Advertisement
৯০ মিনিটের ‘লিভিং স্ট্যাচু’, ধৈর্য ও ইতিহাস বুকে বিশ্বকাপের মূর্ত প্রতীক কঙ্গোর সমর্থক মিশেল
দল হারলে তাঁর চোখেও জল আসে। আসলে মূর্তি হলেও মানুষ তো!
কৃষ্ণাঙ্গ, চশমাপরা, পরিপাটি পোশাকে এক ভদ্রলোক ফুটবল মাঠের ধারে ৯০ মিনিট ধরে মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে। চারপাশে খেলা নিয়ে চাপা উত্তেজনা। তাঁকে নিয়ে ইতিউতি চাহুনি। কিন্তু তাঁর চোখের পলক পড়ছে না। নড়াচড়াও প্রায় দেখা যায়নি। দর্শক, ফুটবলার ও অফিসারের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, কে এই রহস্যময় ‘লিভিং স্ট্যাচু’?
তাঁর নাম মিশেল কুকা এম্বোলাদিঙ্গা। নিবাস কঙ্গো। কঙ্গোর এই সমর্থক মাঠে থাকেন এক অনন্য ভূমিকায়। কোনও স্লোগানে নয়। উচ্ছ্বাসে নয়। স্থানুবৎ উপস্থিতির মাধ্যমে দলকে তাতান। তাঁর ভাষায়, এটা ‘ইমোশনাল স্ট্যামিনা’। ম্যাচজুড়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা মিশেল বিশ্বাস করেন, তাঁর আবেগ খেলোয়াড়দের লড়াইয়ে সাহস দেয়। তবে দল হারলে তাঁর চোখেও জল আসে। আসলে মূর্তি হলেও মানুষ তো!
কঙ্গোর জাতীয় দলের এই সমর্থক ‘লুমুম্বা ভেয়া’ নামেও পরিচিত। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাধীন কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বার নাম। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা লুমুম্বা ১৯৬০ সালে স্বাধীন দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। দেশের সম্পদ বিদেশি শক্তির হাতে তুলে না দেওয়ার অবস্থানে অটল ছিলেন। সেই কারণে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে নিহত হন তিনি।
কঙ্গোর মানুষের কাছে আজও লুমুম্বা একজন মসীহা। স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। সেই স্মৃতিকেই ফুটবল গ্যালারিতে জীবন্ত করে তুলেছেন মিশেল। তাঁর স্থির ভঙ্গি আসলে লুমুম্বার একটি বিখ্যাত মূর্তির অনুকরণ। উচ্ছ্বাসহীন সেই উপস্থিতি যেন খেলোয়াড়দের সাহস ও ভরসা জোগায়। তাই তাঁর আরেক নাম ‘লুমুম্বা ভেয়া’। অর্থাৎ, ‘লুমুম্বা আজও বেঁচে আছেন’।
শুরুর দিকে অনেকেই তাঁর সমর্থনের ধরনকে অদ্ভুত মনে করতেন। কেউ কেউ তাঁকে পাগলাটে সমর্থকও বলতেন। কিন্তু গত বছর থেকে তাঁর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। কঙ্গোর জাতীয় ফুটবল দল প্রায় সব ম্যাচেই তাঁকে দেখা যেত। ২০২৫ সালের আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে তাঁর ‘নিথর’ উপস্থিতি ক্যামেরার নজর এড়ায়নি। সেই ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও তিনি আলোচনায় আসেন।
ক্রমে মিশেলের জনপ্রিয়তা কঙ্গোর সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা তাঁর ভঙ্গি অনুকরণ করতে শুরু করেন। শিশু ও কিশোর ফুটবল দলগুলির কাছেও জনপ্রিয়তা পান। মিশেল যেন এখন সাংস্কৃতিক দূত। যেখানে ভাষা বা দেশের বিভাজন নয়, ফুটবলই সংযোগের সেতুবন্ধন। কিন্তু একটানা ৯০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকা তো কঠিন কাজ। কীভাবে রপ্ত করেছেন কঠিন এই কৌশল?
খেলার দিন ৯০ মিনিট টানা দাঁড়িয়ে থাকার জন্য, অন্যান্য দিন ৪০ মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে প্রস্তুত করেন মিশেল। সেই তিনি এবারের বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। টিম বিশ্বকাপে উঠতেই খেলোয়াড়রা দাবি জানান, তাঁকে যেন দলের সঙ্গে রাখা হয়। কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স তশিসেকেদি সেই দাবি মঞ্জুর করেন। এভাবেই তিনি জাতীয় দলের স্বীকৃত সদস্য।
যদিও দেশে ইবোলা ভাইরাস অতিমারির আকার নেওয়ায় পর্তুগাল ম্যাচ মাঠে বসে দেখতে পারেননি। তাই মুখভার ছিল অনেকের। কিন্তু কঙ্গো ফুটবলাররা যখন কলম্বিয়া ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনই বার্তা, সব বাধা পেরিয়ে আসছেন ‘লুমুম্বা ভেয়া’! বিশ্বকাপে কঙ্গোর দ্বিতীয় ম্যাচে গ্যালারিতে হাজির ছিলেন ‘লিভিং স্ট্যাচু’ মিশেল কুকা এম্বোলাদিঙ্গা। তবে দলের জয় দেখা হয়নি। লড়াই করে কলম্বিয়ার কাছে ১-০ ব্যবিধানে হেরে গিয়েছে কঙ্গো।
Published By: Prasenjit DuttaPosted: 09:41 PM Jun 25, 2026Updated: 10:15 PM Jun 25, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
