বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) চার ম্যাচে চার গোল। গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচেই সেরার তকমা। রাউন্ড অফ ৩২-এর ম্যাচেও নজরকাড়া পারফরম্যান্স। আবার মাঝে অযথা ঝুটঝামেলাতেও জড়াচ্ছেন না। নেই প্রতিপক্ষ ফুটবলারের সঙ্গে বচসা বা হাতাহাতির কোনও প্রসঙ্গও। প্রিকোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিরুদ্ধে নামার আগেও চর্চায় তিনি।
ব্রাজিলের জার্সিতে যেন নতুন রূপে পাওয়া যাচ্ছে ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে (Vinicius Junior)। এতদিন জাতীয় দলের হয়ে বলার মতো পারফরম্যান্স ছিল না তাঁর। বলা হত, ভিনিসিয়াসের যাবতীয় কেরামতি রিয়াল মাদ্রিদেই সীমাবদ্ধ। ক্লাবের গণ্ডির বাইরে এলেই ‘সুপারহিরো’ থেকে সাধারণ মানুষে পরিণত হন তিনি। কিন্তু মার্কিন মুলুকে ফুটবল-যুদ্ধের ময়দানে যেন পাওয়া যাচ্ছে অন্য ভিনিসিয়াসকে। যেখানে তিনি সেলেকাও ক্যানারিনহোর সাধারণ কোনও সৈনিক নন। বরং নেইমারের অনুপস্থিতিতে ভিনিই সেনাপতি। যাঁর নেতৃত্বে একটার পর একটা বাধা পার হচ্ছে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। আর ভিনির ভোলবদলের কৃতিত্ব যাচ্ছে কোচ কার্লো আন্সেলোত্তির ঝুঁলিতে। অতীতে ইতালিয়ান কোচের আমলেই রিয়ালে মহাতারকা হয়ে উঠেছিলেন ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার। এল ক্লাসিকোর বিধ্বংসী হ্যাটট্রিক থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মহাকাব্য- ভিনির প্রথম সবকিছু এসেছে ‘ডন’ কার্লোর দেখানো পথে হেঁটেই। ফলে এবার জাতীয় দলে সেই গুরুর উপস্থিতি বদলে দিয়েছে শিষ্যের পারফরম্যান্স। তবে ভিনির এই উন্নতির নেপথ্যে ইটালিয়ান কোচ একাই ফ্যাক্টর, তা নয়। আছেন আরও একজন। যাঁর প্রভাবের কথা উদাত্ত কণ্ঠে স্বীকার করেন স্বয়ং আন্সেলোত্তি। তিনি, মারিসা সান্তিয়াগো।
ভিনির এই উন্নতির নেপথ্যে ইটালিয়ান কোচ একাই ফ্যাক্টর, তা নয়। আছেন আরও একজন। যাঁর প্রভাবের কথা উদাত্ত কণ্ঠে স্বীকার করেন স্বয়ং আন্সেলোত্তি। তিনি, মারিসা সান্তিয়াগো।
মারিসা পেশায় মনোবিদ। পাশাপাশি ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অফ মিনাস গেরাইসের থেকে ক্রীড়াবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতোকত্তরও করেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই ব্রাজিলের বিভিন্ন খেলার সঙ্গে যুক্ত তিনি। যার মধ্যে ফুটবল ছাড়াও রয়েছে টেনিস বা বাস্কেটবলের মতো খেলা। মিনাস টেনিস ক্লাব, অ্যাটলেটিকো মিনেইরো, বাহিয়া, ক্রুজেইরো বা গ্রেমিওর মতো ক্লাবে কাজ করেছেন তিনি। বছর দু’য়েক আগে ডোরিভাল জুনিয়রের আমলে মারিসার আগমন হয় ব্রাজিল ড্রেসিংরুমে। তবে তাঁকে পুরোদমে কাজে লাগানো হয় আন্সেলোত্তি আসার পর। সাধারণ মনোবিদ হিসেবে ফুটবলারদের মানসিক চাপ কমানোই মারিসার একমাত্র কাজ নয়। বরং কীভাবে তাঁদের পারফরম্যান্স আরও ভালো করা যেতে পারে, সেদিকেও নজর থাকে তাঁর। মারিসা কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপিতে বিশেষজ্ঞ। এর মাধ্যমে মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ এবং আচরণের মধ্যে সংযোগ খুঁজে বার করা হয়। ব্রাজিল ফুটবলারদের উন্নতির ক্ষেত্রে এই থেরাপি কাজে লাগিয়েছেন মারিসা। যার ফলে মাঠে একদিকে উন্নতি হয়েছে ভিনিসিয়াসের পারফরম্যান্সে। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে অযথা লড়াইয়ের প্রবণতাও কমেছেন সাম্বা উইঙ্গারের। দলের ভোলবদলে মারিসার ভূমিকার কথা শোনা গিয়েছে আন্সেলোত্তির মুখেও।
প্রতিপক্ষের সঙ্গে অযথা লড়াইয়ের প্রবণতাও কমেছেন সাম্বা উইঙ্গারের। দলের ভোলবদলে মারিসার ভূমিকার কথা শোনা গিয়েছে আন্সেলোত্তির মুখেও।
“মারিসা আমাদের সঙ্গে দারুণ কাজ করছেন। এখন আমাদের ফুটবলাররা অনেক বেশি শান্ত এবং মনযোগী। মাঠে নেমে অনেকটাই গুছিয়ে পারফর্ম করে ওরা,” বলে দিয়েছেন আন্সেলোত্তি। বিশেষত মরক্কোর বিরুদ্ধে ড্রয়ের পর সমালোচনায় জর্জরিত দলকে মানসিকভাবে চাঙা করতে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন মারিসা। যিনি ড্রেসিংরুমে ফুটবলারদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “পারফরম্যান্স ভালো হলে, প্রশংসা হবে। পারফরম্যান্স খারাপ হলে, সমালোচনা হবে। এর মাঝামাঝি কিছু হয় না। অতএব, পারফরম্যান্সের দিকে মন দিতে হবে। কে কী বলছে, তা শুনলে চলবে না।” ব্রাজিল শিবির সূত্রে খবর, মারিসার সেই ভাষণ অনেকটাই বদলে দেয় ফুটবলারদের মানসিকতা।
কীভাবে কাজ করেন এই মনোবিদ? মারিসার বিশ্লেষণ, “আমরা গ্রুপ ডিসকাশন করে। নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলি। ফুটবলারদের দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, চাপ কমানোর উপর নজর দিই। এই বিষয়গুলো একজন প্লেয়ারের পারফরম্যান্সের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সেটা যাতে না হয়, তা নিয়ে আমরা সতর্ক থাকি। ফুটবলারদের মানসিক সমস্যা খুঁজে তার চিকিৎসা করাটা আমাদের লক্ষ্য না। বরং পুরো মনযোগটাই থাকে পারফরম্যান্সের উপর।” আর মারিসা সান্তিয়াগো যে সেই কাজে সফল, তা স্পষ্ট বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পারফরম্যান্সেই। উল্লেখ্য, আর্লিং হালান্ডের দলের বিরুদ্ধে নামার আগে সমর্থকদের মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, কোচ আন্সেলোত্তি কি ভিনিসিয়াস ও নেইমারকে জুটি হিসাবে খেলাবেন? সময়ই এর উত্তর দেবে।
