যদি বলি, তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে, হাতে হাত রাখতে ইচ্ছে করছে, অনেকদিন পর। চাইলেই কি হয়, সঙ্গে থাকতে হয়। এ ছবির গানের কথায় সেই 'সঙ্গে থাকার মেহেরবানি'। ছবির অন্তরাত্মা আরও বেঁধে বেঁধে থাকার কথা বলে। না-ই বা হল সে রক্ত সম্বন্ধের কেউ। সম্পর্কের নির্দিষ্ট মানচিত্র হয় না- খুব স্পষ্ট করে বলে পরিচালক সৌরভ পালোধির চিত্রনাট্য। নীড় ছোট কিন্তু সম্পর্কের আকাশটা অনেক বড়, তাই বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিবর্তে জোট বাঁধার কথা বলে 'অনেকদিন পর'। একাকী মা-বাবা আর সন্তান বিদেশে বা অন্য রাজ্যে এমনটা এখন বাস্তব সত্য। তাই বলে আপনজন পাওয়া যাবে না? সমস্ত একলা মানুষদের একছাদের তলায় আনার গল্প এই ছবি। যেখানে বন্ধুত্ব, প্রেম, বিষাদ, বিচ্ছিন্নতা, পাওয়া, না-পাওয়া মিলেমিশে এককার।
‘বেঁচে থাকতে একটা পারপাস লাগে’– ছবির ম্যাজিক বাক্যবন্ধ চিত্রনাট্যের প্রাণ। দেখতে দেখতে মনে হয় অপেক্ষা ফুরিয়ে গেলে আর জীবন কিসের?
গল্পটা কেমন? আশিস (বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়) আর বিশ্বনাথ (শঙ্কর দেবনাথ) দুই বন্ধু। প্রৌঢ় বয়সে বিশ্বনাথের স্ত্রীর প্রয়াণের পর ছেলে (বুদ্ধদেব দাস) বিদেশ চলে যায়। একলা বিশু তখন নিজের বাড়িতে বন্ধুরা ও কয়েক জন মিলে থাকার সিদ্ধান্তে আসে। বৃদ্ধাশ্রম নয়, কিন্তু বিভিন্ন বয়সি মানুষ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এদেরই দেখাশোনা করে মল্লিকা নামের (চিত্রাঙ্গদা শতরূপা) একটি মেয়ে। অনেকদূর থেকে সাইকেলে-বাসে চেপে সে আসে। তারও আছে এক বন্ধু (বিমল গিরি)। সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরতা পথে দেখা হয় দু’জনের চায়ের দোকানে। মাঝে মাঝে বাসে পাশের সিটে বন্ধু রুমাল ফেলে জায়গা রাখে মেয়েটার জন্য। প্রত্যেকের জীবনে ক্রাইসিস আলাদা। সকলেই বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য খুঁজছে। ছেলেটা ফেরে একলা বাড়িতে, আর মেয়েটা ফেরে ঝগড়া-ক্লান্ত বয়স্ক মা-বাবার কাছে। মল্লিকার কাজের জায়গায় মায়া, রেখা, পরিতোষ, নটবর, শিবানী, পরস্পরকে জড়িয়ে বাঁচার ইচ্ছে জারি রেখেছে। মল্লিকা জানে একটা পাতা মানে একটা গাছের অংশ। অসুখ, অভাব, নিঃসঙ্গতা, ঘরে সিঁধ কাটলেও জীবনের আনন্দ এরা খুঁজে নিতে পেরেছে। ডবল ক্যারি করার আনন্দ উপচে পড়া সে জীবনে! অনুচ্চারিত ভালোবাসার নরম আলো পড়ে ছবি জুড়ে। নিঃসঙ্গ বাবা-মায়ের সন্তান ফেরার অপেক্ষা ধরে কাহিনি এগোয়।
সৌরভ পালোধি পরিচালিত 'অনেকদিন পর' সিনেমার দৃশ্য।
‘বেঁচে থাকতে একটা পারপাস লাগে’– ছবির ম্যাজিক বাক্যবন্ধ চিত্রনাট্যের প্রাণ। দেখতে দেখতে মনে হয় অপেক্ষা ফুরিয়ে গেলে আর জীবন কিসের? মিউজিক ছবিটাকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যায়। সপ্তক সানাই দাসের সুর অনবদ্য। বহুদিন মনে থেকে যাবে দুর্নিবার সাহার গাওয়া ‘মেঘেদের নাম’। ‘কতটা কালো হলে মেঘেদের নাম অকালে লেখা হয় বাদলে’– অপূর্ব লিখেছেন ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তী। হারিয়ে যাওয়া এসটিডি বুথের প্রেম, ভাঁড়ের চা খাওয়া, লেটার বক্সের উত্তেজনা– এমন অজস্র নস্টালজিয়া ফিরিয়ে এনেছেন ছবিতে পরিচালক। কিছু কিছু মুহূর্ত ইথেরিয়াল। মঞ্চের আলো পড়ে এ ছবির প্রতিটা ফ্রেমে। নাটক একটা সিনেমাকে এগিয়ে দিতে পারে দেখতে দেখতে মনে হয়। তবে গল্পটা জোরালো নয়। দ্বিতীয়ার্ধ যেন খানিকটা জোর করে টেনে নিয়ে যাওয়া। তবু বলতেই হয়, এমন চিরকালীন ভালোবাসার ছবি, আটপৌরে অনুভবের ছবি প্রযোজনা করার জন্য ধন্যবাদ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে। সৌরভ পালোধির মতো নবীন পরিচালকরা সাহস পাবেন এর ফলে। আর তারকা নেই এই ছবিতে কে বলল? প্রত্যেক অভিনেতাই নিজস্ব ভঙ্গিতে উজ্জ্বল। তবু বলতেই হয়, মল্লিকার চরিত্রে চিত্রাঙ্গদা শতরূপা আগামী দিনের স্টার। তাঁর অভিনয় এককথায় ব্রিলিয়ান্ট। খুব ভালো লাগে বন্ধুর চরিত্রে বিমল গিরিকে। আলাদা করে নজর কাড়েন শুভঙ্কর ঘটক এবং মূক চরিত্রে সুপর্ণা দাস। মন ছুঁয়ে যান দেবেশ রায়চৌধুরি, মধুমিতা সেনগুপ্ত, সীমা মুখোপাধ্যায়, স্বাতী মুখোপাধ্যায়, সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়, সঞ্জিতা আরও অনেকে। সব মিলিয়ে এই ছবি বেঁচে থাকার গান।
