিনই একটি বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয় এবং সেই সাংবাদিককে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

ভারতীয় কূটনীতিক সি. বি. জর্জ সেই সংবাদ সম্মেলনে যেসব উত্তর দিয়েছিলেন, তা কোনও রক্ষণাত্মক আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল না, বরং তা ছিল ভারতের হাজার বছরের সভ্যতা এবং বর্তমান বৈশ্বিক অবদানের এক দৃঢ় খতিয়ান।

সেখানে ভারতের অভিজ্ঞ কূটনীতিক এবং রাষ্ট্রদূত সি. বি. জর্জ যেভাবে প্রশ্নগুলির মুখোমুখি হন, তা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের এক নতুন, আত্মবিশ্বাসী এবং আপসহীন রূপকে প্রকাশ করে। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, যে সাংবাদিক মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করার অভিযোগ তুলছিলেন, তিনি নিজেই ভারতীয় কূটনীতিকের সম্পূর্ণ জবাব শোনার ধৈর্য দেখাননি, এবং মাঝপথেই তিনি ‘ব্রিফিং’ ছেড়ে চলে যান। এর অজুহাত হিসাবে পরে তিনি বলেন যে, তিনি ‘জল খেতে’ গিয়েছিলেন। এ আচরণই প্রমাণ করে যে, এটি কোনও গঠনমূলক সাংবাদিকতা বা তথ্য জানার আগ্রহ ছিল না; এটি ছিল এক ধরনের পূর্বপরিকল্পিত ‘অ্যাক্টিভিজ্‌ম’ বা প্রচারণামূলক কৌশল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্লোবাল স্টেজে ভারতকে খাটো করা।

ভারতীয় কূটনীতিক সি. বি. জর্জ সেই সংবাদ সম্মেলনে যেসব উত্তর দিয়েছিলেন, তা কোনও রক্ষণাত্মক আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল না, বরং তা ছিল ভারতের হাজার বছরের সভ্যতা এবং বর্তমান বৈশ্বিক অবদানের এক দৃঢ় খতিয়ান। সাংবাদিকের প্রশ্ন ‘নরওয়ে কেন ভারতকে বিশ্বাস করবে?’-এর জবাবে ভারত যেসব যুক্তি তুলে ধরেছে, তা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, ভারত কোনও কৃত্রিম বা ঔপনিবেশিক সীমানায় তৈরি হওয়া নতুন রাষ্ট্র নয়, এটি ৫ হাজার বছরের পুরনো এক জীবন্ত সভ্যতা, যা বিশ্বের দরবারে শান্তি, বহুত্ববাদ এবং সহনশীলতার বার্তা দিয়ে এসেছে। দ্বিতীয়ত, ১৪০ কোটি মানুষের এই দেশে প্রতি ৫ বছর পরপর যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তা বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক মহোৎসব এবং ভোটের মাধ্যমে এই শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরই প্রমাণ করে যে, ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তি কতটা মজবুত। তৃতীয়ত, ‘কোভিড ১৯’ অতিমারীর সময় যখন উন্নত বিশ্ব নিজেদের ভ্যাকসিন মজুত করতে ব্যস্ত ছিল, তখন ভারত ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’-র অধীনে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে জীবনরক্ষাকারী টিকা পৌঁছে দিয়েছে, যা সংকটের সময়ে ভারতের বিশ্বস্ততার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। চতুর্থত,
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যখন রাশিয়া এবং আমেরিকা-সহ পশ্চিমা বিশ্ব সম্পূর্ণ বিভক্ত, তখন ভারতে অনুষ্ঠিত জি২০ সম্মেলনে সব পক্ষকে এক টেবিলে এনে একটি যৌথ ঘোষণা পাস করানো সম্ভব হয়েছিল, যা ভারতের সফল এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির এক অনন্য নজির।

এই বিতর্কের আর-একটি দুঃখজনক দিক হল– ভারতের অভ্যন্তরীণ পলিটিক্স, কারণ দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোনও অন্যায্য আক্রমণের শিকার হন, তখন দেশের ভিতরের একটি রাজনৈতিক অংশ যদি তাতে আনন্দিত হয়, তবে তা দেশের সার্বিক ভাবমূর্তির জন্যই ক্ষতিকর।

পশ্চিমি এনজিও বা সংস্থাসমূহ কর্তৃক তৈরি করা ‘প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’ বা এই জাতীয় সূচকগুলি কতখানি পক্ষপাতদুষ্ট, তা এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হয়েছে। ভারতে শত শত ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন সরকারের তীব্র সমালোচনা থেকে শুরু করে সব ধরনের বিতর্ক লাইভ সম্প্রচারিত হয়; অথচ, সূচকে ভারতকে এমন সব দেশের নিচে রাখা হয়, যেখানে নামমাত্র গণতন্ত্র, বা গণমাধ্যমের অস্তিত্বই নেই। আসলে, পশ্চিমি গণমাধ্যমের একটি বড় অংশের মধ্যে এখনও একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক মানসিকতা কাজ করে, যার ফলে তারা ভারতকে এখনও একটি অনুন্নত, সমস্যাগ্রস্ত দেশ হিসাবে দেখতে অভ্যস্ত। যখন সেই ভারত মহাকাশ বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং কূটনীতিতে পরাশক্তিদের সমকক্ষ হয়ে ওঠে, তখন তারা এই ধরনের ‘কৃত্রিম সূচক’ বা মানবাধিকারের তকমা ব্যবহার করে ভারতকে মানসিক চাপে রাখার চেষ্টা করে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হল, নরওয়ের নিজস্ব প্রধানমন্ত্রী যখন ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান, তখন কিন্তু এই তথাকথিত ‘মুক্তমনা’ সাংবাদিকদের কোনও ক্ষোভ বা প্রশ্ন দেখা যায় না, যা পরিষ্কারভাবে তাদের দ্বিমুখী নীতি ও নির্দিষ্ট অ্যাজেন্ডাকেই প্রকাশ করে।

এই বিতর্কের আর-একটি দুঃখজনক দিক হল– ভারতের অভ্যন্তরীণ পলিটিক্স, কারণ দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোনও অন্যায্য আক্রমণের শিকার হন, তখন দেশের ভিতরের একটি রাজনৈতিক অংশ যদি তাতে আনন্দিত হয়, তবে তা দেশের সার্বিক ভাবমূর্তির জন্যই ক্ষতিকর। রাজনীতিতে মতাদর্শগত বিরোধ থাকবেই, কিন্তু দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যখন জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন আসে, তখন সবাইকে এক সুরে কথা বলা উচিত। অ্যাম্বাসাডর সি. বি. জর্জের দেওয়া একটি বক্তব্য এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: আমরা বিশ্বের জনসংখ্যার এক-ষষ্ঠাংশ ধারণ করি, কিন্তু আমরা বিশ্বের এক-ষষ্ঠাংশ সমস্যার কারণ নই।

ভারত বিশ্বকে ‘শূন্য’ দিয়েছে, ‘দাবা’-র মতো খেলা দিয়েছে, ‘যোগব্যায়াম’- এর মতো জীবনপদ্ধতি দিয়েছে এবং মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার বাণী দিয়েছে; তাই এই ইতিবাচক অবদানসমূহকে আড়াল করে কেবল একটি নেতিবাচক আখ্যান তৈরি করার চেষ্টা কখনওই সফল হতে পারে না।

তাই বলা যায়, নরওয়েজিয়ান সাংবাদিকের এই ঘটনাটি ভারতের জন্য কোনও পরাজয় নয়, বরং এটি একটি মস্ত বড় কূটনৈতিক জয়। এর মাধ্যমে ভারত বিশ্বমঞ্চে এই বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পৌঁছে দিতে পেরেছে যে, এখনকার নতুন ভারত আর কোনও পশ্চিমি চাপ বা একতরফা সমালোচনার মুখে মাথানত করবে না। ভারত তার সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও তার বৈশ্বিক অবদানের ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন এবং আত্মবিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করা বা না-করা নিয়ে দেশের ভিতরে বিতর্ক থাকতেই পারে, এবং সেটি একটি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ, কিন্তু বিদেশি মঞ্চে দাঁড়িয়ে কোনও ত্রুটিপূর্ণ সূচকের উপর ভিত্তি করে ভারতকে বিচার করার চেষ্টা করলে, ভারত যে তার যোগ্য জবাব দিতে প্রস্তুত, নরওয়ের এই ঘটনাটি তারই এক কালজয়ী দলিল হয়ে থাকবে।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ‌্যাপক
skdssc76@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement