৭৯০০ মাইল দূরের কলকাতা শহরের ডার্বি ঘিরে যে খোদ নিউ জার্সিতে এই পর্যায়ের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, স্বচক্ষে না দেখলে সত্যিই জানতে পারতাম না। আপনি বলতেই পারেন, কলকাতায় বসেও তো ম্যাঞ্চেস্টার ডার্বি নিয়ে আমরা উত্তেজনা দেখি। অথবা লা লিগার এল ক্লাসিকো নিয়ে তো একই উত্তেজনা। তাহলে কলকাতা ডার্বি নিয়ে খোদ আমেরিকায় উত্তেজনা থাকলে অস্বাভাবিক কেন মনে হবে?
অস্বাভাবিকতা এই জন্যই যে, ফিফা ক্রমপর্যায়ে ভারতীয় ফুটবল এখন ১৩৮ নম্বরে দাঁড়িয়ে। আর সেই দেশের একটি ক্লাবের টানে কীভাবে ২৫ জুলাই মরশুমের প্রথম ডার্বি সেলিব্রেট করা হবে, তারজন্য রীতিমতো প্রস্তুতি চলছে এখানকার ইস্টবেঙ্গল ফ্যান ক্লাবের মধ্যে।
তাহলে একটু খুলেই বলি। প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে নিউ জার্সিতে একটি সংস্থা রয়েছে, ‘উত্তেজনা।’ যেখানে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান দু’পক্ষের সমর্থকরাই রয়েছে। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের সংখ্যা সেখানে একশো মতো হলে, মোহনবাগানেরও সমর্থক সংখ্যা রয়েছে প্রায় পঁচিশ-তিরিশজন। একত্রে সারা বছর ধরে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের খেলাধুলোর আয়োজন করলেও, ডার্বির দিন এঁরা সম্পূর্ণ আলাদা। তখন একদম লড়াই সমানে-সমানে। প্রায় একশোর উপর লাল-হলুদ সমর্থক কলকাতা থেকে ৭৯০০ মাইল দূরে থাকলে কী হবে, ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের-দলের প্রতিটি খবর পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে রাখেন। আমেরিকার ব্যস্ত জীবনের পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গলের প্রতিদিনকার আপডেট এঁদের কাছে মরুভূমিতে মরুদ্যানের মতো। তবে এঁরা শুধুই যে সমর্থক এরকম নয়। নিউ জার্সির লাল-হলুদ ফ্যান ক্লাবের মধ্যে আবার দশজন মতো ইস্টবেঙ্গলের সদস্যও রয়েছেন। এডিসনে থাকা পিনাকী কিংবা ফিলাডেলফিয়ায় থাকা শুভ্র গুপ্ত দু’জনেই ইস্টবেঙ্গলের সদস্য। কলকাতায় গেলে সদস্য গ্যালারিতে বসে খেলাও দেখেন। দু’জনেই আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, “এত দূরে থাকি বলে শুধু ক্লাবের ভোটটাই যা দেওয়া হয় না।”
এভাবেই বেঁধে বেঁধে থাকেন লাল-হলুদ সমর্থকরা। থাকেন মোহনবাগানিরাও।
২৫ জুলাই ডুরান্ড কাপের ডার্বি দিয়ে এবারের মরশুম শুরু করছে ইস্টবেঙ্গল। ফলে এখানকার লাল-হলুদ ফ্যান ক্লাব ঠিক করেছে, সবাই মিলে একসঙ্গে ম্যাচটা দেখবেন। পিনাকী, শুভ্র দু’জনেই জানালেন, এখানে প্রতি বছর ধুমধাম করে ‘ইস্টবেঙ্গল ডে’ পালিত হয়। ৬ বছর আগে যখন লাল-হলুদের শতবর্ষ হল, এখানে নানাভাবে তা উদযাপন করেছিলেন আমেরিকার প্রবাসী ইস্টবেঙ্গল সদস্য-সমর্থকরা। এখন ডালাসে থাকলেও, তখন নিউ জার্সির কাছাকাছি অঞ্চলে থাকতেন মাইক ওকোরো। তাঁকে নিয়ে এসে সেই সময় ইস্টবেঙ্গলের পতাকা উত্তোলন করানো হয়েছিল। সঙ্গে খোঁজ নিয়ে জানা যায় আমেরিকাতেই অন্য স্টেটে আছেন বোলাজি। যিনি একটা সময় ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলেছিলেন। মাইক ওকোরোর সঙ্গে বোলাজিকেও নিয়ে আসা হয় ইস্টবেঙ্গলের শতবর্ষ উদযাপনে।
নতুন স্পনসরে যখন যেমন জার্সি হয়েছে, নিউ জার্সির প্রত্যেকের কাছে তা থাকা বাধ্যতামূলক। এঁরা শুধুই ম্যাচ ডে-তে লাল-হলুদ জার্সি পরে খেলা দেখেন, এরকমটা নয়। রেস্তরাঁয় খেতে পর্যন্ত যান ইস্টবেঙ্গল জার্সি পরে। প্রিনস্টনে থাকেন অম্লান রায়। বেহালার অম্লানবাবু ছাব্বিশ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। এখানে থাকলে কী হবে, তিনি বার্সোলোনা ক্লাবের সদস্য। পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকলে কথাই নেই। বলছিলেন, “সারাদিনের চাকরি পর আমাদের ভালোবাসা, কলকাতার ফুটবল। শুধু আক্ষেপ, দেশের ফুটবলটা একটু এগোলো না।” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চপদে চাকরি করা পিনাকীবাবু তো ক্লাবের টানে এতদূর থেকে গোয়া চলে গিয়েছিলেন সুপার কাপ দেখতে।
কিন্তু ক্লাবের সঙ্গে কি কোনও ভাবে যোগাযোগ রয়েছে আমেরিকাতে ইস্টবেঙ্গলকে বাঁচিয়ে রাখা এই প্রবাসী বাঙালিদের? শুভ্র বললেন, “না, আমাদের সঙ্গে ক্লাব বা অন্য ফ্যান ক্লাবদের সেরকম কোনও যোগাযোগ নেই। তবে কলকাতায় গেলে ক্লাব মাঠে বা যুবভারতীতে খেলা দেখতে যেতেই হবে।”
ওকোরোদের নিয়ে ইস্টবেঙ্গল দিবস পালনের দিন।
তবে সবচেয়ে ভালো দিক, এখানকার লাল-হলুদ ফ্যান ক্লাবের সদস্যরা তাঁদের পরিবারকেও ‘ইস্টবেঙ্গল’ নামের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেছেন। ‘ইস্টবেঙ্গল ডে’-তে পরিবারের সদস্যদের নিয়েই বিভিন্ন খেলাধুলো, খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়। আর শুধুই ফুটবল নয়। বেসবল, রাগবি, আমেরিকান ফুটবল, সব খেলার আয়োজন করে এই ‘উত্তেজনা’। যেখানে আবার মোহনবাগান সমর্থকরাও রয়েছেন। মোহনবাগান বলে আলাদা রাখা এরকম ব্যাপার নয়। হয়তো ২৫ জুলাইয়ে মরশুমের প্রথম ডার্বি সবাই একসঙ্গে বসেই দেখবেন।
কলকাতাতে এখন নতুন জেনারেশন যেভাবে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ভুলে ইপিএল আর লা লিগার ক্লাবগুলির সমর্থক হয়ে যাচ্ছে, আমেরিকায় কিন্তু পুরোপুরি উলটো। অর্থ, বৈভব, প্রাচুর্য সব কিছুতে কয়েক যোজন এগিয়ে থাকার পরেও নিজেদের অতীতকে ভুলে যাননি এঁরা। প্রিন্সটনে থাকা সুপ্রিয় কিংবা অম্লানবাবু বলছিলেন, “বাংলায় থাকা যে কোনও বাঙালির থেকে এখানে আমরা বাংলা ভাষা, সাহিত্য, বাংলার ক্লাব সব কিছুকে বোধহয় একটু বেশি করেই বাঁচিয়ে রাখি। আমরা বাঙালি। সেটাই আমাদের পরিচয়। তাই আমাদের পরের প্রজন্মও ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান এই দুই ক্লাব আমাদের আবেগে কতটা জড়িয়ে, ভালো জানে।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পিনাকী, শুভ্রদের ইস্টবেঙ্গলের রাজত্বে, সুপ্রিয়া কিন্তু পাঁড় মোহনবাগানি।
