সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতে ইন্দ্রপতন। প্রয়াত বর্ষীয়ান সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। যাঁকে বাঙালি পাঠক চেনে শংকর নামে। বয়স হয়েছিল ৯২। এক বেসরকারি হাসপাতালে শুক্রবার দুপুরে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ভুগছিলেন বয়সজনিত অসুখে। যাঁর কলম থেকে 'কত অজানা রে', 'চৌরঙ্গী', 'সীমাবদ্ধ', 'জন অরণ্য'-র মতো সৃষ্টি পেয়েছে পাঠক, তাঁর প্রয়াণে সৃষ্টি হল এমন শূন্যতা যা কখনও ভরার নয়। তবে থেকে গেল তাঁর সৃষ্টি।
গত শতকের তিনের দশকে, ১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্ম শংকরের। তবে ছোট বয়সেই সপরিবারে চলে আসেন হাওড়ায়। কিশোর বয়সেই হারান বাবাকে। গ্রাসাচ্ছেদনের জন্য শুরু হয় লড়াই। একার কাঁধে সংসারের জোয়াল টানতে কখনও কেরানির কাজ যেমন করেছেন, করেছেন হকারিও। আর সেই সূত্রেই কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নােয়েল ফ্রেডারিক বারওয়েলের অধীনে চাকরি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লেখেন 'কত অজানারে।' এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শংকরকে। বাংলা সাহিত্য পেল এক নতুন সাহিত্যিককে। তবে তাঁকে প্রকৃত জনপ্রিয়তা দিয়েছিল ‘চৌরঙ্গী’। শাজাহান হোটেলের সুখ-দুঃখের সেই আখ্যান শংকরকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। আজও এই অমোঘ গ্রন্থটি বেস্ট সেলার।
পরবর্তী সময়ে একে একে তাঁর কাছ থেকে বাঙালি পাঠক পেয়েছে 'সীমাবদ্ধ', 'জন অরণ্য', 'নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি', 'সম্রাট ও সুন্দরী', 'চরণ ছুঁয়ে যাই'-এর মতো অসামান্য অসংখ্য সৃষ্টি। যা ক্রমেই শংকরকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। লেখালেখির জন্য পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। যার মধ্যে অন্যতম ২০২১ সালে ‘একা একা একাশি’র জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, ১৯৯৩ সালে 'ঘরের মধ্যে ঘর'-এর জন্য বঙ্কিম পুরস্কার।
শংকরের তিনটি উপন্যাস নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা। এর মধ্যে সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেছিলেন 'সীমাবদ্ধ', 'জন অরণ্য'। নাগরিক অবক্ষয়ের অসামান্য দলিল হয়ে রয়েছে ছবি দু'টি। পিনাকিভূষণ মুখোপাধ্যায় নির্মাণ করেছিলেন 'চৌরঙ্গী'। সেই ছবিতে উত্তমকুমারের 'স্যাটা বোস' তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চরিত্র হয়ে রয়েছে। এছাড়াও ঋত্বিক ঘটক 'কত অজানারে' নিয়ে ছবি করার কথা ভাবলেও সেই কাজ শেষ হয়নি।
দীর্ঘদিন বয়সজনিত সমস্যায় ভুগলেও গত বইমেলাতেও হাজির ছিলেন পাঠকদের মাঝে। তবে এবারের বইমেলায় উপস্থিত ছিলেন না। মাত্র কয়েকদিন আগেই শেষ হয়েছে মেলা। এবার চিরকালের জন্য অমৃতলোকে পাড়ি দিলেন শংকর। রয়ে গেল তাঁর সৃষ্টি। যা পাঠকের হৃদয়ে থেকে যাবে অমর, অক্ষয় হয়ে।
