সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছেন, না হলে পাঠ্যবইয়ে পড়েছেন, বুট পরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে খালি পায়ে মোহনবাগান ফুটবলারদের লড়াই। স্বপ্নে দেখেছেন কখনও, মোহনবাগান মাঠে একপ্রান্ত থেকে বুট পরা সাহেবরা বল নিয়ে এগিয়ে আসছে, খালি পায়ের কড়া ট্যাকল করলেন গোষ্ঠ পাল। ‘চিনের প্রাচীর’-এর কড়া ট্যাকল সহ্য করতে না পেরে ছিটকে গেলেন সাহেব ফুটবলার।
এরকম কতবার যে আপনি স্বপ্নে দেখেছেন, আর যেই ঘুম ভেঙে গিয়েছে, নিজের মনে বলেছেন, ধুর আপনি দেখবেন কীভাবে? সেই কত বছর আগে স্বাধীনতার পূর্বেকার মোহনবাগানের বীর বিপ্লবী ফুটবলারদের নিয়ে বিভিন্ন প্রচলিত গল্পকথা নিয়ে নিজেদের মতো করে গোষ্ঠ পালদের নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটা অবয়ব তৈরি করে রেখেছেন।
সেই সময় হাফ ব্যাক ‘গোষ্ঠ পাল’, ফুল ব্যাক ‘মন্মথ দত্ত’-র খেলা দেখতে পাওয়া দূরঅস্ত, শৈলেন মান্নার খেলা দেখেছেন, এরকম কাউকে এই মুহূর্তে খুঁজে পাবেন? ৪০ বছর আগের কোনও ফুটবল খেলার ক্লিপিংস যেখানে খড়ের গাদায় সুচ খুঁজে পাওয়ার মতো কষ্টসাধ্য ব্যাপার, সেখানে গোষ্ঠ পাল, উমাপতি কুমার এঁদের খেলার ক্লিপিংস পাবেন কোথা থেকে? ফলে ময়দান থেকে যাওয়ার সময় গোষ্ঠ পালের মূর্তির দিকে তাকিয়ে নিজের মতো করে কল্পনা করে নিয়েছেন, আর মূর্তির দিকে তাকিয়ে পেন্নাম ঠুকেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবীদের।
এই বার হঠাৎ যদি জানতে পারেন, কলকাতার বুকেই কারও অধীনস্থ রয়েছে, ১৯৩৭ সালের কলকাতা লিগে বুট পরা সাহেবদের দল ডালহৌসি ক্লাবের বিরুদ্ধে খালি পায়ে গোষ্ঠ পাল, মন্মথ দত্ত, কুমারদের নিয়ে গড়া মোহনবাগান দলের সেই বিতর্কিত খেলার ক্লিপিংস। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। ১৯৩৭ সালে কলকাতা লিগে মোহনবাগান-ডালহৌসি ম্যাচের খেলার ক্লিপিংস। যে ম্যাচ দেখতে মোহনবাগান মাঠে মানুষের ভিড় ভেঙে পড়েছিল।
হঠাৎ যদি জানতে পারেন, কলকাতার বুকেই কারও অধীনস্থ রয়েছে, ১৯৩৭ সালের কলকাতা লিগে বুট পরা সাহেবদের দল ডালহৌসি ক্লাবের বিরুদ্ধে খালি পায়ে গোষ্ঠ পাল, মন্মথ দত্ত, কুমারদের নিয়ে গড়া মোহনবাগান দলের সেই বিতর্কিত খেলার ক্লিপিংস। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন।
এই পর্যন্ত পড়ে হয়তো উত্তেজনায় আমার রোমকূপ খাড়া হয়ে উঠেছে। তা হলে ভাবুন, এই ম্যাচের কিছুক্ষণ অংশ দেখে আসার পর মানসিকভাবে আমি ঠিক কোন স্তরে বিচরণ করছি। হ্যাঁ, ঠিকই বলছি, মোহনবাগান জার্সি পরে খালি পায়ের গোষ্ঠ পাল, মন্মথ দত্তদের খেলা দেখার কথা বলছি।
তা হলে পুরো ঘটনাটা একটু খুলেই বলি। আনোয়ার শাহ রোডে ‘নবীনা’ সিনেমার সামনে থেকে বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে ‘ভারতলক্ষ্মী স্টুডিও’। যার প্রতিষ্ঠাতা বাবুলাল চৌখানি ১৯৩৪ সালে তৈরি করেছিলেন বিখ্যাত ‘শ্রী ভারতলক্ষ্মী স্টুডিও’। যাদের ব্যানারে প্রথম সিনেমা হয়েছিল, ‘চাঁদ সদাগর’। প্রফুল্ল রায়ের পরিচালনায় ছবির লিড রোলে ছিলেন ‘অহীন্দ্র চৌধুরী।’
সিনেমা নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী ছাত্রছাত্রীরা যদি শুধু ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওতে একটা দিন পড়ে থাকেন, গভীর সমুদ্রে ডুব দিয়ে কত যে মণি-মাণিক্য তুলে আনতে পারবেন।
একটা সময় অহীন্দ্র চৌধুরী, ছবি বিশ্বাস, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সাধনা বসু, মন্মথ রায়, সঙ্গীত পরিচালক শচীন দেববর্মণের মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বরা চুক্তিবদ্ধ ছিলেন এই ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওর সঙ্গে। স্বাধীনতাপূর্ব এই বাংলায় একের পর এক বাংলা সিনেমা বাঙালিদের উপহার দিয়ে গিয়েছে এই শ্রী ভারতলক্ষ্মী স্টুডিও।
গোষ্ঠ পালের মূর্তি। ছবি এক্স।
সিনেমা প্রযোজনার পাশাপাশি, ভারতলক্ষ্মীর প্রতিষ্ঠাতা বাবুলাল চৌখানির প্যাশন ছিল, বিভিন্ন ডকুমেন্টারি শুট করা। সেরকমভাবেই একদিন ১৯৩৭-এর লিগে মোহনবাগান মাঠে ব্রিটিশদের ক্লাব ডালহৌসির বিরুদ্ধে সবুজ-মেরুনের খেলার মুহূর্ত শুট করে রেখেছিলেন বাবুলাল চৌখানি। সেই মরশুমে মোহনবাগানের দলটা একবার ভাবুন, গোলে -কুমার। বাকি ফুটবলাররা হলেন, গোষ্ঠ পাল, হামিদ, মন্মথ দত্ত, সুশীল চট্টোপাধ্যায়, কুমুদ দাস, রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। সেই কবে থেকে এই অমূল্য খেলার ক্লিপিংস ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওর অধীনস্থ রয়ে গিয়েছে।
বাবুলাল চৌখানির দুই নাতি। একজন নবীন চৌখানি। যিনি নবীনা সিনেমার কর্ণধার। আরেক নাতি জ্যোতি চৌখানি যিনি বিশাল ভারতলক্ষ্মী স্টুডিও দেখেন। এক বিকেলে স্টুডিওতে নিজের চেম্বারে বসে মুড়ি-বাদাম খেতে খেতে জ্যোতি চৌখানি বলছিলেন, ‘মোহনবাগান কর্তাদের সঙ্গে একদিন কথা বলিয়ে দিতে পারেন? মোহনবাগানের বিশাল এক সম্পত্তি আমাদের কাছে রয়েছে। ক্লাবকে তাদের সম্পত্তি তুলে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চাই।’
মানে! মোহনবাগানের কী এমন অমূল্য সম্পত্তি ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওর কাছে গচ্ছিত রয়েছে, যা জ্যোতি চৌখানি মোহনবাগান ক্লাবের হাতে তুলে দিতে চান? কথায় কথায় যা বললেন, তাতে তো চক্ষু চড়কগাছ। ১৯৩৭ সালের কলকাতা লিগের সেই বিতর্কিত মোহনবাগান-ডালহৌসি ক্লাবের ম্যাচের ক্লিপিংস রয়েছে তাঁদের জিম্মায়। সত্যি! এরকম ঐতিহাসিক একটি ম্যাচের ক্লিপংস তাঁদের জিম্মায় রয়েছে। এ তো আর মুখের কথায় বিশ্বাস করা যায় না। স্বাভাবিকভাবেই দেখতে চাইলাম। জানা গেল, চার মিনিটের ক্লিপিংস রয়েছে পুণের ‘ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়া’র কাছে। সেখানেই জমা রেখেছেন তাঁরা। জানালেন, বামফ্রন্ট আমলে ২০০৭-০৮-এর দিকেও নন্দনের আর্কাইভে জমা রেখেছেন এই দুষ্পাপ্র্য ম্যাচ ক্লিপিংস। কিন্তু তিনি নন্দনের আর্কাইভ থেকে খোঁজার প্রয়াস না চালিয়ে সোজা ‘ন্যাশনাল ফিল্ম ডিভিশন’কে মেল পাঠিয়ে আনিয়ে নিলেন দুষ্প্রাপ্য সেই ম্যাচের ‘চার মিনিটের ফুটেজ।’ নিজের চেম্বারে বসে কম্পিউটারে চালিয়ে দেখালেন সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ।
১৯৩৭ সালের কলকাতা লিগের সেই বিতর্কিত মোহনবাগান-ডালহৌসি ক্লাবের ম্যাচের ক্লিপিংস রয়েছে তাঁদের জিম্মায়। সত্যি! এরকম ঐতিহাসিক একটি ম্যাচের ক্লিপংস তাঁদের জিম্মায় রয়েছে। এ তো আর মুখের কথায় বিশ্বাস করা যায় না। স্বাভাবিকভাবেই দেখতে চাইলাম। জানা গেল, চার মিনিটের ক্লিপিংস রয়েছে পুণের ‘ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়া’র কাছে। সেখানেই জমা রেখেছেন তাঁরা।
মোহনবাগানের কিছু ফুটবলার খেলছেন, খালি পায়ে। কিছু বুট পরে। দর্শকে ঠাসা গ্যালারির উপর থেকে দেখা যাচ্ছে ধর্মতলার শহিদ মিনার। মোহনবাগান গোল করলে মাঠে ঢুকে ছাতা খুলে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বাঙালির সেই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। অনেক পুরনো ঝিরঝির করতে থাকা ফুটেজে দেখা যাচ্ছে বুট পরা সাহেবদের বিরুদ্ধে খালি পায়ে মোহনবাগান ফুটবলারদের সে কী মারাত্মক বিক্রম। ফুটেজ এতটাই পুরনো হয়ে গিয়েছে যে, মোহনবাগান দলে কোন ফুটবলারটি গোষ্ঠ পাল তা বোঝার উপায় নেই। ১৯৩৭ সালে রেকর্ড করা সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের অডিও সম্পূর্ণভাবে খারাপ। জ্যোতি চৌখানি জানালেন, আমাকে দেখানোর জন্য ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ থেকে তাড়াহুড়ো করিয়ে ম্যাচের ফুটেজ আনিয়েছেন। কিন্তু মোহনবাগান কর্তারা যদি এই অমূল্য ঐতিহাসিক দলিলটি ক্লাবের কাছে রাখতে চান, তা হলে তিনি ন্যাশনাল ফিল্ম ডিভিশনের সঙ্গে কথা বলে এই দুষ্প্রাপ্য ফুটেজটিকে আধুনিক উপায়ে আরও ঝকঝকে করে মোহনবাগানের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত। এই কাজটুকু করতে পারলেই মনে করছেন, তাঁর দাদু’র তৈরি ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওর আসল উদ্দেশ্য তিনি ধরে রাখতে পারবেন।
মনে মনে কল্পনা করুন। ২১ জুলাই, মোহনবাগান ডে-তে, ভরা নেতাজি ইন্ডোরে সবুজ-মেরুন সমর্থকদের সামনে এই ম্যাচের ক্লিপিংস দেখানো হচ্ছে। ইন্ডোরের দর্শকাসনে বসা সবুজ-মেরুন সমর্থকদের রোম ততক্ষণে খাড়া হয়ে গিয়েছে। তৈরি হয়েছে এক অমোঘ পরিবেশ। সবাই পিছিয়ে গিয়েছে সেই স্বাধীনতাপূ্র্ব বাংলায়..। বাকিটা না হয় নিজেরা যখন সেই ঐতিহাসিক ম্যাচটি চাক্ষুষ করবেন, তখনই জানাবেন মনের কথা…।
