তিনি না থেকেও আছেন। ভালোভাবেই আছেন। নাহলে জাপান ম্যাচ জিতে উঠেই সাংবাদিক সম্মেলনে ব্রাজিল কোচ আন্সেলোত্তিকে নেইমার (Neymar) নিয়ে এভাবে গ্লোবোর সাংবাদিকদের বাউন্সারের মুখে পড়তে হত না।
বিরতির সময় তখনও পিছিয়ে। হিউস্টনের স্টেডিয়ামের বড় স্ক্রিনে দেখা গেল, লকাররুম থেকে বের হওয়ার সময় রায়ান, ব্রুনোকে ধরে-ধরে বোঝাচ্ছেন তিনি। তিনি মানে এই দলটার অবিসংবাদী নেতা, নেইমার। ম্যাচে ফিরতে না পারলে, এই ম্যাচটাই তাহলে নেমারের জন্য বিশ্বকাপের ‘লাস্ট ডান্স!’ আর ছোঁয়া যাবে না অধরা মাধুরী?
দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর কিছুক্ষণ পরেই নেইমারকে ওয়ার্মআপ করানো শুরু। হিউস্টনের গ্যালারি তখন চান্টিং শুরু করেছে, ‘নেইমার..নেইমার। নেইমার…নেইমার..।’ তিনি তিতের মতো আবেগপ্রবণ নন। ইউরোপীয় রুক্ষ বাস্তবতায় গড়া অনমনীয় কার্লো আন্সেলোত্তি। কুনহার জায়গায়, নেমারকে মাঠে না নামিয়ে খেলালেন ১৯ বছরের এনড্রিককে!
কলকাতা থেকে তখন একের পর এক টেক্সট আসছে, ‘আচ্ছা, এই যে নেইমারকে (Neymar) দেখাল, তাহলে নেইমারকে নামাচ্ছেন না কেন?’ এরকম বহু প্রশ্ন। ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে শুধু ব্রাজিল কেন, বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের তরফে আন্সেলোত্তির জন্য এরকম ঝাঁকে ঝাঁকে প্রশ্ন আসবে না, এরকমটা ভাবাই অমূলক। ফলে নেইমারকে নিয়েই সাংবাদিক সম্মেলন শুরু করলেন ব্রাজিল কোচ। জানালেন, ম্যাচটা যদি কোনও কারণে, অতিরিক্ত সময়ে গড়াত, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তিনি নেইমারকে নামাতেন। কিন্তু মার্টিনেলির গোলটা হয়ে যাওয়ার পর আর দলের সিস্টেমটা আর পরিবর্তন করতে চাননি। কিন্তু মার্টিনেলি গোলটা না হলে নিশ্চিতভাবেই অতিরিক্ত সময়ে নেইমার মাঠে নামতেন।
কার্লো আন্সেলোত্তির সেই আইকনিক ভ্রু তোলা।
বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) নেইমার আর জাপান, প্রায় সমার্থক শব্দ হয়ে উঠেছে। পাঁচ ম্যাচে ৯ গোল। এহেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড মাঠের বাইরে বেঞ্চে। আর যখন ব্রাজিল ১ গোলে পিছিয়ে ! আসলে সেই মুহূর্তে ব্রুনো, ভিনিসিয়াসরা যে গতিতে জাপান বক্সে আক্রমণ শানাচ্ছিলেন, আন্সেলোত্তি জানতেন, ম্যাচ ফিটনেস না থাকা নেইমারের পক্ষে সেই গতিতে দলের সকলের সঙ্গে অপারেট করা সম্ভব হবে না। ফলে গোল না হলে অতিরিক্ত সময়ে নেইমারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটা ঝুঁকি না নিয়ে অন্য কোনও পথ খোলা ছিল না ব্রাজিল কোচের জন্য।
তবে এটাও ঠিক, দ্বিতীয়ার্ধে নেইমারকে ঠিক কখন নামানো উচিত, তা নিয়ে একটা সময় সত্যিই দ্বিধায় ভুগছিলেন ব্রাজিল কোচ। জানালেন, মাঠের ধারে নেইমার ওয়ার্মআপ করার সময়, তাঁর সঙ্গে একবার কথাও বলেছিলেন তিনি। তখন ভেবেছিলেন, ৬০-৬৫ মিনিটের দিকে নামিয়ে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করবেন। কিন্তু ততক্ষণে আবার কাসেমিরোর গোলের পর খেলাটা ব্রাজিলের পুরো নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। তাই ভাবনা ছিল, অতিরিক্ত সময়ে নামিয়ে দিয়ে একটা ফাটকা খেলবেন। তবে শেষ পর্যন্ত যে নেমারকে নিয়ে কোনওরকম পরীক্ষায় যেতে হয়নি, তার জন্য বারবার করে মার্টিনেলির প্রশংসা করছিলেন তিনি। ‘‘পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নেমে মার্টিনেলি যেভাবে ম্যাচের রং বদলে দিয়েছে, তারজন্য কোনও প্রশংসাই শেষ নয়। বেঞ্চে এরকম একজন গেমচেঞ্জার ফুটবলার থাকলে, যে কোনও কোচের জন্য পুরো পরিস্থিতিটাই অনেক সহজ হয়ে যায়।’’
গোলদাতা গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলির উচ্ছ্বাস। ছবি: সোশাল মিডিয়া
তবে যেভাবে পিছিয়ে থেকে আজ ফুটবলাররা ম্যাচ বের করে এনেছে, তারজন্য বারবার করে ফুটবলারদের প্রশংসা করে আন্সেলোত্তি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘‘এর দ্বারাই তো বোঝা যায়, আমাদের ফুটবলাদের মানসিক জোর কতটা।’’ শেষ ১৬-তে ব্রাজিলকে খেলতে হবে নরওয়ে অথবা আইভরি কোস্টের সঙ্গে। তবে এদিনই শেষ ১৬’র প্রতিপক্ষ নিয়ে কিছু ভাবতেই রাজি নন তিনি। বরং ধীরে সুস্থে প্রতিপক্ষ নিয়ে পরিকল্পনা করবেন। যেরকম দলের চোট থেকে সুস্থ হয়ে ফুটবলারদের নিয়েও শুরু থেকে কোনওরকম তাড়াহুড়ো করছেন না। বরং বিকল্প পরিকল্পনা সব সময় হাতে রাখছেন। নেমারের পর যেরকম রাফিনহাকে ধীরে-ধীরে ফিট করে তুলছেন।
ব্রুনো, ভিনিসিয়াসরা যে গতিতে জাপান বক্সে আক্রমণ শানাচ্ছিলেন, আন্সেলোত্তি জানতেন, ম্যাচ ফিটনেস না থাকা নেইমারের পক্ষে সেই গতিতে দলের সকলের সঙ্গে অপারেট করা সম্ভব হবে না। ফলে গোল না হলে অতিরিক্ত সময়ে নেমারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটা ঝুঁকি না নিয়ে অন্য কোনও পথ খোলা ছিল না ব্রাজিল কোচের জন্য।
তবে ব্রাজিল ফ্যানরা এসব শুনতে কেন রাজি হবেন? ম্যাচ শেষে হিউস্টন স্টেডিয়াম ছাড়ার সময়েও সমর্থকদের গলায় চলল সেই পরিচিত কোরাস, যা এখন ব্রাজিলের জাতীয় কোরাসে পরিণত হয়েছ, ‘নেইমার... নেইমার... নেইমার...।’
