shono
Advertisement
Neymar FIFA World Cup 2026

হাইতি ম্যাচে নেইমারকে নামানোর চেষ্টা, মহাতারকাকে নিয়ে ক্ষোভ ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমে

নেইমার জুনিয়র। ৩৪ বছর বয়সে এসেও যাঁর চোট আর ড্রেসিংরুমের বাইরের 'মেডিকেল ড্রামা' এখনো পুরো ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে।
Published By: Anwesha AdhikaryPosted: 10:16 AM Jun 12, 2026Updated: 04:53 PM Jun 12, 2026

বিকেলের নিউ জার্সির হাওয়াটা এমনিতে বেশ মনোরম। ও শিরশিরে একটা ওমে মন জুড়িয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু মরিস্টাউনে ব্রাজিলের প্রাকটিস গ্রাউন্ডে পা রাখলে টের পাওয়া যাচ্ছে, হাওয়াটা আসলে বেশ গরম। মাঠের দিকে তাকালে চোখে পড়বে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের চিলতে হাসি কিংবা ক্রনো গিমারায়েদের ঘামঝরা খাটুনি। কিন্তু এই আপাত শান্ত ক্যানভাসের নিচে যে একটি তীব্র মনস্তাত্বিক যুদ্ধ চলছে, তা বোঝার জন্য ফুটবল পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই। তাতে সাম্বার চেনা ছন্দে টুর্নামেন্টের প্রথম বল গড়ানোর আগেই কিছুটা হলেও কর্কশ সুর লেগে গেছে। ব্রাজিলের সেই পুরনো নেইমার (Neymar)-নির্ভরতার আন্সেলোত্তির অভিযানে কি তবে শুরুতেই ভাঙন?

Advertisement

মরিস্টাউনের শিবিরে দাঁড়িয়ে যখন দেখছি, বল ছাড়াই সাইডলাইনের ধারে একাকী জগিং আর হালকা জিম সেশন করে যাচ্ছে, তখন চেনা চাদরটি নিমেষেই খসে পড়ে। হাঁ, তিনি নেইমার জুনিয়র। ৩৪ বছর বয়সে এসেও যাঁর চোট আর ড্রেসিংরুমের বাইরের 'মেডিকেল ড্রামা' এখনো পুরো ব্রাজিলের বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের চিরন্তন 'অস্বচ্ছতা'র রোগটা যে এবারও সারেনি, তা এই মরিস্টাউনের শিবিরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে। গত ১৭ মে যখন সান্তোসের জার্সিতে নেইমার মাঠ ছাড়লেন, ক্লাব কর্তৃপক্ষ বুক ফুলিয়ে বলেছিল, "আরে ও কিছু না, সামান্য চোট, একটু ফোলা ভাব। অথচ আমেরিকার নিউ জার্সিতে জাতীয় দলের ক্যাম্পে এসে যখন ডাক্তার রদ্রিগো লাসমার নেমারের ডান পায়ের কাফে এমআরআই করে দেখলেন, চোটটা আসলে বেশ গভীরে কামড় বসিয়েছে।

এখানেই খাপ্পা কার্লো আন্সেলোত্তি। চোট লাগতেই পারে, কিন্তু সেটা লুকানো হলে কেন? ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন আর স্যান্টোসের এই লুকোচুরি খেলায় আন্সেলোত্তির মতো একজন নিখুঁত প্ল্যানারের পুরো ব্লু-প্রিন্টটাই ওলটপালট হয়ে গেছে। সোমবারের সবশেষ স্ক্যানে যদিও দেখা গেছে নেইমারের ভাঙা পেশিতে নতুন টিস্যু গজাচ্ছে, যাকে ডাক্তাররা বলছেন 'ইতিবাচক অগ্রগতি'। কিন্তু বিশ্বকাপ তো আর পাড়ার টুর্নামেন্ট নয় যে আধ-ফিট নেইমারকে নামিয়ে দেওয়া যাবে! ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। আগামী শনিবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মরক্কোর বিরুদ্ধে ব্রাজিলের উদ্বোধনী মাচে ১০ নম্বর জার্সিধারী থাকছেন না। সাইডবেঞ্চে বসেই দলের খেলা দেখতে হবে নেইমারকে। টিম ম্যানেজমেন্টের এখন পাখির চোখ ১৯ জুনের হাইতি ম্যাচ। ওই ম্যাচে হয়তো দ্বিতীয়ার্ধে মিনিট কুড়ির জন্য নেইমারকে নামিয়ে একটা 'মাচ-টাইম' দেওয়ার চেষ্ট করবেন কোচ, যাতে নক-আউটের মহাযুদ্ধের আগে আসল অস্ত্রটা মরচে ধরা না থাকে। কিন্তু মরক্কোর মতো জমাট ডিফেন্সের দলের সামনে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে নেইমারকে ছাড়া ব্রাজিল কী করবে? বিশেষ করে যখন রদ্রিগো আর তরুণ এস্তোভাওয়ের মতো দুই গতিময় ফরোয়ার্ড চোটের ধাক্কায় ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন।

এক অন্ধ বিশ্বাস ও সংবাদমাধ্যমের সমালোচনায় এখানেই কিন্তু আন্সেলোত্তির জেদ। ব্রাজিলিয়ান মিডিয়া যখন নেইমারের ফিটনেস নিয়ে গেল গেল রব তুলেছে, আন্সেলোত্তি তখন রিয়াল মাদ্রিদের সেই চেনা 'অনড়' মুর্তিতে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ২৬ জনের স্কোয়াড থেকে নেইমারকে বাদ দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। নেইমার দলে থকবেন, কারণ আন্সেলোত্তি জানেন, ড্রেসিংরুমে এই একজনের উপস্থিতিরই বাকি ছেলেদের জন্য টনিকেরা মতো কাজ করবে। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিকরা সমালোচনায় ফালাফালা করে দিচ্ছেন কোচকে। এটা কি 'ট্যাকটিকাল ব্লাকমেইল' নাকি স্রেফ 'অন্ধ মোহ'। এই যে আন্সেলোত্তির 'নেইমার ছাড়া চলবে না' এই মনোভাব দলের বাকি তরণ প্রতিভাদের ওপর একটি নেতিবাচক মনস্তাত্বিক চাপ তৈরি করছে। ভিনিসিয়াস জুনিয়র, ব্রুনো গিমারায়েস কিংবা গাব্রিয়েল মার্টিনেলির মতো প্রিমিয়ার লিগ ও ইউরোপ কাঁপানো ফুটবলাররা যখন ড্রেসিংরুমে তৈরি, তখন একজন আনফিট তারকার চারপাশে পুরো দলের মনোযোগ আটকে থাকাটা ব্রাজিলের ঐতিহাসিক 'জোগো বোনিতো'র জন্য মোটেও ভালো বিজ্ঞাপন নয়। তাছাড়া, নেইমার না থাকায় আন্সেলোত্তির প্রিয় 'মাদ্রিদ স্টাইল' ৪-২-৪ ফরমেশনের পুরো কাঁটাটাই এখন ঘুরিয়ে দিতে হচ্ছে ভিনিসিয়াস জুনিয়ারের দিকে। রিয়াল মাদ্রিদে যেভাবে তিনি প্রতিপক্ষের বন্ধে ত্রাস সৃষ্টি করেন, এখন দেশের জার্সিতেও তাঁকে সেই একই 'লিডারশিপ' বা নেতৃত্ব নিতে হবে।

ইতিহাস কি তবে পুনরাবৃত্তি চায়? মরিস্টাউনের মাঠ ছাড়ার আগে একটা বড় প্রশ্ন মনের ভেতর খটকা দিয়ে গেল, ব্রাজিল ফুটবল কি তবে অতীত থেকে কিছুই শেখেনি? ২০১৪ বা ২০২২ প্রতিটি বিশ্বকাপেই নেইমারের চোট এবং তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত হাইপ ব্রাজিলের সাজানো বাগান ছারখার করে দিয়েছে। ২০২৬ সালেও এসে কার্লো আন্সেলেত্তির মতো অভিজ্ঞ ইটালিয়ান কোচ যদি সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করেন এবং নেইমার-নির্ভরতার পুরনো অসুখ থেকে ব্রাজিলকে বের করতে না পারেন, তবে আমেরিকার এই মহাযজ্ঞ সেলেকাওদের জন্য আরও একটি ট্র্যাজেডিতে রূপ নিতে পায়ে। পাবলো পিকাসো একবার বলেছিলেন, 'সব সৃষ্টির পেছনেই একটা ধবংসের হাত থাকে। ব্রাজিলের এই চোটের ধ্বংসস্তূপ আর নেইমারকে সুস্থ করার অসম্ভব প্রয়াসের মাঝখান থেকে আন্সেলোত্তি নতুন কোনো শিল্প সৃষ্টি করতে পারেন কি না, এখন সেই দিকেই চোখ থাকবে ফুটবল রোমান্টিকদের।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement