১৯৮১ সালে 'আদালত ও একটি মেয়ে' (Adalat O Ekti Meye Review) নামে সিনেমা তৈরি করেছিলেন তপন সিনহা। যে ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তনুজা। সেই নামের আধারেই তৈরি সদ্য হইচই-এর পর্দায় মুক্তিপ্রাপ্ত সিরিজটি। কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এই সিরিজ এগিয়েছে জয়িতা নামে এক স্বাধীনচেতা নারীর গল্প নিয়ে। অফিসের পার্টি চলাকালীন কীভাবে শারীরিক হেনস্তার শিকার হন জয়িতা? কে বা কারা জয়িতার ধর্ষণের নেপথ্যে? 'আদালত ও একটি মেয়ে' সিরিজের পরতে পরতে সেই রহস্য উন্মোচন করেছেন পরিচালক। তবে এই সিরিজ যতটা না কোর্টরুম ড্রামা, তার থেকেও বেশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রক্তচক্ষুর বিরুদ্ধে এক নারীর একক লড়াইয়ের গল্প। জয়িতার লড়াই কীভাবে সভ্যতার মুখোশ পরা সমাজকে উলঙ্গ করে দেয়? সিরিজে সেই গল্পই নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়।
'বহুরূপী', 'কিলবিল সোসাইটি'র পর এই সিরিজেও ডিগ্ল্যাম লুকে অভিনেত্রী হিসেবে নিজের জাত বুঝিয়ে দিলেন কৌশানী মুখোপাধ্যায়। উকিল সেবন্তীর ভূমিকায় বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায় ততোধিক সাবলীল। বাংলা সিনেপাড়ায় এহেন স্পষ্ট উচ্চারণে সংলাপ আওড়ানো অভিনেত্রীর সংখ্যা নেহাত কম, বললেও অত্যুক্তি হয় না।
শহরের বুকে আচমকাই ঘটে যায় এক ধর্ষণের ঘটনা। এই গল্পের নায়িকা জয়িতা (কৌশানী মুখোপাধ্যায়)। যিনি কর্পোরেট সংস্থার উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক কর্মী। টার্গেট পূরণ করতে অধঃস্তন কর্মীদের বেশ চাপেই রাখেন। পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমের যাঁতাকলে পড়লেও স্ট্রিট স্মার্ট, কর্মঠ জয়িতা সেসবের তোয়াক্কা করে না। কারণ বাবা তাঁকে মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচার মন্ত্র শিখিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা, ডানা মেলা ওড়া জয়িতার জীবন এক রাতে আচমকাই ওলট-পালট হয়ে যায়। বর্ষবরণের রাতে বসের বাড়ির অফিস পার্টিতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন তিনি। কিন্তু নেশাগ্রস্থ অবস্থায় থাকায় কে এমন পাশবিক কাণ্ড ঘটাল? তার মুখ দেখতে পাননি জয়িতা। যেহেতু পার্টির ভেন্যু বসের বাড়ি। এবং অতীতেও অফিসে বসের কিছু আচরণে জয়িতা অস্বস্তিতে পড়েছিলেন, মানসিক ট্রমার বশে সেসব স্মৃতি ভেসে ওঠে তাঁর মনে। অতঃপর বস ডিকে'র (সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়) বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ জানাতে সে রাতেই থানায় যান জয়িতা। সেখান থেকেই শুরু তাঁর লড়াই। কারণ পরিবারের শত আপত্তি সত্ত্বেও কাছের মানুষদের বিরুদ্ধে গিয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হন জয়িতা। এরপর?
'আদালত ও একটি মেয়ে' সিরিজে কৌশানী মুখোপাধ্যায়
সাত পর্বের সিরিজে পরতে পরতে রহস্য, রোমাঞ্চের মোড়কে আসল 'কালপ্রিট' ক্রমশ প্রকাশ্যে আসতে থাকে। জয়িতার স্কুলের সিনিয়র নামজাদা আইনজীবী সেবন্তী এই ধর্ষণের মামলা লড়ার দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে। সেখানেই 'সরষের মধ্যে ভূতে'র সন্ধান পান সেবন্তী এবং জয়িতা। আসল অপরাধীকে ধরতে কীভাবে তাঁরা ফাঁদ পাতেন? সেই গল্প নাহয় হইচইয়ের পর্দাতেই উপভোগ করুন। তবে উল্লেখ্য, 'বহুরূপী', 'কিলবিল সোসাইটি'র পর এই সিরিজেও ডিগ্ল্যাম লুকে অভিনেত্রী হিসেবে নিজের জাত বুঝিয়ে দিলেন কৌশানী মুখোপাধ্যায়। উকিল সেবন্তীর ভূমিকায় বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায় ততোধিক সাবলীল। বাংলা সিনেপাড়ায় এহেন স্পষ্ট উচ্চারণে সংলাপ আওড়ানো অভিনেত্রীর সংখ্যা নেহাত কম, বললেও অত্যুক্তি হয় না। কোর্টরুমের অন্দরে বেশ কিছু সিকোয়েন্সে বাসবদত্তার অভিব্যক্তি, আইনজীবী হিসেবে তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ লক্ষণীয়। কারণ প্রতিপক্ষ শিবিরের উকিলের ভূমিকায় কৌশিক সেনের মতো দুঁদে অভিনেতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি। কমলেশ্বরের ফ্রেমে আইনজীবীর ভূমিকায় কৌশিকের অভিনয় এই সিরিজের অন্যতম সারপ্রাইজ এলিমেন্ট।
স্বল্প দৈর্ঘ্যে নজর কাড়েন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অনিরুদ্ধ গুপ্তও যে যার পরিসরে যথাযথ। কিন্তু হইচইয়ের একাধিক সিরিজের মতো কমলেশ্বরের 'আদালত ও একটি মেয়ে'তেও এই দুই অভিনেতাকে 'টাইপ কাস্ট' বলে মনে হল। প্রথমভাগে কোর্টরুমের কিছু দৃশ্য অতিনাটকীয় বলে মনে হয়। তবে পরের দিকে চিত্রনাট্যে টানটান উত্তেজনা বজায় রেখেছেন সিরিজের পরিচালক তথা চিত্রনাট্যকার কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। তবে 'আদালত ও একটি মেয়ে' সিরিজটি আবারও সমাজের সামনে প্রশ্ন রাখল, ধর্ষণের কারণ হিসেবে মেয়েদের স্বাধীনচেতা মনোভাব ও জীবনযাপনকে দায়ী করার এই 'সংস্কৃতি' আর কতদিন চলবে?
