আর্জেন্টিনা ৩ (মেসি হ্যাটট্রিক)
আলজেরিয়া ০
ক্যানসাস সিটির পশ্চিমে লরেন্স শহর। সেখানে আলজেরিয়ার (Algeria) বিশ্বকাপ-ক্যাম্প। কিন্তু কে জানত বিদেশ-বিভুঁইয়ে এসে দ্বিতীয় ঘর পেয়ে যাবে ভ্লাদিমির পেতকোভিচের দল। ৫০০ থেকে ৬০০ সমর্থক হোটেলে তাঁদের স্বাগত জানাতে হাজির হয়েছিলেন। সেই শুরু। এরপর ট্রেনিং ক্যাম্পে এসে দলকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। আর্জেন্টিনার (Argentina) বিরুদ্ধে তাঁদের পাশে চেয়েছিলেন কোচ। চাইবেন নাই বা কেন? ততক্ষণে স্পেন ম্যাচে কেপ ভার্দের লড়াই দেখে ফেলেছে গোটা বিশ্ব। সেখান থেকে প্রেরণা নিয়ে আবারও অঘটন ঘটানোর স্বপ্ন বোনা। কিন্তু প্রতিদিন তো আর অঘটন হয় না। আর্জেন্টিনাকে হারানোর স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে গেল তাদের। কারণ, লিওনেল মেসি নামক এক অতিমানব। দেশের হয়ে ২০০তম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে তিনি ফের একবার বুঝিয়ে দিলেন, বয়স বাড়লেও বুড়িয়ে যাননি।
৩-০ জয় দিয়ে বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) অভিযান শুরু করল গতবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ম্যাচ ঘিরে ক্যানসাস সিটিতে আগে থেকেই উৎসবের আমেজ ছিল। হাজার হাজার সমর্থক ভিড় জমিয়েছিলেন। রাস্তায় রাস্তায় সমর্থকদের র্যালি চোখে পড়েছে। এদিন তো তাঁদের পোয়াবারো। দলের দুরন্ত জয়ে নির্ঘাত তাঁরা র্যালি করেই স্লোগান দিতে দিতে, গান গাইতে গাইতে ফিরবেন। মনে রাখতে হবে, এবারের বিশ্বকাপ লিওনেল মেসির কাছে অন্যরকম। টানা ছ’বার ফুটবলের মহা-আসরে তিনি। কিন্তু প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যাঁর কাঁধেই শিরোপা রক্ষার বড় দায়িত্ব। কেমন খেললেন তিনি? এককথায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন। অথচ প্রথম একাদশে থাকবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি শুরু থেকেই মাঠে নামালেন অধিনায়ককে। স্কালোনির পরিকল্পনা ছিল, ম্যাচের শুরুতেই গোল করে এগিয়ে যেতে। কোচের সিদ্ধান্ত যে পুরোপুরি সার্থক, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানেই শেষ নয়। গোটা মাঠজুড়ে খেললেন তিনি। আলজেরীয় ডিফেন্ডারদের কড়া নজরবন্দি এড়াতে এক জায়গায় আটকে থাকেননি। কখনও মাঝমাঠে নেমে এসে খেলা গড়ে তুলছেন। আবার কখনও আক্রমণভাগে উঠে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়েছেন। বল পায়ে পেলেই দেখা গিয়েছে চোরা গতি।
প্রথম গোলের পর মেসি। ছবি সংগৃহীত।
প্রথম ১০ মিনিটের মধ্যে বাতিল হল জোড়া গোল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে। লাউতারো মার্টিনেসের বাড়ানো পাস থেকে বল পেয়ে গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে বল জালে পাঠান মেসি। আর্জেন্টিনা শিবিরে তখন উল্লাস শুরু হয়ে গেলেও সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টেকেনি। সহকারী রেফারি অফসাইডের পতাকা তোলেন। ৮ মিনিটে প্রত্যাঘাত আলজেরিয়ারও। মাজার বাড়ানো থ্রু বল থেকে এমি মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন চেইবি। সেই গোলও অফসাইডে বাতিল। তবে শুরুতে আর্জেন্টিনার খেলা দেখে মন ভরেনি। মাঝমাঠ সেভাবে জমাট বাঁধেনি শুরুতে। কিছুটা ছন্নছাড়া মনে হওয়া আর্জেন্টিনাকে চাগিয়ে তোলার দায়িত্ব নিলেন স্বয়ং মেসি। যাঁকে আটকাতে আলজেরিয়ার কোচ দুই ডিফেন্ডারকে রেখেছিলেন। ফলে বেশিক্ষণ বল পায়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। তবে নিজের মতো করেই সমাধান খুঁজে নেন। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে কিছুটা এগিয়ে যান। বক্সে ঢোকার চেষ্টা না করে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকেই বাঁ-পায়ের জোরাল শট। গোলরক্ষক লুকার হাতে লাগলেও আটকাতে পারেননি। ১৭ মিনিটে এই দৃষ্টিনন্দন গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আকাশি-সাদা জার্সিধারীরা। পিছিয়ে পড়লেও লড়াই থেকে পিছিয়ে আসেনি আলজেরিয়া। যদিও আর্জেন্টাইন ডিফেন্স ভাঙতে পারেনি তারা। ১-০ লিড নিয়ে বিরতিতে যান মেসি-মার্টিনেজরা।
মেসি ম্যাজিকে স্বপ্নের শুরু আর্জেন্টিনার। ছবি সংগৃহীত।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই প্রতি আক্রমণ বেশ কিছু সুযোগ তৈরি করেছিল আর্জেন্টিনা। ডানদিকে ফাঁকা জায়গায় বল পেয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন ডি পল। নিজে শট নিলেও তেকাঠিতে থাকত। তবে, মেসিকে পাস বাড়ান। যদিও সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ফলে ফাঁকা গোলের সুযোগ নষ্ট হয়। ৫৫ মিনিট নাগাদ জোড়া বদল আর্জেন্টিনা কোচের। লাউতারো মার্টিনেজ ও থিয়াগো আলমাডার জায়গায় নামলেন নিকোলাস গঞ্জালেজ ও জুলিয়ান আলভারেজ। তাতে আক্রমণের ধার বাড়ল। ৬০ মিনিটে সুযোগসন্ধানী স্ট্রাইকারের মতো গোল করে গেলেন এলএম ১০। এই আক্রমণ তৈরিই হয়েছিল মেসির পায়ে। ম্যাক অ্যালিস্টারের জোরাল শট কোনওক্রমে বাঁচান লুকা। ফিরতি বল থেকে গোল করে ব্যবধান বাড়ান মেসি। এর ১০ মিনিট পর বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিকও করলেন। সব মিলিয়ে ১১টা আন্তর্জাতিক হ্যাটট্রিক হয়ে গেল মেসির। বক্সের বাইরে নিখুঁত ফিনিশিং দেখল ফুটবলবিশ্ব। তৃতীয় গোল করে বিশ্বকাপে ১৬তম গোল করলেন মেসি। ফলে মিরোস্লাভ ক্লোজের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডও ছুঁয়ে ফেললেন। তৃতীয় গোলের পরই তাঁকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ। তাঁকে নিয়ে আর কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি স্কালোনি। এরপর আর্জেন্টিনার জয় ছিল স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। ৩-০ গোলে আলজেরিয়াকে হেলায় হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু হল আর্জেন্টিনার।
