লড়াইটা ছিল ২২ জনের। লড়াইটা ছিল ৯০ মিনিটের। কিন্তু সেই লড়াইয়ের নেপথ্যে কোথাও যে সাড়ে চার দশক পুরনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবচেতনে কাজ করছিল, সেটা স্পষ্ট হয়ে গেল ম্যাচের পরই। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড বধ করেই আর্জেন্টিনা ফুটবলাররা মাঠে টেনে নিয়ে এলেন ফকল্যান্ড প্রসঙ্গ। মাঠে বিতর্কিত পোস্টার নিয়ে উচ্ছ্বাসে মাতলেন জিয়োভানি লো সেলসো, নিকোলাস ওটামেন্ডিরা। যার জেরে শাস্তির মুখেও পড়তে পারে আর্জেন্টিনা।
বুধবার ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচের পর মাঠে রীতিমতো অনভিপ্রেত ছবি দেখা যায়। দুই পক্ষের ফুটবলাররা বিবাদে জড়ান। জটলা হয়। জুড বেলিংহ্যামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে আর্জেন্টিনার ফুটবলার ভ্যালেন্টিন বার্কোকে চড় মারার। সেসবের মাঝেই ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি উসকে একটি ব্যানার হাতে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন লে সেলসোরা। ওই ব্যানারে লেখা ছিল, "‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস।’ অর্থাৎ ‘মালভিনাস আমাদেরই।’ ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে আর্জেন্টিনায় মালভিনাস বলে ডাকেন। ম্যাচ চলাকালীন গ্যালারিতেও ওই একই পোস্টার দেখা যায়। এমনকী ম্যাচ চলাকালীনও আর্জেন্টিনা সমর্থকরা ওই স্লোগান দেন।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে প্রায় ৫০০-৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ স্বশাসিত এলাকা হলেও ১৮৩৩ সাল থেকে সেটা ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে। তবে আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, দ্বীপগুলি তাদের ভূখণ্ডের অংশ। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে ১৯৮২ সালে কড়া পদক্ষেপ করে বুয়েনস আইরেস। আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিওপোল্ড গালতিয়েরির নির্দেশে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালায় আর্জেন্টাইন সেনা। এর জবাবে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার দক্ষিণ আটলান্টিকে যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও সেনা পাঠান। টানা ৭৪ দিনের যুদ্ধের পর অবশেষে আত্মসমর্পণ করে আর্জেন্টিনা। ফকল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ থাকে ব্রিটেনের হাতেই। ভয়াবহ এই যুদ্ধে প্রায় ৬৫০ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সৈন্যর মৃত্যু হয়।
ম্যাচ শেষে ফকল্যান্ড নিয়ে বানার আর্জেন্টিনার। ছবি: সংগৃহীত।
এই ফকল্যান্ড যুদ্ধের আচঁ এসে পড়ে ১৯৮৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে। যুদ্ধের চার বছর পর ‘ফুটবল রাজপুত্র’ দিয়াগো মারাদোনা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কুখ্যাত সেই হ্যান্ড অফ গড গোলটি করেন। আবার দ্বিতীয় গোলটি করেন ৬ জনকে কাটিয়ে। যাকে বলা হয়, শতাব্দীর সেরা গোল। সাড়ে চার দশক পরে এসেও সেই যুদ্ধের আঁচ এসে পড়ল বিশ্বকাপে। তবে এবার শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে মেসির আর্জেন্টিনাকে। কারণ ফিফার নিয়ম বলছে, খেলার মাঠে কোনওরকম রাজনৈতিক পোস্টার বা ব্যানার প্রদর্শন নিষিদ্ধ। শেষ পর্যন্ত লে সেলসোদের শাস্তির মুখে পড়তে হয় কিনা সেটাই দেখার।
