বাবার স্বপ্ন ছিল নিজেদের একটা বাড়ি হবে। হুসেন পরিবার সেখানে সুখে-শান্তিতে থাকবে। কিন্তু ২০০৮ সালে একটা নারকীয় ঘটনা পুরো পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। আল কায়দা খুন করেছে বাবাকে। আইএসআইএস হত্যা করেছে দাদাকে। আর সেই পরিবারের আয়মেন হুসেন (Aymen Hussein) আজ বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) গোল করলেন ইরাকের হয়ে। আর্লিং হালান্ডের নরওয়ের বিরুদ্ধে ইরাক (Norway vs Iraq) জিততে পারেনি। হেরেছে ১-৪ গোলে। কিন্তু যুদ্ধের আতঙ্ককে জয় করে কামব্যাকের নয়া গল্প লিখলেন আয়মেন।
বস্টন স্টেডিয়ামে 'আই' গ্রুপের ম্যাচে শুরুতে এগিয়ে যায় নরওয়ে। ২৯ মিনিটে গোল করেন হালান্ড। ৩৯ মিনিটে আল-আম্মারির ক্রস থেকে মাথা ছুঁইয়ে ইরাককে সমতায় ফেরান আয়মেন। তবে সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৪ মিনিটের মধ্যে হালান্ডের গোলে ফের এগিয়ে যায় ইউরোপের দেশ। এরপর ৭৬ মিনিটে লিও ওস্টিগার্ড গোল করেন। আর ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে ইরাকের আত্মঘাতী গোলে নরওয়ের ব্যবধান আরও বাড়ে। সেই আত্মঘাতী গোলটিও এল আয়মেনের শরীরে লেগে।
৪০ বছর পর ফের বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করেছে ইরাক। আন্তর্মহাদেশীয় যোগ্যতা অর্জন পর্বে বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ছাড়পত্র পায় ইরাক। শেষ গোলটি এসেছিল আয়মেনের পা থেকেই। ইরাকের যুদ্ধ বিধ্বস্ত আল-হাজওয়া অঞ্চল তাঁর জন্ম। গুলি-বন্দুকের শব্দ, মৃত্যুর আর্তনাদ নিয়েই বড় হয়ে ওঠা। সেখান থেকে বাঁচার একমাত্র রাস্তা ছিল ফুটবল। ১২ বছর বয়সে বাবাকে হারান। বাবা ছিলেন ইরাকের সেনাবাহিনীতে। নিজের বাড়ি বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনছিলেন তিনি। সেই সময় আল কায়দা তাঁকে হত্যা করে।
আজও অসম্পূর্ণ রয়েছে সেই বাড়ি। প্রথম ম্যাচের আগে ফিফার একটি সাক্ষাৎকারে আয়মেন বলেছিলেন, "আমি আজও স্বপ্ন দেখি, টাকা জোগাড় করে গ্রামে গিয়ে বাবার তৈরি করা সেই বাড়ির কাজ শেষ করব।" কিন্তু হৃদয়ভঙ্গের গল্পটা শুধু বাবার মৃত্যুতে শেষ হয়নি। ফুটবল কেরিয়ার শুরুর পর মাকে বলেছিলেন গ্রাম ছেড়ে চলে আসতে। কিন্তু তাঁর মা রাজি হননি। একদিন জানতে পারেন, তাঁর দাদা উধাও হয়ে গিয়েছে। আর কোনও দিন তিনি ফিরে আসেননি। ওই অঞ্চল তখন ছিল আইএসআইএসের অধীনে। বাবার মতো দাদাও ছিলেন সেনাবাহিনীতে।
প্রথম ম্যাচের আগে ফিফার একটি সাক্ষাৎকারে আয়মেন বলেছিলেন, "আমি আজও স্বপ্ন দেখি, টাকা জোগাড় করে গ্রামে গিয়ে বাবার তৈরি করা সেই বাড়ির কাজ শেষ করব।"
দাদার হারিয়ে যাওয়ার পর ফুটবল খেলার সমস্ত উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন আয়মেন। ঠিক করেছিলেন, ফুটবল ছেড়ে দেবেন। সেই সময় কাঁধে ভরসার হাত রাখেন তাঁর মা। তিনি চেয়েছিলেন, আয়মেনের স্বপ্ন দেখা যেন বন্ধ না হয়। সেই স্বপ্নের পিছনে ছুটেই জায়গা পেয়েছেন ইরাক দলে। ডাক পেয়েছেন বিশ্বকাপে। এখন খেলেন ইরাকের ক্লাব আল কারমায়। ইরাকে তিনি পরিচিত 'মেসোপটেমিয়ার সিংহ' নামে। কিন্তু আমেরিকায় এসেও বিপদ। আমেরিকায় পা দেওয়ার পরই তাঁকে ৭ ঘণ্টার জন্য আটক করে রেখেছিলেন অভিবাসন দপ্তরের কর্তারা। তাঁর ফোন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হয়। কিন্তু ফুটবলের মজা এটাই! বাবা-দাদার মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে সফর শুরু। অবশেষে বিশ্বকাপে গোল। এবার নিশ্চয়ই নিজের বাড়িটাও সম্পূর্ণ করতে পারবেন আয়মেন।
