shono
Advertisement

Breaking News

Shankar

'মানুষ ও লেখক দু'দিকেই অসাধারণ', বলছেন শীর্ষেন্দু, শংকরের প্রয়াণে শোকগ্রস্ত বাংলার সারস্বত সমাজ 

শংকর প্রয়াত হলেন, তাঁর সৃষ্টি আমাদের কাছে রইল, বলছেন সাহিত্যিক অমর মিত্র, সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, প্রকাশক শুভংকর দে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 05:06 PM Feb 20, 2026Updated: 06:16 PM Feb 20, 2026

তিনি 'চৌরঙ্গী', 'সীমাবদ্ধ' এবং 'জন অরণ্য'-এর স্রষ্টা। তেমনই 'চরণ ছুঁয়ে যাই', ‘কত অজানা রে’-র মতো ভিন্ন স্বাদের রচনাও তাঁর অনন্য কাজ। বাঙালির বাণিজ্যবোধ থেকে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ বিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ প্রণেতা। আসল কথা, বহুমুখী মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের বৈঠকী সাহিত্যে, জাদু গদ্যে দশকের পর দশক ধরে আচ্ছন্ন বাঙালি। শুক্রবার ৯২ বছর বয়সে মানবসাগর তীর ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন শংকর। শোকগ্রস্ত বাংলার লেখক-প্রকাশক-পাঠক মহল। ইংরাজি-হিন্দির আগ্রাসনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি যখন খানিক কোণঠাসা, তখন তাঁর প্রয়াণ বাংলা সাহিত্যের জন্য ঠিক কতটা ক্ষতিকর? উত্তর দিলেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় থেকে অমর মিত্র, এ যুগের আখ্যান রচয়িতা সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় থেকে প্রকাশক শুভংকর দে।

Advertisement

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

লেখালিখির শুরুর দিন থেকেই আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। এত অমায়িক, এতখানি অহংকারশূন্য মানুষ আমি জীবনে খুব কম দেখেছি। এত বড় লেখক বোঝাই যেত না! দেখা হলেই মুখে দিলখোলা হাসি। মনটা ভরে যেত। তাঁর বিরাট লেখক জীবনের কথা সকলেই জানেন। প্রায় শুরুতেই তিনি বাংলা সাহিত্যকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন 'কত অজানা রে' লিখে। তার পর একে 'চৌরঙ্গী', 'জনঅরণ্য', 'সীমাবদ্ধ'... কত বই প্রকাশিত হল। তবে আমার কাছে তাঁর উল্লেখযোগ্য বই হল 'নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটারি'। এটা একটা অন্য রকমের কাজ। অসম্ভব ভালো উপন্যাস। মানুষ এবং লেখক---উভয় দিক থেকেই শংকর একটা অসাধারণ জায়গায় ছিলেন। আমি পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখেছি তাঁর মধ্যে। প্রত্যেক বইমেলায় টেবিল পেতে বসে পাঠককে সই দিতেন। হুইল চেয়ারে বসেও এই কাজ করেছেন তিনি। এটা শেখার মতো জিনিস। শংকর প্রয়াত হয়েছেন ঠিকই তাঁর সৃষ্টি আমাদের কাছে রইল, তাঁর স্মৃতি আমাদের সঙ্গে রইল।

তিনি 'চৌরঙ্গী', 'সীমাবদ্ধ' এবং 'জন অরণ্য'-এর স্রষ্টা।


শুভংকর দে 

শংকরের সঙ্গে দেজ প্রকাশনার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। প্রথম ১৯৭৬ সালে তাঁর বই আমাদের প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়। সেই বইটি ছিল 'স্বর্গ মর্ত্য পাতাল'। তিনটি উপন্যাসের সংকলন। সেগুলি হল 'সীমাবদ্ধ' 'আশা আকাঙ্ক্ষা', 'জনঅরণ্য'। সেই সময় থেকে দেজ-এর সঙ্গে তাঁর প্রকাশক-লেখক সম্পর্ক। যদিও ১৯৭৬ সালের আগে থেকেই তাঁর কাছে যেতেন আমার বাবা সুধাংশুশেখর দে। নানা রকম পরামর্শ নিতেন। বিশেষত একটি বইকে কীভাবে আরও বেশি পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেওয়া যায়, কোন বইয়ের কেমন দাম হওয়া উচিত ইত্যাদি বিষয়ে বাবার সঙ্গে কথা হত তাঁর। কত রকমের পরামর্শ যে দিয়েছেন, সেই সমস্ত নথি এখনও আমাদের কাছে রয়েছে। দিনে দিনে শংকর ও বাবার সম্পর্ক দাদা ও ভাইয়ের সম্পর্কে পরিণত হয়। বাবা তাঁকে 'দাদা' বলেই ডাকতেন। কখনও শংকরদা বলে ডাকতে শুনিনি। আমার মনে পড়ছে, গত বছর পর্যন্ত আট থেকে নয় দিন বইমেলাতে এসেছেন তিনি। তাঁকে কেন্দ্র করে এই প্রজন্মের পাঠকের উৎসাহ দেখেছি আমি। লেখা পড়ার জন্য উৎসাহ, সই সংগ্রহের জন্য উৎসাহ। এটা সত্যিই অকল্পনীয়। তিনি আসলে একজন প্রকাশকের কাছে মহীরুহ, ছাতার মতোন। আজকে সেই মানুষটিকে আমরা হারালাম। তাঁর সৃষ্টি থেকে যাবে।

শংকরের সঙ্গে দেজ প্রকাশনার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। প্রথম ১৯৭৬ সালে তাঁর বই আমাদের প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়। সেই বইটি ছিল 'স্বর্গ মর্ত্য পাতাল'।

অমর মিত্র

আমি ১৯৬৯-৭০ সাল থেকে শংকরের লেখা পড়ছি। 'কত অজানা রে' পড়েছি। খুব ভালো বই। তাঁর আগে 'চৌরঙ্গী' পড়ি দেশ পত্রিকায়। আমার মনে আছে 'সীমাবদ্ধ' ও 'জনঅরণ্য' পরপর দু'বছর পুজো সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। দু'টো উপন্যাস পড়েই মুগ্ধ হয়েছিলাম। দীর্ঘ সময় ধরে একটানা লিখে গিয়েছেন তিনি। সহজ নয়। ২০২৫ সালের বইমেলাতেও দেখেছি, পাঠককে সই বিলোচ্ছেন শংকর। জীবনের বিভিন্ন দিক ধরা পড়েছে ওঁর লেখায়। শেষের দিকে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেখানে অনেক অজানা তথ্য পেয়েছি। পড়ন্ত বয়সে আত্মজীবনী 'একা একা একাশি' লিখেছেন। সেও চমৎকার রচনা। একটা সময় সকলকেই যেতে হয়। ৯২ বছর বয়স হয়েছিল। আর লিখতেও পারছিলেন না, শারীরিক কারণে। তার পরেও মৃত্যু সব সময়েই দুঃখের। তবে লেখকের লেখকের পরিচয় তো তাঁর বই। শংকরের বই বেঁচে থাকবে।

শংকর বাঙালির বাণিজ্যবোধ থেকে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ বিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ প্রণেতা।

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

শংকর আমাদের মধ্যে নেই, এটা খুব দুঃখের খবর। ওঁর সঙ্গে বেশ কয়েক বার সাক্ষাৎ হয়েছে আমার। মনে আছে, একবার একসঙ্গে একটা গ্রন্থাগার উদ্বোধন করতে গিয়েছিলাম। দেখেছি এত বড় মানুষ, কিন্তু অহঙ্কারশূন্য, সকলের সঙ্গে মিশতে পারেন। আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম, সেবার লংড্রাইভে মেদিনীপুরের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়েছিলাম ওঁর সঙ্গে। স্বভাবতই সেখানে আমাদের লেখক হিসাবে খুব খাতির করা হয়। অনেক রকম খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন আয়োজকরা। শংকর কিন্তু কিছুই প্রায় খাচ্ছিলেন না। শরীর কিন্ত সুস্থ। তথাপি। ওই একটু চা খেয়েছিলেন। প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি যে কিছুই খাচ্ছেন না, শরীর খারাপ? উনি উত্তরে বলেন, না, এতদিন বেঁচে আছি এই কারণেই। এই সংযম শেখার মতো। লেখা তো ভালোই। সকলেই জানেন। ওঁর লেখা পড়ে আমরা বড় হয়েছি। ঝরঝরে গদ্য। বলাই যায়---আজ সাহিত্য জগতের একটা নক্ষত্রপতন হল। আমরা বাংলা সাহিত্যের একজন অভিভাবককে হারালাম।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement