সাহিত্যেপ্রমী বাঙালিদের বোধোদয়ের আঁতুরঘর থেকেই গোয়েন্দা, রহস্যপ্রীতি। তাই মগজাস্ত্রের জড়িপ নিতে গোয়েন্দাপ্রেমী দর্শকদের কৌতূহলী মন স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-এর সুবাদে শহরে এবার গোয়েন্দা ঠাকুমা গিরিজিবালা দেবী। আর পাঁচজন 'সত্যান্বেষী'র সঙ্গে এই ডিটেক্টিভের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অমিল অনেক! মধ্যবিত্ত সংসারযাপনের পাশাপাশি মগজাস্ত্রের জোরে যিনি এযাবৎকাল বহু রহস্যের পর্দা ফাঁস করেছেন। বাঙালি সত্যান্বেষীদের ভিড়ে কতটা ভিন্ন স্বাদ দিতে পারল 'ঠাকুমার ঝুলি'?
'ঠাকুমার ঝুলি' সিরিজে শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়। ছবি- সংগৃহীত
‘শুভ মহরৎ’-এ ঋতুপর্ণ ঘোষ দেখিয়েছিলেন মধ্যবিত্ত ‘রাঙাপিসি’র গোয়েন্দাগিরি। তারপর অরিন্দম শীল নিয়ে এলেন সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘মিতিন মাসি’কে। এবার ময়দানে গিরিজিবালা দেবী। গিরিজিবালা সান্যাল বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, স্থির এবং সংযত নারী। কাঁচা বয়সে বৈধব্য যন্ত্রণা, জীবনের নানা প্রতিকূলতার মোচড় গিরিজাকে আরও ইস্পাতসম করে তুলেছে। ভাগ্যের ফেরে হারিয়েছেন পুত্রসন্তানকেও। এ কুলে নাতনি যাজ্ঞসেনী ছাড়া আর কেউ নেই তাঁর। তবে 'একলা চলো' মন্ত্রে বিশ্বাসী এহেন গিরিজার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কিন্তু চারপাশের মানুষদের তুলনায় খানিক বেশি। রহস্যের গন্ধ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন ষাটোর্ধ্ব গিরিজাবালা। একাকী বৃদ্ধার সঙ্গী তাঁর ৩ পোষ্য, হরি, বেলা ও ফন্টে। সিরিজে তাদের উপস্থিতি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে আম্রপালি সিংহরায়ের মৃত্যু তদন্তের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি? অয়ন চক্রবর্তী পরিচালিত আট পর্বের সিরিজে সেই গল্পই ফুটে উটেছে পরতে পরতে।
বন্ধু আম্রপালী সিংহরায়ের বিয়েতে আমন্ত্রিত হিসেবে ঠাকুমা গিরিজাবালাকে নিয়ে উপস্থিত হয় সে। শুভদৃষ্টির সময়েই ঘটে অঘটন! আচমকাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আম্রপালী। নাতনিসম কন্যার এহেন মর্মান্তিক পরিণতিতে গিরিজাবালা কিছুতেই স্থির থাকতে পারে না। পরিবারের তরফে দুর্ঘটনা বলে দাবি করা হলেও ঘটনাস্থলেই ময়নাতদন্তের দাবি জানায় সে। এরপর প্রতিপত্তিশালী সিংহরায় পরিবারের অন্দরে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে।
'ঠাকুমার ঝুলি' সিরিজে রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি- সংগৃহীত
গল্পের প্রেক্ষাপট বিষ্ণুপুরের মল্লপুর। গিরিজাবালার নাতনি, যাজ্ঞসেনী বিদেশ থেকে দেশে ঠাকুমার কাছে দিন কয়েকের জন্য ছুটি কাটাতে আসে। এরপরই গল্প অন্য মোড় নেয়। বন্ধু আম্রপালী সিংহরায়ের বিয়েতে আমন্ত্রিত হিসেবে ঠাকুমা গিরিজাবালাকে নিয়ে উপস্থিত হয় সে। শুভদৃষ্টির সময়েই ঘটে অঘটন! আচমকাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আম্রপালী। নাতনিসম কন্যার এহেন মর্মান্তিক পরিণতিতে গিরিজাবালা কিছুতেই স্থির থাকতে পারে না। পরিবারের তরফে দুর্ঘটনা বলে দাবি করা হলেও ঘটনাস্থলেই ময়নাতদন্তের দাবি জানায় সে। এরপর প্রতিপত্তিশালী সিংহরায় পরিবারের অন্দরে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে। কখনও পরিচারিকা, কখনও বা বাড়ির সদস্যের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু ধোপদুরস্ত গোয়েন্দাদের তালিকায় গিরিজা পড়েন না! অতঃপর নাতনিকে নিয়ে মল্লপুর থানায় পৌঁছন গিরিজাবালা। যেখানে পুলিশ আধিকারিক বৃহস্পতি মল্লিকের সঙ্গে আলাপ হয় তার। একাধিক খুনের কিণারা করতে গিরিজা তার মতো করে অনুসন্ধান চালিয়ে যায়। বৃহস্পতি তো এখানে তার তুরুপের তাস মাত্র! এদিকে যাজ্ঞসেনীও ক্রিমিনাল সাইকোলজির ছাত্রী। ঠাকুমার সঙ্গে সেও তদন্তে নেমে পড়ে। তারপর কোন দিকে এগোয় গল্প? সবটা এই পরিসরে ফাঁস না করাই ভালো। সেটা বরং হইচইয়ের পর্দাতেই দেখুন।
'ঠাকুমার ঝুলি' সিরিজে শ্রাবন্তীও দিব্যাণী মণ্ডল। ছবি- সংগৃহীত
এবার আসা যাক অভিনয়ের প্রসঙ্গে। 'ঠাকুমার ঝুলি'তে ষাটোর্ধ্ব গিরিজাবালার ভূমিকায় শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়কে দেখলে 'শুভ মহরৎ'-এর 'রাঙাপিসি'র কথা মনে পড়ে যেতে পারে। প্রথমবার বৃদ্ধার চরিত্রে অভিনয়, তবে কোনও খামতি রাখেননি শ্রাবন্তী। তদন্তের মাঝে ছড়ার আকারে রহস্যের সুতোয় ধরে টান দেওয়া কিংবা পুলিশ অফিসার বৃহস্পতিকে কাউন্টারের দৃশ্যে তিনি বেশ সাবলীল। এহেন 'মিষ্টি ঠাকুমা'কে একের পর এক রহস্য উন্মোচন করতে দেখতে কিন্তু বেশ লাগে। নাতনির ভূমিকায় দিব্যাণী মণ্ডলও যথাযথ। পুলিশ অফিসার বৃহস্পতি মল্লিকের চরিত্রে রাহুল অরুণোদয় এই সিরিজের অন্যতম ইউএসপি। রাহুল বরাবরই ডিরেক্টর্স অ্যাক্টর। যে পাত্রে রাখা হবে, সেই পাত্রের আকার নেন তিনি। মোটা গোঁফ। খাকি উর্দিতে এখানেও ছক্কা হাঁকিয়েছেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। একজন অভিনেতার অভিনয়ের খিদে বোধহয় একেই বলে। চরিত্রের দৈর্ঘ্য মেপে নয়, বরং গভীরতায় ডুব দেন রাহুল। 'ঠাকুমার ঝুলি'র ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি! সাংবাদিকের ভূমিকায় দেবরাজ ভট্টাচার্যের অভিনয়ও বেশ। বৃহস্পতির সঙ্গে ঠাকুমা গিরিজাবালার মজার 'গোয়েন্দা সমীকরণ' দেখার জন্যই এই সিরিজ দেখে ফেলতে পারেন হইচইয়ের পর্দায়।
