পনির কিনতে গিয়ে যদি দেখা যায়, সেটি আসলে দুধ দিয়ে তৈরি নয়, তাহলে? দেখতে, স্বাদে এবং গঠনে অনেকটাই পনিরের মতো হলেও এমন বহু পণ্য বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যা আদতে 'অ্যানালগ পনির' (Analogue Paneer), অর্থাৎ, পনিরসদৃশ খাদ্যপণ্য।
এই ধরনের বিভ্রান্তিকর বিক্রি রুখতেই কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও ছত্তীসগঢ়। তিন রাজ্যেই অ্যানালগ পনিরের উৎপাদন, মজুত, পরিবহণ এবং বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। সম্প্রতি খাদ্য নিরাপত্তা দফতরের অভিযান ও পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষায় অভিযোগ ওঠে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে দুধের তৈরি আসল পনিরের বদলে ভিন্ন উপাদানে তৈরি পণ্য, 'পনির' নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে ক্রেতারা না জেনেই নকল বা বিকল্প পণ্য কিনছেন।
এই পরিস্থিতিতে খাদ্যে ভেজাল রোধ, সঠিক লেবেলিং নিশ্চিত করা এবং ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষায় কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নির্ধারণকারী সংস্থা (এফএসএসএআই)-এর নির্দেশিকা কার্যকর করার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
আসল তো? ছবি: সংগৃহীত
কী এই অ্যানালগ পনির?
অ্যানালগ পনির এমন একটি খাদ্যপণ্য, যা দেখতে ও স্বাদে অনেকটাই সাধারণ পনিরের মতো হলেও মূলত তাজা দুধ দিয়ে তৈরি হয় না। এতে সাধারণত উদ্ভিজ্জ তেল (ভেজিটেবল অয়েল) বা হাইড্রোজেনেটেড ফ্যাট, স্টার্চ, ইমালসিফায়ার, স্টেবিলাইজার, বিভিন্ন খাদ্য-সংযোজক এবং ফ্লেভারিং এজেন্ট ব্যবহার করা হয়। কোনও কোনও প্রস্তুতকারক সামান্য মিল্ক সলিড বা স্কিমড মিল্ক পাউডারও মিশিয়ে থাকেন।
অন্যদিকে, আসল পনির তৈরি হয় তাজা দুধে লেবুর রস বা ভিনিগারের মতো অ্যাসিড মিশিয়ে দুধ ফাটিয়ে। সেই কারণে খাদ্যবিধি অনুযায়ী এই দুই পণ্য এক নয় এবং তাদের পরিচয়ও আলাদা হওয়া উচিত।
অ্যানালগ পনির তুলনামূলক সস্তা, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করলেও সহজে গলে যায় না। এই কারণেই বহু রেস্তোরাঁ, ফাস্ট ফুডের দোকান এবং ক্যাটারিং সংস্থা এটি ব্যবহার করে।
কেন এই কড়াকড়ি?
সরকারি কর্তাদের বক্তব্য, অ্যানালগ পনির নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্য বিকল্প খাদ্যকে বন্ধ করা নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই পণ্যকে আসল দুধের পনির বলে বিক্রি করা হয়। এতে ক্রেতারা প্রতারিত হন, খাদ্য লেবেলিং আইন লঙ্ঘিত হয়, প্রকৃত দুধ উৎপাদকরা ক্ষতির মুখে পড়েন এবং বাজারে অসাধু প্রতিযোগিতা বাড়ে।
গুজরাট সরকার ইতিমধ্যেই হোটেল, রেস্তোরাঁ, সুপারমার্কেট, ডেয়ারি ও অন্যান্য ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দিয়েছে, শুধুমাত্র খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ করা আসল দুধের পনিরই বিক্রি করতে হবে। নিয়ম ভাঙলে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অ্যাক্ট, ২০০৬ অনুযায়ী জরিমানা থেকে আইনি ব্যবস্থা—দুটিই হতে পারে।
প্রিয় রেসিপি তৈরির আগে ফারাক জানুন। ছবি: সংগৃহীত
অ্যানালগ পনির কি স্বাস্থ্যের জন্য আদৌ নিরাপদ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে তৈরি এবং সঠিকভাবে লেবেল করা অ্যানালগ পনিরকে ক্ষতিকর না বলা গেলেও, এর পুষ্টিগুণ প্রচলিত পনিরের তুলনায় আলাদা হতে পারে।
এতে উচ্চমানের দুধের প্রোটিন তুলনামূলক কম থাকতে পারে, পরিবর্তে পরিশোধিত উদ্ভিজ্জ চর্বির পরিমাণ বেশি হতে পারে। ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এবং অন্যান্য পুষ্টিগুণও আসল পনিরের মতো নাও হতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন খাদ্য-সংযোজক থাকায় অনেকেই এটি এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন।
বিশেষ করে হৃদ্রোগ, উচ্চ কোলেস্টেরল বা ওজন নিয়ন্ত্রণের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তি বা যাঁরা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের উপর নির্ভর করেন, তাঁদের জন্য আসল ও অ্যানালগ পনিরের পার্থক্য জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেনার আগে প্যাকেটের গায়ে লেখা ভালো করে পড়ুন। ছবি: সংগৃহীত
কেনার আগে কী দেখবেন?
পনির কেনার সময় শুধু নাম দেখে নয়, প্যাকেটের গায়ে লেখা উপাদানের তালিকাও পড়ে নিন। অ্যানালগ বা চিজ অ্যানালগ লেখা আছে কি না খেয়াল করুন। বিশ্বস্ত সংস্থা বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডেয়ারি থেকেই পণ্য কিনুন এবং এফএসএসএআই এর লাইসেন্স নম্বর যাচাই করুন। কোনও পণ্যের লেবেল নিয়ে সন্দেহ হলে স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষকে জানান।
বিকল্প দুগ্ধজাত পণ্য বাজারে থাকতে পারে, তবে তার পরিচয় গোপন করে আসল পনির হিসেবে বিক্রি করা উচিত নয়। তাই পনির কেনার আগে শুধু দাম নয়, প্যাকেটের গায়ে লেখা তথ্যও ভালো করে পড়ে তবেই পনির কিনুন।
