দুই সমান্তরাল রেখা কি মেলে? অঙ্কের হিসেব বলে মেলে না। কিন্তু জীবন তো সবসময় অঙ্কের নিয়মে চলে না। এক বিন্দু থেকে শুরু করে দুটি রেখা একসঙ্গে চলতে চলতে মিলে যায়। সাফল্য-ব্যর্থতায় আলাদা করা যায় না কোনটা কে? অনেকটা এরকমই গল্প ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড ও রুড গুলিটের। নেদারল্যান্ডসের দুই কিংবদন্তির বাবারা ছিলেন ফুটবলার। দু'জনেই উদ্বাস্তু। জীবন-জীবিকার টানে দু'জনে ভেসে এসেছিলেন নেদারল্যান্ডসে। তারপর পথ আলাদা হয়ে গেলেও মিলিয়ে দিল ফুটবল। দুই উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান মাঠে-মাঠের বাইরে ছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু। জুটিতে বিশ্বের প্রায় সব ট্রফিই জিতেছেন। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের বিশ্বকাপ (FIFA World Cup) 'অভিশাপ' তাঁদেরও ছাড়েনি।
জেরার্ড গুলিট ও হার্নান রাইকার্ড- জন্ম, বড় হওয়া সুরিনামে। তখন আফ্রিকার দেশটি ছিল নেদারল্যান্ডসের উপনিবেশ। দু'জনেই সুরিনামের সেরা ক্লাবে খেলতেন। দু'জনেই স্ট্রাইকার। অভিন্নহৃদয় বন্ধু। তারপর জীবনের টানে হয়ে গেলেন ছিন্নমূল। সেটাও একসঙ্গে। কিন্তু নেদারল্যান্ডসে এসে দুই বন্ধুর পথ আলাদা হয়ে গেল। হার্নান একাধিক ক্লাবে পেশাদারভাবে ফুটবল খেলেন প্রায় ৭ বছর। যথেষ্ট সফলও হন। কিন্তু জেরার্ড ফুটবল নয়, কেরিয়ার খুঁজে নিলেন অর্থনীতির শিক্ষকতায়। ১৯৬২ সালে একমাসের আগে-পরে জন্মায় দুই বন্ধুর দুই ছেলে।
তখনও নেদারল্যান্ডসে সেভাবে অভিবাসীর ঢেউ শুরু হয়নি। এখন যেমন মরক্কো ফুটবল দলের অনেকেরই জন্ম নেদারল্যান্ডসে। বিশ্বকাপে সেই মরক্কোই হারিয়েছে ভার্জিল ভ্যান ডাইককে। সবাইকে চমকে দেওয়া কেপ ভার্দে বা কুরাসাওয়ের হাজার হাজার মানুষ নেদারল্যান্ডসে থাকেন। কিন্তু গত শতাব্দীর সাতের দশকে কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসী হিসেবে সেদেশে জীবন কাটানো যথেষ্ট কঠিন ছিল। গুলিট স্বীকার করেছিলেন, "সুরিনাম থেকে আমার বাবার প্রজন্মই প্রথম নেদারল্যান্ডসে আসে। স্কুলে আমিই একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার ছিলাম। তাই আমাকে ভালো হয়ে থাকতে হত।" রুড গুলিটের কেরিয়ার শুরু হয়েছিল ডিফেন্ডার হিসেবে। তখন ছিল 'টোটাল ফুটবলে'র যুগ। তাই গুলিট ডিফেন্স থেকে একাধিক ফুটবলারকে কাটিয়ে গোল করে আসার স্বাধীনতা পেতেন। এদিকে ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড কেরিয়ার শুরু করেন তাঁর বাবার ক্লাবে। তবে এখানেও ফের বন্ধুত্ব জেতে। গুলিটের ডাকে রাইকার্ডও যোগ দেন ডিডব্লুএস ক্লাবে।
দু'জনে তখন শত্রু ক্লাবে
সেই শুরু। দুই বন্ধু যখন মাঠে নামতেন, তখন অনেকেই গুলিয়ে ফেলতেন। সেটা অবশ্য চেহারার জন্য। দু'জনের খেলার ধরন যদিও আলাদা। গুলিট অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। বল তাঁর পায়ে নাচে, কথা শোনে। ডিফেন্ডার হিসেবে শুরু করলেও গোল করার দক্ষতা ক্রমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেখানে রাইকার্ড খেলার আগে অঙ্ক কষেন। কোথায় কী হবে, তা যেন তাঁর মুখস্থ। আর কোনও কিছু যদি হিসেবের বাইরে চলে, তখন কাজে লাগবে তাঁর শক্তিশালী চেহারা ও স্কিল। গুলিটের মতো ততটা না হলেও তাঁরও নামডাক ছড়াতে লাগল ডিফেন্ডার হিসেবে। কিন্তু ফুটবলের টানেই ফের দুই বন্ধু আলাদা হয়ে গেলেন।
এসি মিলানের জার্সিতে গুলিট ও রাইকার্ড
আসলে আয়াক্স আমস্টারডামের মতো বড় ক্লাব দু'জনকেই দলে পেতে চেয়েছিল। আর সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেও বেশি দেরি হয়নি। আয়াক্সের প্রথম লক্ষ্য ছিল রাইকার্ড। সেই ফাঁকে গুলিটকে সই করিয়ে নেয় হারলেম। যেখান থেকে চলে আসেন আয়াক্সের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব ফেয়েনুর্ড ও পিএসভি আইন্দোহেভেনে। এর প্রায় ৮ বছর পর দুই বন্ধু একত্রিত হন এসি মিলানে। যেখানে স্বপ্নের ৫ বছর একসঙ্গে কাটিয়েছেন গুলিট-রাইকার্ড। সিরি আ, সুপার কাপ, ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সব একসঙ্গে জিতেছেন। সেখানে তাঁদের সঙ্গী হন আরেক ডাচ তারকা। তাঁর নাম মার্কো ভ্যান বাস্তেন। তিনজনে তখন ইউরোপ শাসন করেছেন বললে ভুল বলা হয় না।
রুড গুলিট, ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড ও মার্কো ভ্যান বাস্তেন। ফাইল ছবি
যাই হোক, নেদারল্যান্ডসের জার্সিতে একসঙ্গে বহু বছর খেলেছেন গুলিট ও রাইকার্ড। ১৯৮১ সালে একই ম্যাচে অভিষেক হয় দু'জনের। রাইকার্ডের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন গুলিট। মজার বিষয়, দু'জনের চেহারায় তখন এত মিল যে, ধারাভাষ্যকার এই বদল খেয়ালই করেননি। ১৯৮৮ সালে দু'জনের দাপটে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয় নেদারল্যান্ডস। আজও তাদের ঝুলিতে ওই একটাই ট্রফি আছে। ১৯৯০-এর বিশ্বকাপের অন্যতম হটফেভারিট ছিল ডাচরা। কেনই বা হবে না? রাইকার্ড, গুলিট, বাস্তেন, রোনাল্ড কোম্যান কে ছিলেন না সেই দলে। কিন্তু গ্রুপ পর্বে একেবারেই ভালো খেলতে পারেনি নেদারল্যান্ডস। যাত্রা থামে শেষ ষোলোয়। পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ম্যাচের মাত্র লাল কার্ড দেখেন রাইকার্ড। তুলনায় শান্ত বলে যিনি পরিচিত ছিলেন, সেই রাইকার্ডই সেদিন বিপদ বাঁধান। লাল কার্ড দেখেছিলেন পশ্চিম জার্মানির রুডি ভলারও। তাঁকে উদ্দেশ্য করে থুতু দিয়েছিলেন রাইকার্ড।
ভলারকে থুতু ছেটানোর সেই বিতর্কিত মুহূর্ত।
সেই দল নিয়েও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি নেদারল্যান্ডস। এরপর সবচেয়ে ভালো সুযোগ আসে ২০১৪ সালে। সেবার আর্জেন রবেন, ওয়েসলি স্নেইডাররা ফাইনালে স্পেনের কাছে হারেন। আর এবার রাউন্ড অফ ৩২-এ মরক্কোর কাছে হেরে বিদায়। নেদারল্যান্ডস কখনও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি ঠিকই, কিন্তু বহু কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছে। গুলিট-রাইকার্ডরা সেই তালিকাতেই পড়েন। দুই উদ্বাস্তু বাবার বন্ধুত্ব পূর্ণতা পেয়েছিল ছেলেদের মধ্যে। বিশ্বকাপ না জিতলেও ফুটবলে মাঠের বাইরে গল্প কমে না।
