ধরুন, আপনার শরীরটা খারাপ। অসুস্থ হয়ে শয্যাশয়ী। আপনাকে ডাক্তার দেখতে এলেন। কিন্তু রোগী পরীক্ষা করতে গিয়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মুহূর্তেই রোগীকে ছেড়ে সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন চিকিৎসককে নিয়ে। ভাবছেন হয়তো, বাবা! এ যে একেবারে সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানাবে। এমন পরিস্থিতিতে পড়া মানে তো রীতিমতো চমকে যাওয়ার মতো ব্যাপার। শুনলে অবাক হবেন, অনেকটা এমন ঘটনাই ঘটেছিল বিশ্বকাপে (FIFA World Cup)। ৯৬ বছর আগে।
১৯৩০ সালের বিশ্বকাপ। উরুগুয়ের মন্টেভিডিও শহরে উন্মাদনা তুঙ্গে। সেমিফাইনালে মুখোমুখি শক্তিশালী আর্জেন্টিনা ও আমেরিকা। সেই ম্যাচেই ঘটেছিল হাস্যকর ঘটনা। ম্যাচটিতে শুরু থেকেই দাপট ছিল আর্জেন্টিনার। শেষ পর্যন্ত তারা ৬-১ গোলের বড় ব্যবধানে আমেরিকাকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। তবে ম্যাচের ফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় ছিল চিকিৎসা করতে এসে ট্রেনারের অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনা।
সেই সময় ফুটবলারদের চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল ব্যাগে নানান সরঞ্জামের পাশাপাশি রাখা হত ক্লোরোফর্মও। সেদিন তাড়াহুড়োয় ব্যাগটি ফেলে দেন। এতে ব্যাগের ভেতরে থাকা ক্লোরোফর্মের কাচের শিশি ভেঙে যায়।
এক মার্কিন ফুটবলার কড়া ট্যাকলের শিকার হন। তাঁর চিকিৎসার ছুটে আসেন আমেরিকার ট্রেনার জ্যাক কল। সেই সময় ফুটবলারদের চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল ব্যাগে নানান সরঞ্জামের পাশাপাশি রাখা হত ক্লোরোফর্মও। সেদিন তাড়াহুড়োয় ব্যাগটি ফেলে দেন। এতে ব্যাগের ভেতরে থাকা ক্লোরোফর্মের কাচের শিশি ভেঙে যায়। মতান্তরে, রেফারির সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছিলেন তিনি। এতে হোঁচট খান। পকেটে থাকা ক্লোরোফর্মের শিশি পড়ে গিয়ে ভেঙে যায়। শিশি ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ঝাঁজাল গ্যাস। তাতে আক্রান্ত হয়ে জ্যাক কল নিজেই অজ্ঞান হয়ে যান। ফলে যে খেলোয়াড়কে শুশ্রূষা করতে তিনি মাঠে নেমেছিলেন, তাঁর বদলে জ্যাককেই স্ট্রেচারে করে মাঠের বাইরে নিয়ে যেতে হয়। এতে অবশ্য ফলাফল বদলাইনি। বিরাট ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা।
স্কোরলাইন ৬-১ ফল দেখে মনে হতে পারে, একপেশে ম্যাচ হয়েছে। আর্জেন্টিনা যেন অনায়াসেই আমেরিকাতে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবের গল্পটা অনেক বেশি নাটকীয়। প্রথমার্ধ শেষে মাত্র ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল আমেরিকা। তবে প্রথম ৪৫ মিনিটেই যেন তাদের জন্য নিয়তি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। গোলরক্ষক জেমস ডগলাস হাঁটুতে গুরুতর চোট পান। ডিফেন্ডার রালফ ট্রেসির ডান পা ভেঙে যায়। এর মাঝেই ঘটে ক্লোরোফর্ম কাণ্ড। ভাঙা পা নিয়েও বিরতি পর্যন্ত খেলে যান ট্রেসি। যদিও দ্বিতীয়ার্ধে আর নামতে পারেননি।
তখন বদলি খেলোয়াড় নামানোর নিয়ম ছিল না। ফলে ১০ জন নিয়ে মাঠে নামে আমেরিকা। আর সেখান থেকেই শুরু হয় ধস। সংখ্যার সুবিধা কাজে লাগিয়ে আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ শানায়। মাত্র সাত মিনিটে তিনটি গোল-সহ ছয় গোলের বিশাল জয় পায়। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই আর্জেন্টিনায় উন্মাদনার পারদ চড়ে। হাজার হাজার সমর্থক ফাইনাল দেখতে রিভার প্লেট পেরিয়ে উরুগুয়ের পথে রওনা দেন। কিন্তু ফাইনালে অপেক্ষা করছিল অন্য গল্প। প্রতিবেশী উরুগুয়ে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ জিতে নেয়। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে অপেক্ষা করতে হয় আরও ৪৮ বছর। তবে বিশ্বকাপের প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাসে ক্লোরোফর্ম কাণ্ডের মতো অদ্ভুত ঘটনা আর ঘটেনি।
