shono
Advertisement
Sleep Deprivation

৪ ঘণ্টা ঘুমিয়েই দিব্যি আছেন? বাড়ছে ডায়াবেটিস-হৃদরোগ, আইসিইউতে ভর্তির সংখ্যাও

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শুধু ক্লান্তিই বাড়ায় না, ডেকে আনতে পারে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদ্‌রোগ, মানসিক সমস্যা, এমনকী গুরুতর অসুস্থতাও।
Published By: Pritimoy Roy BurmanPosted: 08:40 PM Aug 04, 2026Updated: 08:40 PM Aug 04, 2026

রাত জেগে কাজ, দিনে মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুম, এখন অনেকের কাছেই যেন ‘সফল’ মানুষের পরিচয়। কিন্তু এই অভ্যাসই শরীরকে ঠেলে দিচ্ছে বিপদের দিকে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শুধু ক্লান্তিই বাড়ায় না, ডেকে আনতে পারে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদ্‌রোগ, মানসিক সমস্যা, এমনকী বাড়ায় গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকিও।

Advertisement

আজকের ব্যস্ত জীবনে ঘুম যেন সবচেয়ে সহজে বিসর্জন দেওয়া অভ্যাস। কাজের চাপ, মোবাইলের পর্দা, রাত জাগার সংস্কৃতি— সব মিলিয়ে ঘুমের সময় ক্রমশ কমছে। অনেকেই গর্ব করে বলেন, দিনে চার ঘণ্টা ঘুমিয়েই দিব্যি কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। যেন কম ঘুম মানেই বেশি কর্মক্ষমতা।

অ্যাপোলো হসপিটালস, চেন্নাইয়ের রেডিওলজি বিভাগের প্রধান এবং দ্যা হান্ড্রেড ইয়ার ব্লুপ্রিন্ট বইয়ের লেখক ডা. নবীন জ্ঞানশেখরন বলছেন, এই ধারণাই বড় বিপদের। তাঁর মতে, ভারতের স্বাস্থ্য-সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠছে ঘুমের ঘাটতি।

চোখে ঘুম নেই। ছবি: সংগৃহীত

এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ঘুমহীন দেশগুলির মধ্যে ভারতের স্থান দ্বিতীয়। আর এই ঘুমের ঘাটতি এমন সময়ে দেখা দিচ্ছে, যখন দেশ ইতিমধ্যেই ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের ভারে জর্জরিত।

চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত এক সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, দেশের প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই টানা ছ'ঘণ্টার কম ঘুমান। ২০২২ সালের পর থেকে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অথচ মার্কিন সিডিসি-র মতে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি রাতে অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।

ঘুমের মধ্যেই মেরামত হয় শরীর
ঘুম মানেই শুধু বিশ্রাম নয়। শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘রিপেয়ার শিফট’ চলে তখনই। এই সময় মস্তিষ্ক সারাদিনের জমে থাকা টক্সিন পরিষ্কার করে, হরমোনের ভারসাম্য ঠিক হয়, কোষের মেরামতি হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয় এবং পরের দিনের জন্য শরীর নিজেকে প্রস্তুত করে। তাই নিয়মিত কম ঘুম মানে প্রতিদিনই এই স্বাভাবিক মেরামতির প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

শুধু কতক্ষণ ঘুমোলেন, সেটাই সব নয়
ঘুমেরও আলাদা ধাপ রয়েছে। লাইট স্লিপ, ডিপ স্লিপ এবং রেম স্লিপ। ডিপ স্লিপে শরীর নিজেকে পুনর্গঠন করে। পেশির ক্লান্তি কাটে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে। অন্যদিকে রেম স্লিপ স্মৃতিশক্তি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শেখার ক্ষমতা এবং সৃজনশীল চিন্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

রাতে দেরি করে শোওয়া, মাঝরাতে উঠে কাজ করা বা মাত্র তিন-চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে দিন কাটালে এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলিই বাদ পড়ে যায়। ফলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে, কর্টিসল বাড়ে এবং ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদ্‌রোগ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অনেকেই মনে করেন কম ঘুমিয়ে তাঁরা শরীরকে ‘বায়োহ্যাক’ করছেন। বাস্তবে এই মানুষদের অনেককেই পরবর্তীকালে গুরুতর অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি হতে দেখা যায়।

ঘুমহীন রাত। ছবি: সংগৃহীত

রাতের খাবার, কফি আর মোবাইল—ঘুমের তিন শত্রু
শোওয়ার ঠিক আগে ভারী খাবার খেলে শরীর বিশ্রামের বদলে হজমের কাজেই ব্যস্ত থাকে। ফলে ডিপ স্লিপে পৌঁছতে দেরি হয়। তাই ঘুমোতে যাওয়ার অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

ক্যাফেইনের প্রভাবও অনেকক্ষণ থাকে। বিকেলে খাওয়া এক কাপ কফিও রাতে গভীর ঘুমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে গভীর রাতে কড়া শরীরচর্চা, অ্যালকোহল এবং বিছানায় শুয়ে মোবাইল স্ক্রল— সবই ঘুমের মান নষ্ট করে। বিশেষ করে মোবাইলের নীল আলো শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়িকে বিভ্রান্ত করে দেয়।

ভোরের আলোই আসল ‘গড আওয়ার’
অনেকেই মনে করেন, রাত দু'টো-তিনটেয় উঠে কাজ করাই সাফল্যের চাবিকাঠি। কিন্তু প্রকৃত ‘গড আওয়ার’ হল সকাল। ঘুম থেকে উঠে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রাকৃতিক সূর্যের আলো চোখে পড়লে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক থাকে। ফলে রাতে সহজে ঘুম আসে এবং ঘুমের মানও ভালো হয়।

বাড়ে হৃদরোগের ঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত

ছোট ছোট বদলেই ফিরতে পারে ভালো ঘুম
ভালো ঘুমের জন্য এক লাফে জীবন বদলে ফেলার দরকার নেই। বরং ছোট ছোট অভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি কার্যকর।

শোওয়ার এক ঘণ্টা আগে ঘরের আলো কমিয়ে দিন। মোবাইল ফোনটি শোওয়ার ঘরের বাইরে রাখুন। ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন। প্রয়োজনে হালকা গরম জলে স্নান করতে পারেন। প্রতি সপ্তাহে রুটিনে একটি করে ভালো অভ্যাস যোগ করুন।

ঘুমের সমস্যা হলেই মেলাটোনিন, ম্যাগনেশিয়াম বা দামি স্লিপ ট্র্যাকার কেনার আগে জীবনযাত্রার এই মৌলিক অভ্যাসগুলিকে ঠিক করার উপরই জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। শরীরকে বদলাতে চাইলে আগে ভিতটা মজবুত করতে হবে। আর সেই ভিতের সবচেয়ে শক্ত স্তম্ভ হল—ভালো ঘুম।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement