ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই রোমহর্ষক সব মুহূর্ত। কতশত ইতিহাস, বিতর্ক, দ্বন্দ্বের কাহিনি লুকিয়ে মাঠের ৯০ মিনিটের সেই চূড়ান্ত লড়াইয়ে। কত দুঃখ, কান্না, বাঁধন ভাঙা উচ্ছ্বাসের সাক্ষী বিশ্বকাপের শেষের কবিতা। কিন্তু 'দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে'র ইতিহাসের পাতায় রয়েছে ফাইনালহীন সেরা হওয়ার গল্পও। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। ফাইনাল ছাড়াই টুর্নামেন্টে সেরার মুকুট উঠেছিল এক দলের মাথায়। যার নেপথ্য কারণগুলির অন্যতম এই ভারতবর্ষও। বিশ্বকাপের গপ্পে আজ ফিরে যাওয়া যাক সেই দিনটিতেই।
৯৬ বছরের ইতিহাসে মাত্র একবারই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিল যে ভারত পেয়েছিল, তা সকলের জানা। আর হাতের লক্ষ্মী যে তারা পায়ে ঠেলেছিল, তাও সর্বজনবিদিত। যদিও ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে কেন ভারত নাম তুলে নিয়েছিল, তা নিয়ে একাধিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হল আব্দুল রহিমের ভারতীয় দল নাকি খালি পায়ে খেলতে চেয়েছিল। বিশ্বকাপে তার অনুমতি ছিল না বলেই অংশ নেওয়া হয়নি। কিন্তু তা আদতেই মিথ। সত্যিটা একেবারেই অন্য়। আসলে ১৯৩৮-এর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্বকাপ আয়োজন করাই সম্ভব হয়। দীর্ঘ ১২ বছর পর ১৯৫০ সালেও বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পথটা নেহাত মসৃণ ছিল না অনেক দেশের পক্ষেই। সেই তালিকায় ছিল ভারতও। দুনিয়াজুড়ে ধস নামে অর্থনীতিতে। চরমে পৌঁছায় মূল্যবৃদ্ধি। ফলস্বরূপ, মাত্র ৩৪টি দেশের মধ্যে ১৬টি দেশ কোয়ালিফাই করে ব্রাজিল বিশ্বকাপে। কিন্তু দুই এশীয় দল ফিলিপিন্স এবং বর্মা (বর্তমান মায়ানমার) কার্যত অসহায় হয়েই নাম প্রত্যাহার করে। তখন এশিয়ার দল হিসেবে ভারতকে আমন্ত্রণ জানায় ফিফা। কিন্তু আমন্ত্রণ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন।
ফিফা বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় শৈলেন মান্নাদের। ৭৫ বছর পরও দেশবাসীর সেই স্বপ্নপূরণ হল না। শুধুমাত্র ফুটবলকে ভালোবেসে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানির জার্সি গায়ে চাপিয়ে বিশ্বকাপের উত্তেজনায় আজও গা ভাসিয়ে দেয় ভারতবাসী।
কিন্তু কেন। আসলে সেই সময় বিশ্বকাপের চেয়ে ভারতের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট ছিল অলিম্পিক। দু'বছর পরই অলিম্পিক। ফলে তার আগে দল পাঠাতে চায়নি এআইএফএফ। একে তো জাহাজে দীর্ঘ জলপথ অতিক্রমের ক্লান্তি, তার উপর ফুটবলারদের চোট, খরচ ইত্যাদির কথা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রিপোর্ট বলছে, সেসময় বিশ্বকাপে ফুটবলার পাঠাতে ভারতের খরচ হত ১ লক্ষ টাকা। যদিও ফিফাই সে অর্থ জোগাতে রাজি হয়েছিল। তবে ফেডারেশন সভাপতি মঈন-উল-হকের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, "বিশ্বকাপ বা জুলে রিমে কাপে ভারত অংশগ্রহণ করবে না। ভারতের কাছে আমন্ত্রণের খবর দেরিতে আসে। ফলে রিও পৌঁছনোর পর প্রস্তুতির জন্য হাতে আর সময়ই থাকবে না। তাই আমরা দল পাঠাচ্ছি না।" ফলে ফিফা বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় শৈলেন মান্নাদের। ৭৫ বছর পরও দেশবাসীর সেই স্বপ্নপূরণ হল না। শুধুমাত্র ফুটবলকে ভালোবেসে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানির জার্সি গায়ে চাপিয়ে বিশ্বকাপের উত্তেজনায় আজও গা ভাসিয়ে দেয় ভারতবাসী।
চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে
সে যাই হোক, ভারতীয় ফুটবলের দৈনদশার গপ্প অন্য কোনওদিন। আপাতত ফেরা যাক ফাইনালহীন বিশ্বকাপে। ভারতের পাশাপাশি শেষবেলায় নাম তুলে নেয় স্কটল্যান্ড এবং তুরস্কও। ফলে ১৯৩০ বিশ্বকাপের মতোই শেষমেশ মাত্র ১৩ দলের বিশ্বকাপ আয়োজিত হয় ব্রাজিলে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত সেই টুর্নামেন্টে মোট চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয় দলগুলিকে। এ ও বি গ্রুপে চারটি করে দেশ। গ্রুপ সি-তে তিনটি এবং গ্রুপ ডি-তে মাত্র দুই দেশ। বলিভিয়া ও উরুগুয়ে। সে-ই প্রথম তথা শেষবার (এখনও পর্যন্ত), দু'টি দল নিয়ে কোনও গ্রুপ তৈরি করতে বাধ্য হয় ফিফা।
তবে অবাক হওয়ার এখানেই ইতি নয়। ১৯৫০-ই একমাত্র বিশ্বকাপ, যেখানে কোনও ফাইনাল আয়োজিত হয়নি। কারণ প্রতিটি গ্রুপের সেরা দল পরের পর্বে পৌঁছায়। কিন্তু সেমিফাইনালের পরিবর্তে রাউন্ড রবিন ফরম্যাটে খেলা হয়। অর্থাৎ প্রতিটি দল একে অপরের বিরুদ্ধে খেলে। এবং ফাইনাল ছাড়াই পয়েন্টের হিসেবে ব্রাজিলকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ঘরে তোলে উরুগুয়ে। তাই সবমিলিয়ে বিশ্বকাপে ফাইনাল না হওয়ার গপ্পে জড়িয়ে ভারতের নামও। তবে দুঃখের বিষয় হল, যে অলিম্পিক ভারতের বিশ্বকাপ না খেলার অন্যতম কারণ, দু'বছর পর সেই ১৯৫২ হেলসিঙ্কি অলিম্পিকের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ভারতীয় ফুটবল দল। তাও আবার যুগোস্লোভাকিয়ার কাছে ১০-১ পরাস্ত হয়ে।
