টুটু বোসের প্রজন্মের তেমন বাঙালির সংখ্যা হাতেগোনা, যাঁরা নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দূরদৃষ্টি দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছেন। তাঁর সমসাময়িক বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি অহমিকার শিকার হয়েছিলেন। টুটুরও আত্মমর্যাদাবোধ ছিল প্রবল, কর্তৃত্ববোধও, কিন্তু অহং কখনও সিদ্ধান্তগ্রহণের নিয়ন্তা হয়ে ওঠেনি। লিখছেন এম জে আকবর।
পরিবারের বাইরে টুটু বোসের ছিল দু’টি নেশা এবং একটি প্রেম। নেশা– মোহনবাগান এবং তাঁর হাতেগড়া ‘সংবাদ প্রতিদিন’। যে-দু’টিকে অনায়াসে তাঁর জীবনের ‘নিয়ন্ত্রক’ বলা যায়। ফুটবল ও সংবাদপত্র তাঁকে দিয়েছিল সামাজিক মর্যাদা ও জনসম্মানের স্বাদ, এবং তা উনি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতেন। আর, প্রেম– ব্যবসা ও হলদিয়া বন্দর। যেখানে কার্যত তিনিই সর্বেসর্বা।
যদি হলদিয়া বন্দর থেকে আসা মুনাফা তাঁর নেশার ব্যয়ভার বহন করে থাকে, তাহলেও তা ন্যায্য– এবং তা আমার চোখে বাঙালি জমিদারি মানসিকতারই এক আধুনিক রূপ– যেখানে তিনি তাঁর শখ বা ব্যক্তিগত অনুরাগের প্রতি খরচ করেছেন– সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। কেউ যেমন খেয়াল, ঠুংরি বা কত্থকের অসাধারণ শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন– টুটু তেমনই অর্থ ব্যয় করেছেন মোহনবাগান ও তাঁর সংবাদমাধ্যমের জন্য। এ এক অদ্ভূত বৈপরীত্যও বটে! কারণ স্বভাব ও ব্যক্তিগত রুচিতে টুটু ছিলেন অত্যন্ত মিতব্যয়ী– অবশ্য নিজে এই স্বভাবকে ‘বিচক্ষণতা’ বলতেই বেশি পছন্দ করতেন।
ওঁর প্রজন্মের তেমন বাঙালির সংখ্যা হাতেগোনা, যাঁরা নিজের পরিশ্রম ও দূরদৃষ্টি দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছেন। টুটুর বহু বিশিষ্ট সমসাময়িক ব্যক্তি অহমিকার শিকার হয়েছিলেন। টুটুরও আত্মমর্যাদাবোধ ছিল প্রবল, কর্তৃত্ববোধও ছিল প্রিয়; কিন্তু তাঁর অহং কখনও সিদ্ধান্তগ্রহণের নিয়ন্তা হয়ে ওঠেনি।
কলকাতার বাইরে, বিশেষত বিদেশে, ওঁকে যে-ক’বার দেখেছি, ততবার দেখেছি– পাঁচতারা হোটেলের বিপুল বিল হয়ে উঠেছে তাঁর বিরক্তির অন্যতম কারণ, সে যদি তাঁর নিজের পকেটের বদলে স্পনসর্ড ট্রিপও হয়– তাহলেও। আদতে যুক্তির বিচারে ভাবলে, এমন একটি ঘরে কয়েক ঘণ্টা ঘুমনো বা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য যে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হয়, তা সত্যিই অযৌক্তিক। কিন্তু ভেবে দেখুন, সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও যদি তিনি একইরকম খরচবিরোধী মনোভাব পোষণ করতেন– বিশেষত সেই সময়– যখন আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের অগ্রণীরা বাজারের আয়ের বৃহৎ অংশ নিজেদের দখলে নিয়ে ফেলেছিল– তাহলে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর বিস্তার কখনও সম্ভবই হত না। তাঁর পুত্র টুম্পাই বর্তমানে একটি সুসংগঠিত ব্যবসার উত্তরাধিকারী; আর সেটাই টুটুর ব্যবসায়িক প্রজ্ঞার প্রকৃত স্বীকৃতি। সংবাদমাধ্যমের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা করার চেয়ে কঠিন কাজ খুব কমই আছে।
অসাধারণ কোনও ব্যক্তির ব্যাপ্তি ও লোকপ্রিয়তা সহজে বোঝাতে সাধারণত ‘তারকা’ শব্দটি বলা হয়। কিন্তু টুটুর ক্ষেত্রে সেই উপমা যথার্থ নয়। টুটু ছিলেন সূর্যের মতো। গ্রহদের তাঁর চারপাশেই আবর্তিত হওয়াই ভবিতব্য; তাঁর কক্ষপথের সঙ্গে খাপ না খেলে কারও স্থায়িত্ব ছিল না। আবার সূর্য যেমন আলো দেয়, তেমনই খুব কাছে গেলে দগ্ধে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল প্রবল।
ওঁর প্রজন্মের তেমন বাঙালির সংখ্যা হাতেগোনা, যাঁরা নিজের পরিশ্রম ও দূরদৃষ্টি দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছেন। টুটুর বহু বিশিষ্ট সমসাময়িক ব্যক্তি অহমিকার শিকার হয়েছিলেন। টুটুরও আত্মমর্যাদাবোধ ছিল প্রবল, কর্তৃত্ববোধও ছিল প্রিয়; কিন্তু তাঁর অহং কখনও সিদ্ধান্তগ্রহণের নিয়ন্তা হয়ে ওঠেনি। কেননা, তিনি জানতেন, ব্যক্তিগত অহমিকার চেয়ে প্রতিষ্ঠান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর, সেজন্যই আজ ওঁর প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রে লেখার সুযোগ পেলাম।
(মতামত নিজস্ব)
