১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর দেখতে দেখতে ১০৭টি বছর পার হয়ে গেল। এর মধ্যেই শনিবার নজরুল মঞ্চে পালিত হল ইস্টবেঙ্গল দিবস। সেই উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকেই তোড়জোড় ছিল ক্লাব তাঁবুতে। চারিদিকে ছিল সাজসাজ রব। ক্লাব চত্বর ফুল ও আলো দিয়ে সাজানো হয়। ১ আগস্ট ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে একাধিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।
ঐতিহ্য মেনেই প্রতিষ্ঠা দিবসের সূচনা করল ইস্টবেঙ্গল। শনিবার সকালে ক্লাব তাঁবুতে প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সুরেশচন্দ্র চৌধুরীর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান ও প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে শুরু হয় দিনটি। ক্লাবের পতাকা উত্তোলন এবং প্রতিষ্ঠা দিবসের বিশেষ কেক কেটে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন কর্তারা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন ফুটবলার, ক্লাব আধিকারিক, অ্যাকাডেমির ফুটবলার, সদস্য এবং অসংখ্য সমর্থক। সন্ধ্যায় সেই উৎসব আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে নজরুল মঞ্চে। রীতি মেনে প্রজ্বলিত হয় ইস্টবেঙ্গল দিবসের প্রদীপ। উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক দিলীপ ঘোষ, ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ-সহ একাধিক প্রাক্তন ফুটবলার। এসেছিলেন টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও। অনুষ্ঠানে যোগ দেন দলের হেডকোচ আন্তোনিও হাবাসও। সেখানে নিজের প্রাক্তন ছাত্র অর্ণব মণ্ডলের সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময় করতে দেখা যায় তাঁকে। উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র দলের সকল ফুটবলার। মঞ্চে উঠতেই সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে ভেসে যান তাঁরা।
অভিনেতা প্রসেনজিৎকে স্মারক তুলে দিচ্ছে কোচ হাবাস। ছবি অমিত মৌলিক।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত করা হয় গায়ক রূপঙ্কর বাগচি, অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়কে। প্রসেনজিতের হাতে সুপার অ্যাচিভার অ্যাওয়ার্ড তুলে তুলে দেন হাবাস। তবে সন্ধ্যার সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত তৈরি করেন ক্লাব সভাপতি মুরারি লাল লোহিয়া। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি পড়শি ক্লাবকে কটাক্ষ করে বলেন, "যতই তুফান আসুক, নৌকা ডুবে যাবে, কিন্তু মশাল জ্বলতে থাকবে!" একই সঙ্গে হাবাসের উপর আস্থা রেখে তাঁর দাবি, স্প্যানিশ কোচের হাত ধরেই আগামী দিনে আরও একাধিক ট্রফি জিতবে ইস্টবেঙ্গল। তাছাড়া ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ বলেন, "শুধু আইএসএল নয়, ইস্টবেঙ্গল সব লিগ এবং ট্রফি জিতুক।"
ক্লাবের তরফে ভারত গৌরব সম্মান দেওয়া হল বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সঞ্জীব সান্যাল ও সুরকার প্রীতম চক্রবর্তীকে। পাশাপাশি তাঁদের আজীবন সদস্যপদ দিল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। সম্মান পেয়ে সঞ্জীব সান্যাল বলেন, "এই পুরস্কার আমি ছোটবেলার বন্ধু নীলাদ্রি মজুমদারকে উৎসর্গ করতে চাই। কারণ ও আমাকে ৫০ বছর ধরে মোহনবাগানের ফ্যান বানানোর চেষ্টা করেছিল।" প্রীতম বলেন, "আমার পরিবারের সঙ্গে লাল-হলুদ রংটা মিশেছিল। ইস্টবেঙ্গল ছিল আমাদের জীবন, আমাদের আবেগ, আনন্দ এবং কখনও কখনও গভীর মনখারাপের বড় অংশ। ছোটবেলায় কখনও ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ কখনও মিস করিনি। কখনও মাঠে গিয়ে দেখেছি, কখনও রেডিওয় কান পেতে শুনেছি। তখন পাড়ায় একমাত্র বাড়িতে টেলিভিশন ছিল। দলের খেলা দেখতে জানলায় ঝুলে ঝুলে ম্যাচ দেখেছি। আজকের প্রজন্মের কাছে এসব বিশ্বাস করা কঠিন। তবে এভাবে ম্যাচ দেখার আনন্দ টেলিভিশনের সামনে আরাম করে ম্যাচ দেখার আনন্দের চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না। ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ ছিল উৎসব। দল জিতলে বাবা ইলিশ নিয়ে আসতেন বাড়িতে।" জানালেন, পাড়ার প্রতিযোগিতায় ছোটবেলায় লাল-হলুদ জার্সি পরে খেলতেন। ইস্টবেঙ্গলের প্রতি ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের জন্য থাকবে। এরপর তিনি 'তুহি মেরি সব হে, সুবাহ হে, তুহি দিন হ্যায় মেরা' গান গেয়ে শোনালেন।
লাল-হলুদের মঞ্চে দিলীপ ঘোষ। ছবি অমিত মৌলিক।
এছাড়াও এক্সেলেন্স ইন মুভি অ্যাওয়ার্ড পেলেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। ক্লাবের পক্ষ থেকে জীবনকৃতি সম্মান পান বলাই মুখোপাধ্যায় ও তরুণ দে। সেরা সাংবাদিক পুরস্কার পেলেন বিক্রান্ত গুপ্তা। সেরা চিত্রসাংবাদিক শঙ্কর দাস নাগ। বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত আনোয়ার আলি ও সাথী দেবনাথ। সেরা কোচের সম্মান পান বিনো জর্জ। এমার্জিং প্লেয়ারের পুরস্কার উঠল এডমুন্ড লালরিনডিকার হাতে। প্রাইড অফ বেঙ্গল পেলেন সুরঞ্জনা রাউল।। সেরা ক্রিকেটার পুরস্কার ঋতম পোড়েলের। সেরা রেফারি দু’জন সম্মান ভোলানাথ দত্ত ও পীযূষ রায়ের। সেরা সমর্থক হিসাবে সম্মানিত হলেন মনোময় ভট্টাচার্য, কল্পনা চক্রবর্তী, শ্যামল মজুমদার, মাস্টার ঋজু দাস। সব মিলিয়ে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান দেখলেন নজরুল মঞ্চে উপস্থিত দর্শকরা।
