রোগাটে ছেলেটা অটোগ্রাফ চেয়েছিল তাঁর কাছে। রেডিওতে তাঁর গাওয়া মারাঠি নাটকের গান শুনে মুগ্ধতার কথা জানিয়েছিল। আশা ভোঁসলের পক্ষে সেদিন আন্দাজ করাও সম্ভব ছিল না, মোটা চশমা পরিহিত বছর ছয়েকের ছোট এই ছেলেটিই একদিন হয়ে উঠবে তাঁর প্রিয় পঞ্চম। রবিবাসরীয় সকাল যখন একটু একটু করে দুপুর হচ্ছে সেই সময় কিংবদন্তি শিল্পীর প্রয়াণ সংবাদ ভেসে এল। আর শোকের সমান্তরালে বয়ে নিয়ে এল হাজারো গল্প। আর সেই গল্পের ভিতরে রাহুল দেববর্মনের সঙ্গে তাঁর প্রেমকাহিনি (Asha Bhosle-RD Burman Love Story) থাকবে না তা কি হয়?
প্রথমদিকে রাহুলকে নিয়ে উদ্বেগই ছিল আশার। ছেলেটা কলেজ থেকে ড্রপ আউট। পরামর্শ দিয়েছিলেন অন্তত স্নাতক স্তরের পড়াশোনাটা যেন শেষ করে নেন। ততদিনে কাজ শুরু করেছেন একসঙ্গে। 'তিসরি মঞ্জিল' ছবির 'আজা আজা ম্যায় হুঁ পেয়ার তেরা'ই ছিল একসঙ্গে তাঁদের প্রথম বড় হিট! সেই শুরু। সুরে সুরে বাঁধা পড়ল দু'টি জীবন। সুর আর প্রেম তাঁদের কাছে আলাদা কিছু নয়। যেন একই মুদ্রার ওলটপালট পরিচয়। একবার এক পডকাস্টে আশা বলেছিলেন, ''ও নিজেও জানত না ও কত বড় সঙ্গীত পরিচালক! মানুষটাই অন্যরকম। ওকে হিরে উপহার দিলে বলত, এসবে কী হবে? এটা তো একটা পাথর। এর চেয়ে একটা ভালো গান রেকর্ড করো তো দেখি।'' এমনই ছিল তাঁদের সম্পর্ক। চেনা প্রেমের স্টিরিওটাইপ নয়, বরং গানে ও সুরে মেশানো এক জীবন। আশার কণ্ঠস্বরে মগ্ন হয়ে থাকতেন রাহুল। এক সাক্ষাৎকারে আশা বলেছিলেন, ''ও আমার পিছনে পড়ে গিয়েছিল সাংঘাতিক ভাবে! আশা, তোমার সুর খুব সুন্দর। আমি তোমার গানে মুগ্ধ। কী আর করতাম। একসময় হ্যাঁ বলেই দিলাম।''
প্রথমদিকে রাহুলকে নিয়ে উদ্বেগই ছিল আশার। ছেলেটা কলেজ থেকে ড্রপ আউট। পরামর্শ দিয়েছিলেন অন্তত স্নাতক স্তরের পড়াশোনাটা যেন শেষ করে নেন। ততদিনে কাজ শুরু করেছেন একসঙ্গে। 'তিসরি মঞ্জিল' ছবির 'আজা আজা ম্যায় হুঁ পেয়ার তেরা'ই ছিল একসঙ্গে তাঁদের প্রথম বড় হিট! সেই শুরু। সুরে সুরে বাঁধা পড়ল দু'টি জীবন।
দু'জনেরই প্রথম বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল। বিশেষ করে আশার ব্যক্তিগত জীবন যেন তছনছ হয়ে গিয়েছিল সেই ভাঙনের আঘাতে। তিনি ভুলতে পারতেন না তাঁর ও তাঁদের সন্তানের প্রতি স্বামীর ভয়ংকর আচরণ। তাই স্বাভাবিক ভাবেই দ্বিতীয় সম্পর্কে যেতে একটা দ্বিধা তাঁর ছিলই। সেই ছয়-সাতের দশকে বয়সে ছ'বছরের ছোট একটা ছেলেকে বিয়ে করাতেও চ্যালেঞ্জ ছিল। অন্যদিকে রাহুলের বিয়ে ভেঙে যায় ১৯৭১ সালে। প্রথম দাম্পত্য টিকেছিল বছর পাঁচেক। তবু সেসব উপেক্ষা করেই আটের দশকে চার হাত এক হয়। সেটা ১৯৮০ সাল। আশা ৪৭। রাহুল ৪১। ততদিনে রাহুলের বাবা শচীন কর্তা প্রয়াত। মা মীরা দেববর্মনের খুব একটা সায় ছিল না এই সম্পর্কে। তবে যখন তাঁদের বিয়ে হয় ততদিনে তিনি অসুখে একেবারে অচেতন। এদিকে শোনা যায় আশার দিদি লতা মঙ্গেশকরও বিয়েতে মত দেননি প্রথমে। তবু, শেষপর্যন্ত বিয়েটা করেই ফেলেন রাহুল-আশা।
দু'জনেরই প্রথম বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল। বিশেষ করে আশার ব্যক্তিগত জীবন যেন তছনছ হয়ে গিয়েছিল সেই ভাঙনের আঘাতে। তিনি ভুলতে পারতেন না তাঁর ও তাঁদের সন্তানের প্রতি স্বামীর ভয়ংকর আচরণ। তাই স্বাভাবিক ভাবেই দ্বিতীয় সম্পর্কে যেতে একটা দ্বিধা তাঁর ছিলই। সেই ছয়-সাতের দশকে বয়সে ছ'বছরের ছোট একটা ছেলেকে বিয়ে করাতেও চ্যালেঞ্জ ছিল।
অন্য সকলের মতোই পঞ্চম বলে তিনি ডাকতেন রাহুলকে। এদিকে রাহুলের সুরে 'বাবুয়া' নামের একটি গান গাওয়ার পর সেই নামেই আশাকে ডাকা শুরু করেন কিংবদন্তি সুরকার। পরে সেটাই সংক্ষেপিত করে হয় 'বাব'। কিন্তু এই সব সম্বোধন একেবারেই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে। অন্যদের সামনে দু'জন দু'জনকে আসল নামেই ডাকতেন। সুরে সুরে বাঁধা এক জীবন। এরই সঙ্গে ছিল রান্নার প্রতি যৌথ প্রেম। যেভাবে 'আজা আজা ম্যায় হুঁ পেয়ার তেরা'র 'আ-আ-আজা'র মতো এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন, সেভাবেই দু'জনে মিলে নানা আশ্চর্য পদ আবিষ্কার করেন। সেই সব পদ যাঁরা খেয়েছেন তাঁরা আজও তার স্বাদের মুগ্ধতার কথা ভোলেননি।
বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি তাঁদের। বিয়ের পর থেকেই ভাঙতে থাকে রাহুলের শরীর। ধূমপান ও মদ্যপানের ছোবলে জেরবার হয়ে যেতে থাকেন তিনি। এদিকে কেরিয়ারও ক্রমশ অস্তগামী। এই কঠিন সময়ে আশা ছিলেন রাহুলেরই পাশে। যদিও বিচ্ছেদ হয়ে যায় একটা সময় পরে। তবু নিয়মিত যোগাযোগটা থেকেই গিয়েছিল। মাত্র ৫৪ বছরে রাহুলের চলে যাওয়াটা কোনওদিনই মানতে পারেননি আশা। শোনা যায়, শেষ সাক্ষাতে নাকি আশার নাম ধরে ডাকতে চেয়েও পারেননি রাহুল। এই বিষাদ তাঁকে সারা জীবন কষ্ট দিয়েছে। একবার বলেছিলেন, ''স্টুডিওয় সুরকার কাছেই থাকে। তখন কাজটা সহজ। কিন্তু সে একেবারে বিদায় নিলে, একসময় আবেগ গ্রাস করে কণ্ঠস্বর। মঞ্চে আমার গলা ধরে আসে আজকাল, গলা কাঁপে। স্মৃতিগুলো ঘিরে ধরে। মনে পড়ে যায় সেই সব সন্ধে, সেই সব চিঠি...'' রাহুল চলে গিয়েছেন তিন দশক। এবার আশাও চলে গেলেন। শিল্পের ভিতরে থেকে যাবে তাঁদের প্রেমের গভীর ইশারা। থাকবে কত না গান, সেখানে মিলেমিশে আছে দু'জনের ভালোবাসার ওম!
পুজো মণ্ডপ হোক বা ইউটিউবে একলাবিলাস, রাহুল ও আশার সুরে সুরে লেখা প্রেমগীতি নিজস্ব ছন্দে স্পন্দিত হতে থাকে। ব্যক্তিগত প্রেম একদিন শেষ হয়। কিন্তু যে প্রেম সুরের ভিতরে জেগে থাকে, তা কখনও শেষ হয় না। আশা ও রাহুলের প্রেমও জেগে থাকবে তাঁদের গানের ভিতরেই।
